আজ শনিবার 5:40 pm11 July 2020    ২৭ আষাঢ় ১৪২৭    20 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

উৎসবের ঈদে ঈমানের ডাক

হাসানুল কাদির, প্রধান সম্পাদক, টোটালবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ১০:৫৪ পিএম, ৫ আগস্ট ২০১৯ সোমবার | আপডেট: ১০:৫৫ পিএম, ৫ আগস্ট ২০১৯ সোমবার

হাসানুল কাদির, প্রধান সম্পাদক, টোটালবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম

হাসানুল কাদির, প্রধান সম্পাদক, টোটালবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম

আরবি ঈদ শব্দের অর্থ ফিরে ফিরে আসা, আনন্দ ও উৎসব উদযাপন করা। ঈদুল ফিতর মূলত প্রতিদান বা পুরস্কারের রঙিন উৎসব। নতুন ও সুন্দর জামা-জুতো-গয়না-কসমেটিকসের ব্যবহারে নিজেকে সাজিয়ে তোলাই ঈদ নয়। বিরিয়ানি-পোলাও, বাহারি পিঠা-পুলি আর মিষ্টি খেয়ে পেট ভরার নামও ঈদ নয়। দরিদ্র ক্ষুধার্ত, অসহায়, ঋণগ্রস্ত মানুষকে এড়িয়ে জমজমাট আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠার নামও ঈদ নয়। প্রতি বছর দুটি দিন মুসলিম জীবনে ঈদ হয়ে আসে হাজারো বৈষম্য, অনাকাঙিক্ষত অনৈক্য, অসুন্দর হিংসা-বিদ্বেষ-ক্রোধ দূর করে পরিচ্ছন্ন ঝলমলে জীবন গড়ে তোলার সম্মিলিত শপথ বাক্য পাঠ করানোর জন্য। আমরা আকাশের বুকে চাঁদ দেখে ঈদ উদযাপন করি। ঈদুল ফিতর ও আজহা দুটি ঈদের দিনেরই বাহ্যিক ও মৌলিক অনুষঙ্গ হলো, ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে সম্মিলিতভাবে নামাজ আদায় করা। নামাজ রোজ পাঁচ ওয়াক্ত আদায় করা আমাদের ওপর ফরজ। ঈদের দিনটিতেও অন্য দিনের মতোই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ; এমনকি ঈদ জুমার দিনে অনুষ্ঠিত হলে জুমার নামাজও অন্য জুমার দিনের মতো আদায় করা ওয়াজিব। আমাদের জীবনে নিত্যদিনের ফরজ নামাজের পাশাপাশি ওয়াজিব, সুন্নত, নফল এবং মুসতাহাব পর্যায়ের অনেক নামাজের বিধান রয়েছে, যা আমরা আদায় করে থাকি। এত কিছুর পরও ঈদের দিনে পৃথক নামাজ পড়ার বিধান কার্যকর করা হয়েছে। এ নামাজের আলাদা নিয়মও রয়েছে, যা অন্যান্য নামাজের পদ্ধতির চেয়ে অনেক ব্যতিক্রম। দুই ঈদের নামাজ খোলা আকাশের নিচে যত বড় সম্ভব মাঠে আয়োজন করা উত্তম। এ নামাজের জামায়াতে তুলনামূলক বেশি মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিতের ব্যবস্থা করতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ঈদুল ফিতর উদযাপনের আগে পুরো একটি মাস রোজা রাখতে হয়। ঈদের নামাজ আদায়ের আগেই দরিদ্র মানুষের মধ্যে সদকাতুল ফিতর পরিশোধ করতে ইসলামে নির্দেশনা দেওয়া আছে। কোরবানির ঈদের দিনে নামাজ শেষ করে বাড়ি ফিরেই সক্ষম প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে পশু কোরবানি করতে হয়। এগুলো সবই ঈদের দিনের বাহ্যিক আমল-কর্মসূচি, যা আমরা পালন করে থাকি। এর প্রত্যেকটি আমলের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য-বৈশিষ্ট্য-দাবি।

 

 

॥ দুই ॥

 


ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই বিনোদন- ঈদের বহু আগেই এমন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বাড়ি-মহল্লা-হাট এমনকি দেশ-দুনিয়ার প্রতিটি মুসলিম জনপদ। এ ধরনের স্লোগান-আয়োজন আমাদের চিন্তা ও চেতনার পরতে পরতে খুব সূক্ষ্মভাবে ঢুকে গিয়ে বর্তমানে ‘পবিত্র ঈদ’ তার মৌলিকত্ব, স্বাতন্ত্র্য এমনকি অস্তিত্বই হারিয়ে বসেছে! বড়ই আফসোস! ঈদ কি শুধুই আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠার নাম? ঈদ কি শুধুই বিভিন্ন মুখোশে অশ্লীল-অনৈতিক-অসুস্থ সংস্কৃতি ও বিনোদন উপভোগ করার উপলক্ষ? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ নয়। ঈদের দিনে আমরা আনন্দ উপভোগ করবো, উৎসবেও অংশ নেবো- ঈদ আমাদের জীবনে আনন্দ আর উৎসবের বারতা নিয়েই হাজির হয়। সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, কখনো আনন্দে আÍহারা আর উৎসবে মাতোয়ারা হওয়া যাবে না। এটাই ইসলাম। এখানেই ইসলামের স্বাতন্ত্র্য। জীবনের প্রয়োজনে, সময়ের আহ্বানে ইসলাম আছে সবসময়, সর্বত্র। ইসলামের পবিত্রতম মূল্যবোধে, কোরআনের কোনো বর্ণ, শব্দ, বাক্য বা ভাষণে সেকেলে বা আধুনিক বলে তকমা প্রয়োগের কোনো দরকার নেই। ইসলাম ইসলামই। এটি না সেকেলে, না আধুনিক। মানুষের জন্যই ইসলাম। যেকোনো মানুষ ইসলামকে গাইডলাইন হিসেবে বেছে নিতে চায়, সে সবসময় এমনকি উৎসব পালনেও শ্রেষ্ঠতম আদর্শ হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করতে পারে। আপনি ইসলামকে মেনে চললে, যেখানেই মানবেন, যতটুকুই মেনে চলবেন, (যদিও আংশিক ইসলাম চর্চার সুযোগ কোরআন দেয় না), অন্তরে শান্তি মিলবে। আত্মায় আলো আসবে। মগজে-মস্তিষ্কে শুভ চিন্তার অশরীরি ফেরেশতারা সুবাস ছড়াবেন। আপনি বদলে যাবেন, বদলে যেতে বাধ্য হবেন। অন্তত ক্ষণিকের জন্য হলেও আমরা এ সত্যতা নিজের অবস্থানে থেকেই যাচাই করে দেখতে পারি।

 

# 

 


ঈদ আমাদের জীবনে উৎসব ও আনন্দের প্রতীক। আমরা সাধারণত এ সময়কে উপলক্ষ করেই সবচেয়ে আনন্দের আয়োজন করে থাকি। মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি সদস্যের জন্য ঈদ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অফুরন্ত নেয়ামত ও পবিত্র আনন্দের বেহেশতি সওগাত। রাজা-প্রজা-নেতা-কর্মী-মালিক-শ্রমিক-ধনী-দরিদ্র সর্বস্তরের প্রতিটি মুসলমান এ দিনে খোলা আকাশের নিচে বিশাল ময়দানে গিয়ে সমবেত হই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের গুণগান গাই। নাবিয়ে কারিম মুহাম্মদ (সা.)-এর দেখানো নিয়ম অনুসারে ঈদ উদযাপন করি। পরস্পর কোলাকুলি করা, একে অপরের খোঁজ-খবর নেওয়া, এতিম-বিধবা-গরিব মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা- এ সবই ঈদের সামাজিক দাবি।

 

 

॥ তিন ॥

 


