আজ শনিবার 5:15 pm11 July 2020    ২৭ আষাঢ় ১৪২৭    20 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

মতপ্রকাশ ও ধর্মবিরোধিতা এক নয়

হাসানুল কাদির

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৩:২৬ পিএম, ৪ আগস্ট ২০১৯ রবিবার | আপডেট: ০৩:৩০ পিএম, ৪ আগস্ট ২০১৯ রবিবার

হাসানুল কাদির

হাসানুল কাদির

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। এটা তার অন্যতম মৌলিক অধিকার। মতপ্রকাশ বা বাকস্বাধীনতা এই সময়ে দুনিয়াজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রসঙ্গ। অথচ বাকস্বাধীনতার প্রশ্নমুক্ত কোনো সংজ্ঞা এখনো জানা নেই। বিষয়টিকে অনেকে আপেক্ষিক বলেও মন্তব্য করেন। সেই অনেকের অভিযোগ, বাকস্বাধীনতা মূলত একটি রঙিন পর্দা। দেখতে খুব সুন্দর। আমরা কেবল সুন্দর এই পর্দায় নানা ছবি দেখে থাকি। পর্দার আড়ালে কী আছে, কী হয়েছে, কী হচ্ছে এবং কী হবে, কারা এসব করছেন- কিছুই আমজনতার জানা নেই। জানার সুযোগও নেই। বড়ই নির্মম বাস্তবতা। মতপ্রকাশের চমকপ্রদ এই চেতনা বা গণতান্ত্রিক অধিকারের বুলি এ কারণেই দুনিয়ার কোনো দেশে এখনো সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। শুধুই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। মতপ্রকাশের বিষয়টি উচ্চারণ হলে তাৎক্ষণিক মানসপটে ভেসে ওঠে সবধরনের মিডিয়ার কথা।

 

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও মালিকদের কথা। মতপ্রকাশ বিষয়টি মিডিয়ার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। কোনো না কোনো মিডিয়া ছাড়া মতের প্রকাশই সম্ভব নয়। স্বাধীনতার অধিকার ভোগ করা পরের বিষয়। উল্টো নিত্যনতুন চিন্তা, বিশেষণ ও গবেষণা তথা দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিকের নিজস্ব মত তুলে না ধরলে মিডিয়ারই জন্ম হয় না। মিডিয়াগুলো তখন প্রচার ও প্রকাশ করবে কী? কী নিয়ে কাটবে লেখক সাংবাদিকদের দিনরাত? জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রচলিত গণমাধ্যম মাঝেমধ্যেই ঝড় তুলে দেয়। বিকল্পধারার অনলাইন গণমাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে রাতারাতি দুনিয়া কাঁপিয়ে দেয় উইকিলিকস। মিস্টার এসাঞ্জের উইকিলিকস প্রভাবে বাংলাদেশেও ঘটেছে নানা কাণ্ড। স্বাধীন গণমাধ্যম বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার প্রশ্নে বিস্তারিত যুক্তিতর্ক তুলে ধরলে শেষ পর্যন্ত অবশ্যই প্রমাণ হতে বাধ্য, উইকিলিকস অন্যায় কিছু করেনি। অথচ বেচারা এসাঞ্জকে ফেরারি হয়ে থাকতে হচ্ছে। কেন তাহলে এই যন্ত্রণা এসাঞ্জের বইতে হচ্ছে? উত্তর সহজ। মানে উইকিলিকসকর্তা আপেক্ষিক তত্ত্বের শিকার হয়েছেন। তার সাহসিকতা রাষ্ট্রের গোপনীয় এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না! এটা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের অধিকারের অন্তর্ভুক্ত নয়! এমন যুক্তিই এখন পর্যন্ত জানা গেছে তাকে ফেরারি করে রাখার পেছনে। অবশ্য আরো কিছু কারণ দেখানো হয়েছে। রাষ্ট্রের অতি গোপনীয় বিষয় ফাঁস করে দেওয়া অপরাধ।

