আজ শনিবার 6:13 pm11 July 2020    ২৭ আষাঢ় ১৪২৭    20 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

মহাসড়কে এখনো ত্রিচক্র যান

ঘুষে চলে গাড়ির চাকা

নিজস্ব প্রতিনিধি, বগুড়া

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০৪:৩৫ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ শনিবার

বগুড়ার মহাসড়কে চলছে এসব অবৈধ সিএনজি

বগুড়ার মহাসড়কে চলছে এসব অবৈধ সিএনজি

*%

 

 

 


টাকা নিয়ে মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালানোর অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ উঠে খোদ শাজাহানপুর থানার তৎকালীন ওসির বিরুদ্ধেই। উপজেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম এ অভিযোগ করে বলেছিলেন, অবৈধ অটোরিকশা চলাচল বন্ধ না হলে প্রয়োজনে মহাসড়ক অবরোধ করা হবে। তবে আগের মতোই চলছে অটোরিকশা।

২০১৫ সালের ২৫ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় মহাসড়কে সব ধরনের তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর প্রথম দিকে মহাসড়কগুলো অটোরিকশামুক্ত ছিল। কিন্তু পরে পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে মহাসড়কে আবারও চলছে অটোরিকশা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাজাহানপুর থানার নামে প্রতিটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন ১০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। এ জন্য বগুড়ার বনানী থেকে শেরপুর উপজেলা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার মহাসড়কে অবাধে এই অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বগুড়া সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় চলাচলের জন্য শাজাহানপুর, শেরপুর ও ধুনটের প্রায় এক হাজার অটোরিকশা প্রতিদিন উত্তরবঙ্গ মহাসড়ক (শাজাহানপুর হয়ে) ব্যবহার করে। সেই হিসেবে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা পায় শাজাহানপুর থানা পুলিশ।

তৎকালীন ওসি আলমগীর হোসেন বলেছিলেন, অভিযোগ সত্য নয়। পুলিশ মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচলে বাধা দিয়ে আসছে। কিন্তু জনবল স্বল্পতার কারণে তাদের পক্ষে সব সময় মহাসড়ক পাহারা দেওয়া সম্ভব হয় না।

মহাসড়কে নিরাপদে চলতে যানবাহনের চালককে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নির্দেশিত নিয়মকানুন ও আইন মানতে হয়। কিন্তু বগুড়ার বিভিন্ন স্থান ঘুরে জানা গেছে, আইন ও নিয়মকানুনের বিষয়ে অবগত নন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা। ফলে মহাসড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে। শহরের আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় যেতে মহাসড়ক ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু নিয়ম না মেনে অন্য যানবাহনের সঙ্গে পাল­া দিয়ে চলতে গিয়ে অহরহ দুর্ঘটনায় পড়ে অটোরিকশা। এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। বগুড়া শহরের মাটিডালি মোড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে গেছেন ব্যবসায়ী নাহিদ আলম। তিনি বলেন, চালককে অনেক অনুরোধ করার পরেও তিনি মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে অটোরিকশা চালাচ্ছিলেন। সামনে হঠাৎ একটি মোটরসাইকেল দেখে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে দুর্ঘটনাটি ঘটে।

বগুড়ার সিএনজিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির তথ্যমতে, এই জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৩ হাজার অটোরিকশা চলাচল করে। প্রায় সব অটোরিকশাকেই বিভিন্ন মহাসড়ক ব্যবহার করতে হয়। তবে এই ১৩ হাজার অটোরিকশার কত জন চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে তা বলতে পারেননি সমিতির লোকজন। ফিটনেস সার্টিফিকেট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, এ ধরনের অটোরিকশার সংখ্যাও তাঁদের তালিকায় নেই।

পূর্ব বগুড়া, শাকপালা, স্টেশন রোড, দত্তবাড়ী ও শেরপুর সড়কের একাধিক অটোরিকশা মালিক জানান, তাঁদের অটোরিকশা চালানোর ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম নেই। অর্থাৎ যে কেউ অটোরিকশা কিনে যাকে খুশি চালকের আসনে বসিয়ে সড়কে নামিয়ে দিতে পারেন। মালিক সমিতির কার্যালয়ে নির্ধারিত কিছু ফি দিলেই সব বৈধতা পাওয়া যায়। চালকের লাইসেন্স, গাড়ির বৈধ কাগজপত্র—সব কিছু সামলায় মালিক সমিতি। এককালীন টাকা ছাড়াও লাইসেন্স, কাগজ বা ম্যানেজ করার জন্য প্রতি মাসে নির্ধারিত কিছু ফি দিতে হয়।

কিশোর আমিনুল জানায়, আগে সে রিকশাভ্যান চালাত। এখন শাজাহানপুর মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালায়। লাইসেন্স ও রোড সিগন্যাল সম্পর্কে জানতে চাইলে আরেক চালক আপেল জানায়, এ ব্যাপারে তার কোনো ধারণা নেই।

এদিকে বগুড়া শহরজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, স্কুল-কলেজ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাসা-বাড়ির সামনের এসব স্ট্যান্ড সরাতে কোনো উদ্যোগ নেই প্রশাসনের। শহরে যানজট সৃষ্টিতে রিকশার সঙ্গে অটোরিকশাও অনেকটা দায়ী।

বগুড়া জেলা সিএনজিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ শেখ শহর ও মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলে অরাজক পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে জানান, ৬৫টি টেম্পো (তেলচালিত) নিয়ে ১৯৬৫ সালে বগুড়া অটো টেম্পো সমিতি গঠন করা হয়। তখন পুরো জেলায় এই একটি সমিতিই ছিল। এখন জেলার ১২টি উপজেলায় পৃথক সমিতি ছাড়াও শুধু বগুড়া শহরেই রয়েছে চারটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতি (বগুড়া, দত্তবাড়ি, পূর্ব বগুড়া ও চারমাথা)। এই সমিতিগুলোর নিয়ন্ত্রণে সদর উপজেলা এলাকায় চলাচল করে প্রায় ছয় হাজার অটোরিকশা। বগুড়ার অন্যান্য উপজেলার মহাসড়কে আরো প্রায় সাত হাজার অটোরিকশা চলছে।

এই বিশাল সংখ্যক অটোরিকশা চলাচলে বগুড়া পৌরসভা বা জেলা প্রশাসন কোনো স্ট্যান্ড দেয়নি। অথচ পৌরসভা প্রতিবছর দরপত্রের (টেন্ডার) মাধ্যমে প্রতি অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন পাঁচ টাকা করে টোল নেয়। পৌর মেয়র মাহবুবুর রহমান জানান, জায়গার অভাবে অটোরিকশা স্ট্যান্ডের স্থায়ী ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।

বগুড়া বিআরটিএর সহকারী পরিচালক কাজী মোরসালিন জানান, শহরে চলাচল করা বেশির ভাগ সিএনজি অটোরিকশার লাইসেন্স নেই। আর অনভিজ্ঞ চালক প্রচুর। অনেক চেষ্টা করেও তাঁরা অটোরিকশার এই ‘হ-য-ব-র-ল’ অবস্থা দূর করতে পারছেন না। আর মহাসড়কে অবৈধ চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাঁদের তাঁরাই চাঁদা নিয়ে এর অনুমোদন দেন। এসব কারণে দিন দিন মহাসড়ক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এখন দুর্ঘটনার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সিএনজি অটোরিকশার অদক্ষ চালকরাই দায়ী।

বগুড়া ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক সালেকুজ্জামান খান জানান, মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশ ও সদর ট্রাফিক পুলিশের। বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে পুলিশের পক্ষে অনেক সময় ওই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

 

দেশ-এর সর্বশেষ খবর