অনেকেই বলেন, এখন ঈদ বদলে গেছে। এতটাই বদলে গেছে যে, ঈদ আর এখন ঈদ নেই! বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের ঈদ স্মৃতিতে এসব আলোচনা পড়ে বা শুনে অন্তরে বেশ আঘাত পাই। আঘাত পাবো না কেন? ঈদ শুধুই একটি আঞ্চলিক বা নামকাওয়াস্তের সাংস্কৃতিক-সামাজিক আয়োজন হলে তাতে আপত্তির কিছু ছিল না। দেশ ও এলাকা ভেদে হাজার রকম অনুষ্ঠান-উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে। সেসবে পরিবর্তন সংযোজন বিয়োজন হতে পারে। অমুসলিম কোনো সমাজ বা দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের মধ্যে আগে থেকেই প্রচলিত ওইসব আয়োজন-অনুষ্ঠান-উৎসবে যদি ইসলামের মৌলিক চিন্তা, চেতনা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু পাওয়া যায়, তাহলে শুধু সেই সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো ইসলামের কাঁচিতে কৌশলে কাটছাট করতে হবে। তা না হলে যেখানে যেমন যা আছে বা ছিল, তা পালনে কোনো দোষ বা গুনাহ নেই। ইসলামে ঈদ সে রকম কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠান নয়। এটি প্রথমত এবং প্রধানত একটি ইবাদত। পবিত্রতায় স্নাত আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত বিশেষ উৎসবময় বন্দেগির নাম ঈদ। এখানে উৎসব আর আনন্দ উদযাপনের চিন্তা পরের বিষয়, আগে ইবাদতের পর্ব পালিত হতে হবে। প্রথমে সারা মাস রোজা রাখতে হয়, বেশি বেশি নেক আমল করতে হয়। দুনিয়ায় বাস করেই একটি মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণে জান্নাতি মানুষে রূপ নিতে হয়। এরপর আকাশে শাওয়ালের চাঁদ উঁকি দিলেই তা ঈদের রাত বলে গণ্য হয়। ইসলামে ঈদের দিনের আগের রাতটি, যাকে আমরা চাঁদরাত বলে থাকি, এর বিশেষ মর্যাদা উল্লেখ করা হয়েছে। ঈদের রাতটি আল্লাহপ্রেমিক বান্দাদের জন্য অন্যরকম ইশকের আলিঙ্গনে হারিয়ে যাওয়ার রূপময় শাবনূর। ভোরের আকাশে সূর্যের দেখা মিলবে অনেক পরে। তখন সকল মুমিন উৎসবে অংশ নেন। আল্লাহর খাঁটি আশেক বান্দারা এর আগেই মাওলায়ে কারিমের মায়াবি প্রেমের পরশ পেয়ে ঈদের আনন্দে নিজেদের সংযোগ স্থাপন করে নেন। সকালে ঈদগাহে নামাজ আদায়ে মাঠে হাজির হওয়ার আগে মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় কিছু খেয়ে নেওয়া সুন্নত। আনন্দের মুহূর্তগুলো মানুষ মিষ্টি খেয়েই সাধারণত স্মরণীয় করে রাখতে চায়।

 


ঈদের নামাজ প্রতিদিনের অন্যান্য নামাজের মতো নয়। ঈদের দুটি দিনে মাত্র দু রাকাত করে নামাজ আদায় করতে হয়। এ নামাজে যথারীতি তাকবির ধ্বনি উচ্চারণ করলেও বাড়তি আরো ছয়টি তাকবির ধ্বনি উচ্চারণ করতে হয়। বলতে হয়, আল্লাহু আকবার। এর অর্থ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। দু রাকাতের নামাজে প্রতি রাকাতে তিন বার করে ছয় বার আল্লাহ তায়ালার এই শ্রেষ্ঠত্ব বিশাল আয়োজনে অংশ নিয়ে সম্মিলিতভাবে একসঙ্গে উচ্চারণ করে আমরা মূলত গোটা বিশ্বকে জানান দেই, আমার স্রষ্টা আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর সৃষ্টি মানুষ হিসেবে আমরাও সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। হে আসমান, হে জমিন, হে আগুন, হে পানি, হে পশু, হে পাখি, হে বাতাস, হে মহাশূন্য, তোমরা সবাই জেনে রাখো, কখনোই অভিশপ্ত শয়তান আমি আদম সন্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। গোটা পৃথিবীর পথে পথে যদিও শয়তান এবং তার চেলা-চামুণ্ডাদের জয়-জয়কার সাধারণ চামড়ার চোখে দেখা যায়, প্রতিটি মুমিনের অন্তর্চক্ষু আছে, আমিও একজন মুমিন বান্দা হিসেবে সেই অন্তর্চক্ষু দিয়ে দেখছি এবং সজোরে ঘোষণা করছি, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। বনি আদম তাঁর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি। অভিশপ্ত শয়তান এবং তার দোসরদের বিরুদ্ধে ইমানের লড়াই আপসহীন; চলবে অনন্তকাল। আমরা উৎসব করবো, আনন্দ করবো; কখনোই ইবাদতের প্রসঙ্গ ভুলে যাবো না। মুসলমানের কোনো কাজই ইবাদতের বাইরে নয়। স্বামীর মুখের হাসিটিও যেমন স্ত্রীর ভাগ্যলিপিতে পুণ্য বয়ে আনে, তেমনি স্ত্রীর লম্বা কেশের দুষ্টুমিতেও স্বামীর আমলনামায় সওয়াব লেখা হয়। আহা, কত না পবিত্রতম আদর্শ জীবনব্যবস্থার নাম ইসলাম!

