আজ সোমবার 10:40 am13 July 2020    ২৮ আষাঢ় ১৪২৭    22 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

এসডোর দাবি

মার্কারিযুক্ত পণ্য ভয়াবহ ক্ষতিকর, এসব নিষিদ্ধ করুন

সালমান ফিদা, ঢাকা

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ১২:০৯ এএম, ১৪ জুলাই ২০১৯ রবিবার

বক্তব্য রাখছেন এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মারগুব মোরশেদ

বক্তব্য রাখছেন এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মারগুব মোরশেদ

মার্কারির ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ, বিশেষজ্ঞরা সরকারের কাছে মার্কারিযুক্ত পণ্য নিষিদ্ধের আহবান জানিয়ে এই বিষয়ে জোরালো মতামত প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে মার্কারি দূষণ একটি বৈশ্বিক উদ্বেগ। এরই প্রেক্ষিতে শনিবার [ ১৩ জুলাই, ২০১৯] ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে পরিবেশ অধিদপ্তর ও এনভায়রনমেন্ট এন্ড সোশাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডো কর্তৃক যৌথভাবে আয়োজিত “পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর মার্কারিযুক্ত পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব” বিষয়ক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ।

অনুষ্ঠানে মূলত পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর মার্কারির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন সচিব ও এসডো এর চেয়ারপার্সন সৈয়দ মার্গুব মোরশেদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সুরক্ষার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মার্কারিযুক্ত পণ্য নিষিদ্ধ করার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আহবান জানান। তিনি বলেন, “মার্কারির দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি , এমনকি নিম্ন মাত্রার দূষণ ও পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই মার্কারির বিষক্রিয়া বন্ধ করতে চাই, তাহলে আমাদের এর উৎপত্তিস্থল থেকেই মার্কারি নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে”।
সৈয়দ মারগুব মোরশেদ বলেন, মার্কারির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে সাংবাদিকদের সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। তিনি সকল গণমাধ্যমে কর্মরত সংবাদকর্মীদের অনুরোধ করে বলেন, এক্ষেত্রে আশা করি আপনারা সহযোগিতার হাত বাড়াবেন।

থার্মোমিটার এবং ইলেকট্রিক সুইচ এবং রিলে, সিএফএল বাল্ব , ডেন্টাল অ্যামালগাম (ডেন্টাল ফিলিং এর জন্য), প্রসাধনী, গয়না, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ অনেক পণ্যে মার্কারি রয়েছে। অজৈব মার্কারি কিছু স্কিন লাইটেনিং পণ্যে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সবধরনের মার্কারি খুব সহজেই ফুড চেইন এর মাধ্যমে প্রাণীদের কাছে পৌঁছায়। মিথাইল মার্কারি নিউরোটক্সিক্যান্ট; এটি মস্তিস্কের বিকাশে বাধা দেয়। কারণ এটি খুব সহজেই প্লাসেন্টাল ও ব্লাড ব্রেইন এর বাধাকে অতিক্রম করে। গর্ভজাত শিশুর জন্য এটি মারাত্মক হুমকি। মার্কারি এর ব্যবহার বিষণ্ণতা, আত্মহত্যা প্রবণতা, পক্ষাঘাত, কিডনি ফেইলর, বাক ও দৃষ্টি দুর্বলতা, এলার্জি ইত্যাদি রোগের সৃষ্টি করে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এ কে এম রফিক আহাম্মদ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সম্মানীয় অতিথি - পরিবেশ, বন, জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান; বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম; ড. মাসুদ ইকবাল মোঃ শামীম প্রকল্পপরিচালক, এমআইএপ্রকল্প, পরিবেশ অধিদপ্তর; প্রফেসর মোঃ আবুল হাশেম, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, কেমিক্যাল ডিভিশন, বিএসটিআই; এসডো মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন ও এসডো নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা এবং প্রেস এর নির্বাহী কর্মকর্তাবৃন্দ ।

পরিবেশ, বন, জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান
তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ফেয়ার এন্ড লাভলি মাখালেই যদি শাদা হয়ে যাওয়া যেত, তাহলে আফৃকায় কোনো কালো মানুষ থাকতো না।

তিনি বলেন, ছোটবেলায় আমি নিজে দেখেছি, গ্রাম্য কবিরাজেরা মার্কারি খাইয়ে মানুষকে অসুখ সারানোর কাজ করতো। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল। এখনো গাঁও-গেরামে তা বন্ধ হয়নি। মার্কারির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা নেই।