 

কখনো সেটা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। বিভিন্ন দেশে এসব কর্মকাণ্ডের জন্য অসংখ্য ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়েছে। বিচারও হয়েছে। গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, জাতীয়তাবাদী, ইসলামী বা ধর্মনিরপেক্ষ- সব ধরনের রাষ্ট্র ও সমাজে এমন অপরাধ ঘটলে শাস্তি দিতে হয়। সচেতন, বিবেকবান ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের এতে সম্মতি থাকার কথা। প্রত্যেকে ভিন্ন্ন মত, মতবাদ ও আদর্শ লালন করতে পারেন। চাইলেই যেকোনো স্থানে, যেকোনো পরিবেশে তা নিজের খুশিমতো তুলে ধরতে পারেন না। এর পরও তা করলে পরিণতি কী হবে- এর সহজ একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান চলছে। সেখানে কোনো নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যার কঠোর সমালোচনা করলেন। ওই অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার প্রশংসা করলেন। এবার বলুন তো, কেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে? রাজনৈতিক এমন বাস্তবতায়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করতে গেলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যায়। হাজার বছরের লালিত ধর্মীয় চিন্তা, দর্শন, মূল্যবোধ, ধর্মের প্রবর্তক, আল্লাহ এবং ধর্মগ্রন্থ নিয়ে চুনোপুঁটিরা বাঘ-সিংহের আচরণ করবেন কেন? ধার্মিক মানুষ তা বরদাশত করতে পারেন না। পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা না করে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ধর্মবিরোধী স্পর্শকাতর কাণ্ড ঘটালে ভয়াবহ পরিণতি হয়। এ জন্য দেশ-বিদেশে হাজারো মানুষ খুনের ঘটনাও বহুবার ঘটেছে। এই সময়ে দেশে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে কঠিনতর অসহনীয় বেয়াদবিমূলক মন্তব্যের জের ধরে নৈরাজ্য চলছে। কয়েকজন নবীপ্রেমিক তরুণ শহীদও হয়েছেন। গত কয়েক দিনে নিহত সবাই মহানবী (সা.)-এর অবমাননা ইস্যুর আন্দোলনে অংশ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেননি। শতাধিক আন্দোলনকারী বিশেষ দলের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

 

ইসলামী রাষ্ট্রেও অন্য ধর্ম ঘিরে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং মন্তব্য কঠিন অপরাধ। প্রিয় বাংলাদেশেরও ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সংবিধান অনুযায়ী যেকোনো ধর্মের মূল্যবোধে আঘাত করার মতো কিছু ঘটলে শাস্তি পেতে হবে। দোষীদের বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্রের কর্তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এতে অবহেলা করলে চরম মাশুল গুনতে হয়। কিছুদিন আগে `ইনোসেন্স অব মুসলিমস` নামে চলচ্চিত্র বানিয়ে প্রিয়নবি মুহাম্মদ (সা) এর পবিত্র চরিত্রে বেয়াদিবমূলক দৃশ্য দেখানোর পাশাপাশি ইসলাম সম্পর্কেও পাগলামি মন্তব্য করা হয়েছে। এই ঘটনার আগে এবং পরেও বিদেশি বেশ কিছু গণমাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (সা) কে ব্যাঙ্গ করে কার্টুন প্রকাশ করা হয়েছে। ঢাকার একটি নামি দৈনিকও কয়েক বছর আগে সেই ধরনের ধৃষ্ঠতা দেখিয়েছিল। নবিপ্রেমিক মানুষের তীব্র আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে পত্রিকাটির সম্পাদক খতিব উবায়দুল হক (রহ) এর হাতে হাত রেখে তওবা করেছিলেন। টেলিভিশনে তা ফলাও করে প্রচার হয়েছিল। একাধিক লেখা প্রকাশের মাধ্যমেও তারা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছিলেন। বাস্তবতা বিচারে দুনিয়াজুড়েই মুসলিম উম্মাহ কঠিন চ্যালেঞ্জ শুধু নয়, নামমাত্র মুসলিম পরিচয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়াই করছে। ৭ শ কোটি বনিআদমের বিশাল দুনিয়ায় প্রায় ২ শ কোটি মুসলমানের জন্য বড় কোনো সুখবর নজরগোচর হচ্ছে না। এমন অবস্থায় ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ (সা) এর বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা যাকিছু হচ্ছে, হয়তো আরো হবে, তা ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা করতে হবে। নেতিবাচক কাজের জবাব ইতিবাচক উপায়ে দিতে হবে। উত্তম কিছু পেলে বিনিময়ে সর্বোত্তম উপহারে সম্পর্কোন্নয়ন করতে হবে। সবচেয়ে নিকৃষ্ট মুশরিক আবু জাহেলের বাড়িতে অসংখ্যবার প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মদ (সা) নিজে গিয়েছেন। ভালোবেসে তাকে ইসলামের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। জবাবে পেয়েছেন চরম যন্ত্রণা, তীব্রতর বিরোধিতা। তায়েফ অঞ্চলে গিয়ে মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত হতে বলায় কী অসহনীয় মার খেয়েছিলেন প্রিয়নবি (সা)! ফেরেশতারা ওই জনপদ মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে চাইলেও প্রিয়নবি অনুমতি দেননি।

 

মক্কা বিজয়ের পর তাঁর আঙুলের ইশারায় চলতো সবকিছু। কই, মক্কার মুশরিক জালিমদের হাজারো বিরোধিতার মুখে জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়া নবিজী বীরের বেশে প্রেসিডেন্ট হয়ে স্বদেশে ফিরে একটি মানুষকেও তো প্রতিশোধ নেননি। কাউকে ডেকে এনে দুয়েকটি ধমক দেওয়ার ঘটনাও জানা নেই। উল্টো ভালোবাসার আদর্শিক ছোঁয়ায়, ইমানের আলোকধারায় ধন্য করেছিলেন তাদেরকে। সেই তায়েফ এখনো সাক্ষী। এখনো কথা বলে মক্কা মদিনার মাটি মানুষ আকাশ বাতাস গাছ পশু পাখি। সবাই। হরতাল, অবরোধ, হত্যা, হুমকি, আগুন, মিথ্যাচার, ফেসিবাদ, জুলুম, নৈরাজ্যের মাধ্যমে কখনো শান্তি আসে না। প্রিয়নবি (সা) এর জীবন বর্ণিল প্রামাণ্য সাক্ষী। চোখ কান নাক খোলা থাকলে সব দেখা যাবে। শোনা যাবে। উপলব্ধি করা যাবে। সকল বিষয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকুক। ধর্মীয় বিষয়ে সেই স্বাধীনতা কিছুতেই অবহেলার চোখে দেখলে হবে না। নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রমাণ হলে এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দিয়ে আইনও করা যেতে পারে। সেই আইনে ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন কেটাগরির শাস্তির বিধান রাখা হোক। ধার্মিক মানুষদের নিজ ধর্ম পালনে প্রয়োজনীয় সরকারি নিরাপত্তা ও পৃষ্ঠপোষকতা চাই। আমরা প্রিয়নবি (সা) এর অবমাননা, কোরআনের সঙ্গে বেয়াদবি, ইসলামকে কটাক্ষ সহ্য করতে পারি না।

 

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগ এখানে নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। বরদাশত করতে চাই না অন্য ধর্মের ভাইবোনদের ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত, তাদের মন্দিরে হামলা, বাড়িতে লুটপাট আগুন নৈরাজ্য। ইসলাম এই শিক্ষাই দিয়েছে। ইনসাফের সমাজব্যবস্থাই প্রিয়নবি (সা) সারাজীবন দেখিয়ে গেছেন। আমরা সবার জন্য ইনসাফ কায়েম করতে চাই।

আসছে বই, জীবনজুড়ে ইসলাম

 

অনেক স্মৃতি, বহু কথা