 

॥ চার॥

 


ঈদ মুসলিম জীবনে আনন্দ ও উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে। তা সত্য হলেও এখানেই পুরো সত্য বিদ্যমান নয়। দুটি ঈদেরই অনেক শিক্ষা, তাৎপর্য এবং দাবি রয়েছে। পরিবারে ও সমাজে, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৃথক বার্তা আছে। এ দুটি দিনের প্রতিটি আমলের বহুরৈখিক প্রভাব আছে। ঈদুল আজহায় ‘কোরবানি’ শুধু ‘ত্যাগ ও তিতিক্ষার’ শিক্ষা নিয়ে হাজির হয় না। পশু কোরবানির অন্তর্নিহিত শিক্ষা ও তাৎপর্যে এটি একটি অন্যতম দিক। যেমন ঈদুল ফিতরের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত রমজানুল মোবারকের রোজায় আত্মশুদ্ধি একটি বিশেষ দিক। যদিও সাধারণত প্রচার করা হয়, কোরবানি সর্বোচ্চ ত্যাগ শিক্ষা দেয়। রোজা আত্মশুদ্ধি শিক্ষা দেয়।

 


রোজা এবং কোরবানি দু রকম আমল তথা ইবাদত। এর মধ্যে বাহ্যিক অমিল হলো, মাসব্যাপী রোজার ইবাদত সম্পন্ন করার পর ঈদ উদযাপন করতে হয়। ঈদের দিনে রোজা রাখা যাবে না; একদম হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। কোরবানি ঈদের দিনে অথবা জিলহজ মাসের ১১ ও ১২ তারিখ মানে পরের দুটি দিনেও সম্পন্ন করার বৈধতা আছে। কোনো অবস্থায়ই ঈদের আগের দিনে একশটি পশু জবাই করলেও তা কোরবানি হিসেবে গণ্য হয় না। পবিত্র কোরআন শরিফে আল্লাহ তায়ালা রোজা এবং কোরবানি দুটি ইবাদতের আলোচনা করতে গিয়ে ‘একই উদ্দেশ্য’ বর্ণনা করেছেন। রোজার ক্ষেত্রে বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য হলো, যেন তোমরা ‘তাকওয়া’ অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। কোরবানির ক্ষেত্রে বলেছেন, ‘...কখনো এসব পশুর গোশত এবং রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না; তবে আল্লাহর কাছে পৌঁছে তোমাদের ‘তাকওয়া’। এমনিভাবে এগুলোকে তিনি তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা করো...।’ (সুরা হজ, আয়াত ৩৭)। দেখা গেল, দুটি ইবাদতেরই একই উদ্দেশ্য এমনকি একই শব্দ ‘তাকওয়া’ উল্লেখ করা হয়েছে। তাকওয়া মানে যৌথভাবে আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসাময় ইমান রাখা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমেও যেমন আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা অর্জন করতে হবে, তেমনি পশু কোরবানির মাধ্যমেও একই লক্ষ্য হাসিল করতে হবে। স্পষ্টভাষায় কোরআনে উল্লেখিত এ উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হলে রোজা আর রোজা থাকে না, নিছক উপবাসে পরিণত হয়। কোরবানি আর কোরবানি থাকে না, নিছক গোশত খাওয়ায় পরিণত হয়। তখন এগুলো ইবাদত থাকে না। সওয়াবের বদলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কপালে গুনাহ লেখা হয়।

