আজ রবিবার 8:29 pm05 July 2020    ২১ আষাঢ় ১৪২৭    14 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

বৌদ্ধ স্থাপত্য ও পর্যটনে বাংলাদেশ

টুসি বোস

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৮:০০ পিএম, ৮ আগস্ট ২০১৯ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৮:০৬ পিএম, ৮ আগস্ট ২০১৯ বৃহস্পতিবার

বৌদ্ধ স্থাপত্য ও পর্যটনে বাংলাদেশ

বৌদ্ধ স্থাপত্য ও পর্যটনে বাংলাদেশ

অন্তত শিল্পকলা, সাহিত্য, স্থাপত্য থেকে ধর্মনির্ভর বিহারকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিস্তারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৌদ্ধবসতি, তাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও বৌদ্ধিক উত্কর্ষকে গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা যেতে পারে। ধর্মের প্রয়োজনে স্থাপত্য নির্মাণের রীতি সেই আদি থেকে; অন্যথা হয়নি বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশেও রয়েছে এমন কিছু স্থাপত্য, যা বহন করছে তত্কালীন সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সংস্কৃতি, শিল্পকলা, সাহিত্য ও ধর্মীয় চেতনার স্মৃতি। তবে এসব নিদর্শন থেকে সে যুগ নিয়ে উপসংহারে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তখনকার বেশির ভাগ নিদর্শন সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছে ধংসস্তূপে, যা আমরা বাংলাদেশের নানা স্থান থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে পেয়েছি। এগুলোর উপযুক্ত বিশ্লেষণ ও কার্যকারণনির্ভর ব্যাখ্যাদান সম্ভব হলে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে। অন্যদিকে ঐতিহ্য স্থান হিসেবে বৌদ্ধ সংস্কৃতির নিদর্শনগুলোকে দেশের মধ্যে ও বহির্বিশ্বে পরিচয় করানো সম্ভব হলে তা পর্যটন শিল্পেও অবদান রাখতে পারে।

 

বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে বাংলাদেশের গুরুত্ব দুটি কারণে। একটি হচ্ছে— ভারতীয় বৌদ্ধদের শেষ আশ্রয়স্থল এটি। খ্রিস্টীয় পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত বাংলায় বৌদ্ধরা অনেক মন্দির, স্তূপ, বিহার নির্মাণ করে বলে জানা যায়। ওই সময় উপমহাদেশের আর কোথাও এর অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। অন্যটি বঙ্গদেশ ছিল, ‘তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মে’র এক অধঃপতিত রূপের আবাসস্থল। এটি হচ্ছে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের শেষ পরিণতি। বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ বৌদ্ধ স্থাপনা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এর মধ্যে মহাস্থানগড়ের ভাসু বিহার, সোমপুর বিহার, শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, ভোজ বিহার, সীতাকোট বিহার, চাপড়াকোট বিহারের কথা না বললেই নয়।

 

বৌদ্ধ ধর্মের অনুশাসনমূলক বই থেকে পাঁচ ধরনের আবাসনের কথা জানা যায়— বিহার, আদ্যযোগ, পাসাদ, হাম্মীয় ও গুহা। বাংলাদেশে পাওয়া প্রত্ন-স্থাপত্যের মধ্যে বিহারই বেশি। বৌদ্ধ বিহার ধর্মসংশ্লিষ্ট অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরিব্রাজক ভিক্ষুরা বিহারে থেকে ধর্মীয় আচারাদি সম্পন্ন করতেন। ধ্যানের জন্যও বেছে নিতেন এ স্থান। সংসার ত্যাগ করে ধর্ম প্রচারেই ব্রতী ছিলেন তারা। কুষাণ রীতিতে গড়া বিহার। পাথর বা ইটের বিহারগুলো বর্গাকৃতি ব্লক রীতিতে নির্মিত। প্রয়োজনবোধে দ্বিতল, ত্রিতল, বহুতল বিহারও নির্মাণ হতে থাকে। বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত পাহাড়পুর মহাবিহার থেকে শুরু করে অনেক বিহার বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এ দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে বৌদ্ধ সংস্কৃতিকে কাজে লাগাতে চাইলে সবার আগে এ নিদর্শনগুলোকে পরিচয় করিয়ে দেয়াটা জরুরি।

নওগাঁ জেলার বদলগাছি থানায় পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত পাহাড়পুর মহাবিহার। অষ্টম ও নবম শতকে এ গ্রাম ছিল পাল রাজার শাসনে। সে সময় রাজসিংহাসনে আসীন ছিলেন ধর্মপাল। তার আগ্রহেই নির্মাণ করা হয় সোমপুর বিহার। অনেকে বলেন, পাহাড়পুর বিহার। বর্গাকৃতি বিহারের ১৭৭টি কক্ষের মধ্যে উত্তরে ৪৫ ও পূর্ব-পশ্চিম-দক্ষিণ কোণের প্রতিটিতে ৪৪টি করে কক্ষ রয়েছে। বিহারে ক্রুশাকৃতির মন্দিরের সর্বোচ্চ কাঠামো সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। বিহারের সঙ্গে আকার-আয়তনে ভিন্ন অন্যান্য স্থাপনাও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নিবেদন স্তূপ, কেন্দ্রীয় মন্দিরের প্রতিকৃতি, রন্ধনশালা, পঞ্চমন্দির, ভোজনশালা, পাকা নর্দমা ও কূপ উল্লেখযোগ্য। বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা তীর্থস্থানগুলোয় পূজা দিতে এসে ভক্তি ও নৈবেদ্য হিসেবে ছোট-বড় নানা আকৃতির স্তূপ নির্মাণ করে। সেটাই নিবেদন স্তূপ।

অন্যদিকে কুমিল্লার কোটবাড়ী-সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এলাকায় রয়েছে শালবন বিহার। ১৬৭ বর্গমিটারের বর্গাকার বিহারটি সপ্তম শতকের শেষ অথবা অষ্টম শতকের গোড়ার দিকে নির্মাণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দেব পর্বতের আদি দেব বংশের চতুর্থ শাসক শ্রী ভবদেবের আদেশে এটি নির্মাণ করা হয়। ১১৫টি কক্ষ নিয়ে এ বিহার। কালের বিবর্তনে বিহারটিতে পরবর্তীতে পরিবর্তন এসেছে অনেক। নবম ও দশম শতকে পূর্বনির্মিত স্থাপনার ওপর তৈরি করা হয় নতুন মেঝে ও স্তম্ভ। এ বিহারের কক্ষগুলোর বৈশিষ্ট্য খানিকটা ভিন্ন। রান্নার সুব্যবস্থার সঙ্গে রয়েছে নকশা করা ইটের পাদস্তম্ভ। বারোয়ারি রান্নাঘর ও বড় পীঠস্থানও ছিল বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। কক্ষগুলোয় দেব-দেবীর মূর্তি, বাতি, পাঠসামগ্রী রাখার বিশেষ তাকও ছিল। বিহারের বাইরে উত্তর-পশ্চিম কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরের দু’পাশে দেখা মেলে দুটি স্তূপের।

 

বাংলাদেশের বৌদ্ধ সংস্কৃতির নিদর্শন হিসেবে আনন্দদেবের সময় নির্মিত বিহারটিকে গুরুত্ব দিতেই হয়। প্রথম দেব বংশের তৃতীয় শাসক শ্রী আনন্দ দেব এ বিহার নির্মাণ করেন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্ বৌদ্ধ বিহার এটি। কুমিল্লার শালবন বিহার থেকে প্রায় দুই মাইল উত্তরে এর অবস্থান। বর্গাকার বিহারের প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৬২৪ ফুটের মতো। এর সামনের খোলা জায়গাটির মাঝখানে রয়েছে বড় ক্রুশাকার মন্দির। প্রধান মন্দির কেন্দ্র করে বিহারটি দুর্গাকারে নির্মিত করা হয়েছিল।

 

ইটে নির্মিত ভাসু বিহারের অবস্থান বগুড়ার বিহার গ্রামের উত্তরে। কক্ষ সংখ্যা ৩০। দক্ষিণে অবস্থিত প্রধান মন্দিরটি। আলেকজান্ডার কানিংহামের মতে, সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং উল্লিখিত পো-শি-পো বিহারটিই ভাসু বিহার। তবে এ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। মহাস্থানগড় থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই দেখা মিলবে ভাসু বিহারের। গুপ্ত-পরবর্তী যুগে এটি নির্মিত। বর্গাকার ভোজ বিহারটির দক্ষিণ বাহু সম্পূর্ণরূপে এবং অপর তিন বাহু আংশিক উন্মোচন হয়েছে। বিহারের কেন্দ্রে অবস্থিত ক্রুশাকার মন্দির। দক্ষিণ দিকে আছে ১৩টি কক্ষ।

 

সপ্তম ও অষ্টম শতকে দিনাজপুরের নওয়াবগঞ্জ থানায় নির্মিত হয় সীতাকোট বিহার। এর উত্তর বাহুতে ৮ ও দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ১১টি করে মোট ৪১টি ঘর আছে। দেয়ালে দেখা মেলে কুলুঙ্গি বা তাকের। প্রতি কক্ষে পূজনীয় মূর্তি রাখার জন্য তৈরি করা হয় বেদি। কেন্দ্রীয় কোনো মন্দির নেই এ বিহারে। দক্ষিণের কেন্দ্রীয় কক্ষটিতেই ছিল প্রধান মন্দির। বিহারের ভেতরের দিকে ছিল একটি টানা বারান্দা। বিহারের দক্ষিণে একটু দূরে মূল ভবনের সঙ্গে আবৃত পথের সঙ্গে যুক্ত বারান্দাসহ পাঁচটি কক্ষ পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন ভিক্ষুরা। অন্যদিকে বিখ্যাত চাপড়াকোট বিহারের কেন্দ্রে রয়েছে বর্গাকার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। রংপুর জেলার দক্ষিণে অবস্থিত লোহানীপাড়া গ্রামে অবস্থিত এ বিহার। এখানেও কোনো কেন্দ্রীয় মন্দির বা স্থাপনা নেই। বিহারের ধ্বংসাবশেষের চারপাশে প্রায় আধা মাইল প্রশস্ত এক পরিখা রয়েছে।

 

সব স্থাপনাই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব দিলে তা হয়ে উঠতে পারে আদর্শ পর্যটন ভূমি। এ নিয়ে সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজন হয়েছিল ‘আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও পর্যটন সম্মেলন’। দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে বৌদ্ধ পুরাকীর্তি, স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এগুলোকে ‘পর্যটন পণ্য’ হিসেবে সবার কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সম্মেলন উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রাচীনকালের নান্দনিক স্থাপত্যকলা বাংলাদেশের সমৃদ্ধ পর্যটনের ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়। এ ইতিহাস আড়াই হাজার বছরব্যাপী বিস্তৃত। বৌদ্ধ স্থাপনাগুলোর সঠিক সংস্কার শুরু হলে মিলতে পারে আরো অনেক অজানা তথ্য; যা এখনো আমাদের অগোচরে রয়ে গেছে।

ধর্ম-এর সর্বশেষ খবর