তিনি বলেন, কসমেটিকস উৎপাদনকারীরাও মার্কারির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অনেকে জানেন না। কসমেটিকস পণ্যের গায়ে ধূমপানের প্যাকেটের মতো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কথার মতো মার্কারির বিষয়েও সচেতনতার বিষয়টি উল্লেখ থাকা দরকার বলে তিনি মনে করেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. এ কে এম রফিক আহমদ জনস্বাস্থ্যে মার্কারির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “যেসব জনগোষ্ঠী মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে তারা প্রতিনিয়ত মার্কারির এই মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। আমাদের উচিত তাদেরকে এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা ”।

“পণ্যগুলোতে মার্কারির মাত্রা হ্রাস করার জন্য অথবা মার্কারিযুক্ত পণ্য ব্যবহার বন্ধ করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। স্বাস্থ্যসেবায় মার্কারিযুক্ত পণ্য যেমন থার্মোমিটার এবং স্ফিগমোম্যানোমিটার এর বিকল্প ডিভাইস ব্যবহার করা উচিত । জনগণের মধ্যে বিকল্প পণ্য ব্যবহার করার জন্য আমাদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার” - বলেন ড. এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান।

জনাব সাইফুল আলম বলেন, “মার্কারির এই বিষাক্ত প্রভাবে আমাদের স্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন। জনস্বাস্থ্যে মার্কারির এই দূষণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। আমাদের ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করার জন্য এখনি মার্কারিযুক্ত পণ্য নিষিদ্ধ করা উচিত” ।

ড. মাসুদ ইকবাল মোঃ শামীম বলেন, “পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায়, ২০২০ সালের মধ্যে মার্কারিযুক্ত পণ্যের ব্যবহার বন্ধে মিনামাটা কনভেনশন অন মার্কারি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। তাই এখনি সময় মার্কারি দূষণের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া”।

অধ্যাপক মোঃ আবুল হাশেম পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন। বলেন, “মার্কারিযুক্ত পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করা সম্ভব হবে না। প্রসাধন সামগ্রীতে মার্কারির ব্যবহার স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। বিএসটিআই ইতোমধ্যেই মার্কারিযুক্ত পণ্যের একটি আদর্শ মান ঠিক করেছে, যা ১ পিপিএম এর নিচে”।

ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, “মার্কারিযুক্ত পণ্য সম্পর্কে মানুষের ধারণা এবং সচেতনতা এখনও তেমন স্তরে পৌঁছাতে পারেনি, যার ফলে এর ব্যবহারকে কমানো যেতে পারে। বেশিরভাগ ব্যবহারকারীরা মার্কারির বর্জ্য নিষ্কাশন সম্পর্কে অবগত নয়। সুতরাং এখনি সময় তাদেরকে এই বিষয়ে সচেতন করে তোলা । এই সমস্যা আরও প্রকট হওয়ার আগেই মার্কারিযুক্ত পণ্য ব্যবহার বন্ধ করা অপরিহার্য ”।

সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, “মার্কারিযুক্ত স্কিন লাইটেনিং ক্রিম সরাসরি ত্বকের ক্ষতি করে এবং এই ধরনের পণ্যগুলির দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার কিডনি জটিলতা, ক্ষতিকারক এবং স্নায়ুতন্ত্রের ঝুঁকি বাড়ায়”।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের আলোচনায় উঠে আসে, বাংলাদেশে মার্কারিযুক্ত পণ্যের ব্যবস্থাপনা এবং কিভাবে এসব পণ্য নিরাপদে ব্যবহার করা যায় তার সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। মিনামাটা কনভেনশন অন মার্কারি এর স্বীকৃতি জরুরি প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই মার্কারিযুক্ত পণ্যের ব্যবহার অনেক দেশেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে। সুতরাং বাংলাদেশে মার্কারিযুক্ত পণ্যের ব্যবহার এখনই আইনের আওতায় আনা উচিত।

অনুষ্ঠানের শুরু হয় কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে। তেলাওয়াত করেন খলিলুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন বৃষ্টি ঝর্ণা, অনুষ্ঠানে প্রেজেন্টেশন করেন জুথি মিত্র। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সংবাদকর্মীদের পারদকে না বলুন শীর্ষক ক্যাপ এবং গ্যাঞ্জি সৌজন্য দেওয়া হয়। মার্কারির বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক স্টিকার এবং লিফলেটও বিলি করা হয়। আগামী ১৬ জুলাই আরেকটি আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজন করবে এসডো।

জাতীয়-এর সর্বশেষ খবর