 

 

॥ পাঁচ ॥


কোরবানির গৌরবসময় ইতিহাস আছে। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে আল্লাহ তায়ালা প্রিয় বস্তুর কোরবানি চেয়েছিলেন। প্রিয় বস্তু কী হতে পারে, একের পর এক কোরবানি করতে করতে শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠিক করলেন, বুড়ো বয়সে সন্তান ইসমাইলের চেয়ে প্রিয় তো আমার কাছে আর কিছুই নেই। অতএব, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বালক পুত্রকেই কোরবানি মানে জবাই করতে নিয়ে গেলেন। তিনি এককভাবে গোপনে এ সিদ্ধান্ত নেননি। বিষয়টি নিয়ে স্ত্রী হাজেরা এবং সন্তান ইসমাইলের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তাঁরাও আগ্রহসহকারে সম্মতি দিলেন। এরপর ঠিকই নিজের বালক সন্তানকে চোখমুখ বেঁধে গলায় আল্লাহু আকবার বলে জোরে ছুরি চালালেন। কী ভাবছেন, আমার আপনার পক্ষে তা কতটুকু সম্ভব? আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠলো। জিবরাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে তখনি জান্নাতি পশু নিয়ে ইসমাইলের জায়গায় রেখে দিলেন। কোরবানি হলো পশু। ইসমাইল যেমন ছিলেন, তেমনি রয়ে গেলেন। ইবরাহিম (আ.) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। সেই পরীক্ষা ছিল ইমানের, অবশ্যই তাকওয়ার। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে রচিত হলো নতুন ইতিহাস। যে ঐতিহাসিক ঘটনার অনুসরণে বিশ্বজুড়ে আমরা ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি করি। হজযাত্রীগণ ঠিক মিনা প্রান্তরে গিয়েই কোরবানি করে থাকেন। তখন পদে পদে ইবরাহিম, হাজেরা এবং ইসমাইল (আ.)-দের বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল শয়তান। ছোট, মাঝারি এবং বড় শয়তানেরা সম্মিলিতভাবে ‘কোরবানি’ বাধাগ্রস্ত করতে সব রকম চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করেছিল। ইবরাহিমি ইমানের জ্বলন্ত আগুনে ইবলিশি চেলা-চামুণ্ডারা জ্বলেপুড়ে সেদিন ছারখার হয়ে যায়। ‘খলিলুল্লাহ’ তথা আল্লাহর অকৃত্রিম বন্ধুর মহান উপাধি লাভ করেন ইবরাহিম (আ.)।
আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী যে যার মতো পশু কোরবানি করি। একবার দু বার নয়, প্রতি বছরই করি। প্রতি বছর কোরবানি করা ইসলামের বিধান। এদিনে বেশি পরিমাণে পশু কোরবানি উৎসাহিত করা হয়েছে। এক ঈদে নাবিয়ে কারিম মুহাম্মদ (সা.) একাই একশটি উট কোরবানি করেছিলেন। অতএব যাদের সামর্থ্য আছে, সম্ভব হলে তাদের উচিত একাধিক পশু কোরবানি করা। প্রশ্ন হলো, আমাদের পশু কোরবানির মাধ্যমে আমরা কি ইবরাহিম (আ.)-এর মতো আল্লাহর দরবারে ‘খলিলুল্লাহ’ খেতাব অর্জন করতে পারছি? এসব পশুর গোশত এবং রক্ত কিছুতেই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না। তা যেমন আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, চামড়ার চোখেও আমরা দেখছি। কোরবানির পশুর গোশত নিজেরা খাচ্ছি। স্বজনদের মধ্যে বিতরণ করছি। গরিব-অসহায় মানুষকেও দিচ্ছি। আমরা পশু জবাই করে আমরাই এগুলো খাচ্ছি। পশু কোরবানির মাধ্যমে যে ‘তাকওয়া’ আমাদের অন্তর থেকে আল্লাহ তায়ালা চাচ্ছেন, তা কি আমরা আল্লাহর আরশে পৌঁছাতে পারছি? এখানে উত্তর হবে শতভাগ হ্যাঁ, অথবা না। কোনো ধরনের পারসেনটিসের সুযোগ নেই।

 


দেশে কয়েক কোটি মানুষ অতিদরিদ্র। দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও কোটির বেশি। এই দরিদ্র এবং অতিদরিদ্রদের মধ্যে অসংখ্য মানুষ এমন আছে, যাদের বছরে একদিনও গোশত খাওয়ার ভাগ্য হয় না। অন্য দিকে অসংখ্য পরিবার এমনও আছে, যাদের ফ্রিজে গরু, ছাগল এবং মোরগের গোশত সারা বছর সব সময় থাকে। ঈদুল আজহায় ব্যাপকভাবে পশু কোরবানির এই সুযোগে ভাগ্যবঞ্চিত মানুষের মুখে গোশতের স্বাদ আসে। দুঃখ এখানেও, দিন দিন আমরা মারাÍক অমানুষ বনে যাচ্ছি, কোরবানির পশুর গোশতও এখন গরিবদের মধ্যে আগের মতো বণ্টন করা হয় না। বিভিন্ন কায়দাকানুন করে কোরবানির গোশত মাসের পর মাস সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। যে স্বজনদের বাড়িতে গোশতের কোনো প্রয়োজন নেই, সেখানে ঠিকই বেশি পরিমাণে সৌজন্য পাঠানোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠছে। যে অভাগা দরিদ্র মানুষ কোরবানির উসিলায় আগে একটু-আধটু গোশত খাওয়ার সুযোগ পেতেন, তাদের মধ্যে গোশত ‘ভিক্ষা’ দেওয়ার সংস্কৃতি বছর বছর কমছে। বিবেককে জিজ্ঞেস করুন, আমার পশু কোরবানির মাধ্যমে তাহলে কিভাবে খলিলুল্লাহ খেতাব পাবো? আদৌ কি আল্লাহর দরবারে ‘তাকওয়া’ পৌঁছাতে পারছি? ন্যূনতম মানবিকতাও যেখানে দিন দিন উঠে যাচ্ছে, সেখানে বিবেকবান মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া কীইবা করার আছে?

 

॥ শেষ কথা ॥

 


ঈদে প্রতিটি মুমিনের জীবনকে বিশেষভাবে ঢেলে সাজাতে হয়। পরিবার ও সমাজকে সম্মিলিত উদ্যোগে শুদ্ধ ও সুন্দর করতে হয়। চিন্তা ও চেতনায় যেখানে নানা কারণে ময়লা যোগ হয়েছিল, ঈদের দিনের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ইবাদতে তা ধুয়ে ফেলতে হয়। ঈদের নামাজ বড় ধরনের মাঠে আয়োজন করতে হয়। জুমার নামাজের চেয়েও ঈদের নামাজ অনেক দিক থেকেই ব্যতিক্রম। ঈদের নামাজে খুতবা দেওয়া হয় পরে, জুমার নামাজের ক্ষেত্রে খুতবা দিতে হয় আগে। ঈদের নামাজে ইমাম নির্বাচনও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এখন আমরা দেখছি, পাড়ায় পাড়ায়, মসজিদে মসজিদে ঈদের নামাজ আয়োজন হয়। মুদ্রিত বই দেখে ঈদের খুতবা (!) পড়েন ইমাম সাহেব। গোষ্ঠীভিত্তিক ঈদগাহের সংখ্যাও প্রতি বছর বাড়ছে। পুরানো এবং ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহগুলো কথিত ‘ইমাম’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ‘হৃদয়ের ব্যথা বলিতে ব্যাকুল’ হয়ে শুধু কাতরাই। ভেবে অবাক হই। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কীইবা করার আছে। তাই বলি, যে ঈদ শুধু উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে, সেই ঈদের দরকার নেই। ঈদের প্রতিটি আয়োজনে পবিত্র আলো চাই। সে আলোয় দেশকে ধুয়ে দাও। পৃথিবীকে বদলে দাও। শান্তির সুবাতাস বইয়ে দাও। এ আমাদের প্রার্থনা নয়, করুণ আর্তনাদ। মাবুদ, তুমি কি মজলুম মানুষের আত্মার আর্তনাদ শোনবে না?

 

 

ঢাকা, শনিবার
অক্টোবর ০১, ২০১৩

 

হাসানুল কাদির, প্রধান সম্পাদক, টোটালবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম