আজ বৃহস্পতিবার 7:56 am06 August 2020    ২১ শ্রাবণ ১৪২৭    16 ذو الحجة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

অমর প্রাণ মুহিউদ্দীন খান

হাসানুল কাদির, প্রধান সম্পাদক, টোটালবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৮:১৫ পিএম, ৪ আগস্ট ২০১৯ রবিবার | আপডেট: ০৮:১৭ পিএম, ৪ আগস্ট ২০১৯ রবিবার

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)

১৯৯২ কি ৯৩ সালের কথা। তখন আমি কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল থানার কাসেমুল উলুম মাদরাসায় পড়ি। বয়স ১৪ কি ১৫ বছর হবে। ওই মাদরাসায় প্রতিদিন ইনকিলাব পত্রিকা অফিস কপি হিসেবে রাখা হতো। ইনকিলাব পত্রিকাটি যে হকার প্রতিদিন গিয়ে দিয়ে যেতো, তিনিই প্রতি মাসের শুরুর দিকে মাসিক মদীনা পত্রিকাটিও বিক্রি করতেন। তার কাছ থেকে মাদরাসার একাধিক শিক্ষক এবং উপরের ক্লাসের কিছু ছাত্র মদীনা কিনতেন। শুধু মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরাই নন, সাধারণ শিক্ষিত আরো অনেককে দেখেছি, তারা নিয়মিত মদীনা কিনেন এবং পড়েন। তখন মদীনা প্রতি মাসে স্বাভাবিক গতিতে ছাপা হলেও রবিউল আউয়াল মাসের সংখ্যাটি ছাপা হতো সীরাত সংখ্যা হিসেবে, বিশাল কলেবরে। যদ্দূর মনে পড়ে, আমি জীবনের প্রথম মাসিক মদীনার কোনো একটি সীরাত সংখ্যাই কিনেছিলাম। এভাবেই মাসিক মদীনার সঙ্গে আমার পরিচয়। তখনো মদীনার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.) সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।

 


১৯৯৬ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে বিশ্ব ইজতেমার সময় পড়াশোনার উদ্দেশে আমি ঢাকায় আসি। এর আগে লাজনাতুত তালাবার (মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের সংগঠন) একটি বার্ষিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য ঢাকার চৌধুরীপাড়ায় এসেছিলাম। মাওলানা সাঈদ নিজামী আমাকে নিয়ে এসেছিলেন। লাজনার অনুষ্ঠানে যোগদানের মাধ্যমেই আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী (রহ.)-এর সঙ্গে। কথা ছিল, আমি ঢাকায় এসে মাওলানা ফরিদীর চৌধুরীপাড়া মাদরাসায় ভর্তি হবো। মূলত এ কারণেই ঢাকায় এসে প্রথমে চৌধুরীপাড়া মাদরাসায় ফরিদী সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আর্থিক সংকটের কারণে ফরিদী সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও তাঁর মাদরাসায় ভর্তি হতে পারি নি। ভর্তি হয়েছিলাম মতিঝিলের জামি‘আ দারুল উলুমে। এখানে ভর্তি হতে পারার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল জামি‘আ দারুল উলুমের সাবেক শিক্ষক মাওলানা লুৎফুর রহমান (রহ.)-এর। তাঁর বাড়ি আর আমার বাড়ি একই উপজেলায়। ঢাকাতেই প্রথম তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ-পরিচয় হয়। শুধুই আমার মেধার কথা শুনে আর ভর্তি পরীক্ষায় আকর্ষণীয় নাম্বার পাওয়ায় তিনি আমাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, আমাকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন। মতিঝিল মাদরাসায় প্রতি মাসে একটি দেয়ালিকা প্রকাশ হতো। দেয়ালিকায় আমিও লিখতাম। দেয়ালিকায় লেখার পাশাপাশি অধুনালুপ্ত দৈনিক মিল্লাতেও কিশোর কাফেলা এবং মুসলিম উম্মাহ পাতায় লিখতাম। মতিঝিল মাদরাসার খুব কাছেই ছিল তৎকালীন সময়ে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বহুল প্রচারিত পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক, ইনকিলাব এবং জনকণ্ঠের প্রধান কার্যালয়। প্রতিদিন আসর নামাজের পর থেকে মাগরিব নামাজের আগের সময়টুকু কাটাতাম ওই তিন পত্রিকার অফিসের নিচে দেয়ালে টাঙানো পত্রিকাগুলো পড়ে।

 


১৯৯৬ সালেই মাসিক মদীনার সীরাত সংখ্যার জন্য একটি প্রবন্ধ তৈরি করি। শিরোনাম ছিল ‘ইত্তেবায়ে রাসুল (সা.)’। মাদরাসার আরেকজন ছাত্র। এই মুহূর্তে তাঁর নামটি মনে পড়ছে না। সে বাংলাবাজারে মদীনা অফিসে মাঝেমধ্যে যাতায়াত করতো। তার সঙ্গেই একদিন মদীনার জন্য লেখা প্রবন্ধটি নিয়ে মদীনা অফিসে যাই। মদীনা ভবনের নিচ তলায় মদীনা পাবলিকেশন্স আর মদীনা প্রিন্টার্স। পাবলিকেশন্সের কোনো এক কর্মচারীর হাতেই সম্ভবত খামেভরা লেখাটি দিয়ে বলেছিলাম, সীরাত সংখ্যার জন্য এটি একটি প্রবন্ধ। দয়া করে সম্পাদক সাহেবের হাতে পৌঁছে দিবেন।

 


ওই বছর সম্ভবত জুন মাসে মদীনার সীরাত সংখ্যাটি বেরিয়েছিল। লেখা জমা দিলেও কল্পনায় ছিল না, আমার মতো মানুষের লেখা সীরাত সংখ্যায় ছাপা হবে। অথচ তাই হলো। সীরাত সংখ্যা হাতে নিয়ে দেখি, আমার লেখা ছাপা হয়েছে। আমার দেওয়া শিরোনামও রয়ে গেছে, ইত্তেবায়ে রাসুল (সা.)। এমনকি সীরাত সংখ্যায় প্রকাশিত আর আমার কাছে রক্ষিত মূল কপির সঙ্গে মিলিয়ে দেখি, কোনোই পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজন-বিয়োজন নেই। কী যে খুশি হয়েছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মতিঝিল মাদরাসার এক বড় ভাই আবদুল মুমিন জানালেন, তুমি মদীনা অফিসে গিয়ে সম্পাদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলো, তোমার লেখা ছাপা হয়েছে। তাহলে তুমি ৩টি মদীনা সৌজন্য পাবে এবং প্রকাশিত লেখার জন্য আর্থিক সম্মানীও পাবে।

 


দিন তারিখ মনে নেই। একা একাই দ্বিতীয় বারের মতো বাংলাবাজারে মদীনা অফিসে যাই। মদীনা ভবনের দ্বিতীয় তলায় বসেন সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)। তাঁর কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলি, হুজুর, সীরাত সংখ্যায় আমার একটি লেখা ছাপা হয়েছে। আমি আসতে পারি? আমার তখনো দাড়ি-মোচ উঠেনি। জবাবে খান সাহেব বললেন, তোমার লেখা ছাপা হয়েছে সীরাত সংখ্যায়? বললাম, জি হুজুর। বললেন, আস। আমার কাছে আস। খান সাহেবের টেবিলের সামনে ছিলেন আরো ২/৩ জন লোক। তাদের সঙ্গেই তিনি কথা বলছিলেন। খান সাহেব সীরাত সংখ্যার একটি কপি হাতে নিয়ে বললেন, কী শিরোনাম তোমার লেখার? বললাম, ইত্তেবায়ে রাসুল। বললেন, বাড়ি কই তোমার? বললাম, কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে। কোথায় পড়? বললাম, মতিঝিল মাদরাসায়। কোন জামায়াতে পড়? বললাম, শরহে জামি। উর্দু বোঝ? উর্দু থেকে অনুবাদ করতে পারবে? বললাম, জি হুজুর। পারবো। তখন তিনি মাসিক তামীরে হায়াতের (উরদু ম্যাগাজিন) একটি সংখ্যা নিয়ে সেখান থেকে আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.)-এর একটি লেখায় দাগ দিলেন। বললেন, এটি অনুবাদ করে নিয়ে এসো। এরপর তিনি পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে ৫০ টাকার একটি নোট আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আমার পকেটে যা আছে সব তোমাকে দিয়ে দিলাম। তোমার বাবাকে বল, গরু জবাই করতে হবে। আমি তোমাদের বাড়ি যাবো।

 


এই প্রথম দেখলাম মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)-কে। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই যুগ। এই সময়ে অসংখ্যবার খান সাহেবের মুখোমুখি হয়েছি। বাজারে আমার প্রায় ৩০টির মতো অনূদিত বই আছে। অনুবাদ শিখিয়েছেন খান সাহেবই। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি অনুবাদ করার জন্য একটি উর্দু ম্যাগাজিন দিলেন। আবুল হাসান আলী নদভির লেখা বোঝা যার তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর লেখা বুঝতে হলে, অনুবাদ করতে হলে দক্ষ লোকের প্রয়োজন। আমি খুব কষ্ট করে বারবার অভিধান দেখে কোনোরকম খান সাহেব নির্দেশিত তামীরে হায়াত থেকে আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.)-এর লেখাটির অনুবাদ নিয়ে পরের সপ্তাহে গিয়ে হাজির হই। তখন খান সাহেবের সামনে বসে আছেন সৈয়দ জহির সাহেব। আমার হাত থেকে খান সাহেব তামীরে হায়াত ম্যাগাজিন আর অনুবাদের কাগজগুলো নিয়েই জহির সাহেবকে দিলেন। বললেন, দেখুন তো, অনুবাদটার কী অবস্থা। ভুল হলে, এক্কেবারে ঘাড় ভেঙে ফেলবেন। জহির সাহেব আমাকে নিয়ে খান সাহেবের রুম ছাড়লেন। তার সিটে নিয়ে তিনি আমাকে কীভাবে অনুবাদ করতে হয়-তা বোঝালেন। আমার অনুবাদটাও মূল লেখার সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে ভুলগুলো দেখালেন। পরের সপ্তাহে সাপ্তাহিক মুসলিমজাহানে অনুবাদটি ছাপা হয়েছিল। এভাবেই খান সাহেবের সহযোগিতায় আমার অনুবাদের হাতেখড়ি। এরপর মদীনা মুসলিমজাহানে আমার অসংখ্য লেখা ছাপা হয়েছে।

 


২০০১ সালের ৫ অক্টোবর আমি বিয়ে করেছি। পড়াশোনা শেষ করেই প্রথমে মাসিক আদর্শ নারীতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে যোগ দিই। মাসিক আদর্শ মা নামে একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদক মালিক হলেন মাওলানা আনওয়ারুল হক। তিনি গুলশানের একটি মসজিদের খতিব, একটি মহিলা মাদরাসারও প্রিন্সিপাল। পাশাপাশি সউদি আরব থেকে বিভিন্ন দান-খয়রাত আনেন। আদর্শ নারীতে ছিলাম বিভাগীয় সম্পাদক, আদর্শ মা’র প্রস্তাব নির্বাহী সম্পাদক। আদর্শ নারীতে থাকা-খাওয়ার বাইরে তখনই আমাকে বেতন দেওয়া হতো সাড়ে তিন হাজার টাকা। আদর্শ মা কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব দুই কক্ষ বিশিষ্ট একটি সেফারেট বাসা দেওয়া হবে। খাওয়া ফৃ। বেতন দেবে ৭০০০ টাকা। এমন লোভনীয় প্রস্তাব পেয়ে আদর্শ নারীর চাকরি ছেড়ে যোগ দিলাম আদর্শ মা-এ। আদর্শ মা-এ যোগ দিয়েই বিয়ে করি। কী আর বলবো, আদর্শ মা-এর মালিক নিজের একটি টিনশেড বাড়িতে দুই রুমের বাসা দিলেও ৪ মাস তাঁর অধীনে ছিলাম। এক মাসের বেতনও এখন পর্যন্ত পরিশোধ করেননি। আমাকে চাপ দেন পত্রিকা বের করো, কিন্তু কাগজ কেনা, প্রেস খরচ বাবদ এক টাকাও দেন না। আরো যা যা শর্ত ছিল, সেসবের একটিও তিনি পূরণ করেননি। নিষ্ঠুরতা আর ভণ্ডামির নতুন একটি সংজ্ঞা পেলাম মাওলানা আনওয়ারুল হকের কাছে। নতুন বিয়ে করেছি। শ্বশুর বাড়িতে বলেছি, বউ ঢাকায় থাকবে। এহেন পরিস্থিতিতে কী করি? অনেক চিন্তা-ভাবনার পর একদিন গেলাম মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)-এর কাছে। এসব বিষয় জানানোর পর তিনি বললেন, ঠিক আছে। তুমি কাল থেকে মদীনায় আস। পরের দিন থেকেই মদীনায় প্র“ফের কাজ শুরু করি। এখানে মাস তিনেক প্র“ফের কাজ করার পর এক বন্ধু অবসর প্রকাশনা সংস্থায় সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সময়ে প্র“ফ কাটারই চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। মদীনায় কাজ করতে হতো দুপুর ৩টা থেকে রাত ৮/৯টা পর্যন্ত। অবসরে গিয়েই মূলত আমি ভালোভাবে প্র“ফ কাটা যেমন শিখেছি, তেমনি বাংলাভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কেও যতটুকু জানার জেনেছি। কারণ, সেখানে ভাষাবিজ্ঞানী ড. হায়াৎ মামুদ স্যারের সান্নিধ্য লাভ করেছি। মদীনা আর অবসরে থাকাকালীন একদিন যাই ইনকিলাব অফিসে। এর আগেও বহুবার ইনকিলাবে গিয়েছি, এবং পত্রিকাটির বিভিন্ন সাংবাদিক-লেখকের সঙ্গেও পরিচয় ছিল। আমার অনেক লেখাও ইনকিলাব ছেপেছে। ওই দিন রাত ৭টা সাড়ে ৭টার দিকে গিয়ে সাক্ষাৎ করি মরহুম লুতফুল খবীর ভাইর সঙ্গে। তিনি ছিলেন ইনকিলাবের সহকারী সম্পাদক এবং আদিগন্ত পাতার সম্পাদক। তাকে বলি, ভাই ইনকিলাবের প্র“ফ সেকশনে আপনি ইচ্ছা করলে আমাকে ঢুকিয়ে দিতে পারেন। আমি তো মদীনা এবং অবসরে প্রুফ রিডার হিসেবে কাজ করছি। খবীর ভাই সঙ্গে সঙ্গেই ইনকিলাবের প্র“ফ ও কম্পিউটার সেকশনের ইনচার্জ ফারুক সাহেবকে ফোন করে আমার জন্য সুপারিশ করলেন। তাঁর এই সুপারিশেই পরের দিন থেকে আমি ইনকিলাবের প্রুফ সেকশনে যোগ দিই। এই প্রথম কোনো দৈনিক পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ পেলাম। বলুন তো, খান সাহেব হুজুর যদি আমাকে প্রুফের কাজ না দিতেন, তাহলে কি আমি অবসর বা ইনকিলাবে চাকরির চান্স পেতাম?

 


আমার লক্ষ্য লেখক হওয়া নয়। লেখক আমি ৮ম শ্রেণি থেকেই। সাংবাদিক হতে হবে। দৈনিক পত্রিকায় কাজ করতে হবে। প্রুফে হোক, তবু তো দৈনিক পত্রিকায় কাজ করছি। এটা এক ধরনের সান্ত্বনা। কিন্তু এই সান্ত্বনাতেই সন্তুষ্ট হতে চায় না আমার মন। ইনকিলাবে তখন উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন মরহুম আনোয়ার জাহিদ। বার্তা সম্পাদক ছিলেন মরহুম মোহাম্মদ মুসা। আর ইনকিলাব সম্পাদক বাহাউদ্দীনের বিশেষ দায়িত্ব পালন করতেন তারেক সাহেব। এই তিনজনের সঙ্গেই আমি বহুভাবে এমনকি বিনা বেতনে হলেও ফিচার বা রিপোর্টিংয়ে কাজ করার সুযোগ চেয়েছি। তারেক সাহেব ভদ্রভাবে বললেন, আমরা অভিজ্ঞ কিছু লোক নেব। আপনাকে নেওয়া সম্ভব হবে না। আনোয়ার জাহিদ সাহেব থেকে কোনো জবাব পাইনি। মুসা ভাই আমাকে অনেক কাছে টেনে নিলেন। চাকরি দেওয়ার বিষয়ে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে বললেন, আপনি প্রতিদিন আমার কাছে আসবেন। সাংবাদিকতা বিষয়ে আপনাকে আমি বিশেষ দিকনির্দেশনা দেব। ইনকিলাবে না হোক, অন্য কোথাও যদি সুযোগ পান, তাহলে কাজে লাগবে। প্রতিদিন দুপুরে অথবা রাত ১১টায় পত্রিকার প্রথম সংস্করণ চলে যাওয়ার পর মুসা ভাই আমাকে সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতেন। হঠাৎ একদিন দৈনিক মানবজমিনে শিক্ষানবিশ রিপোর্টার নেওয়ার বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। ৬৬ জনের মধ্যে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাত্র ৯জন মানবজমিনে চান্স পেয়েছিলাম। বেতন কত জানা নেই। পদ স্টাফ রিপোর্টার। মাস শেষে জানলাম, বেতন ৫০০০ টাকা। সাথে ৩০০ টাকা মোবাইল বিল। এক বছরের মাথায় মানবজমিন ছেড়ে ১৫০০০ টাকা বেতন, অফিস থেকে মোটর সাইকেল, ১০০০ টাকা মোবাইল বিলসহ আরো অনেক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যোগ দিই দৈনিক যায়যায়দিনে। এরপর দৈনিক ডেসটিনি, বাংলানিউজ এবং কালের কণ্ঠের মতো পত্রিকায় দাপটের সঙ্গেই বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি। হয়েছি সাংবাদিক। আলেম পরিচয় ছাপিয়ে আমি এখন সাংবাদিক। বাংলাদেশে কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করে মূলধারার পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করুয়া প্রথম ব্যক্তি একমাত্র আমিই। আচ্ছা বলুন, মুহিউদ্দীন খান সাহেব (রহ.) যদি মদীনা/মুসলিমজাহানে কাজের সুযোগ না দিতেন, তাহলে কি আমি সাংবাদিক হতে পারতাম?

 

#  মতপ্রকাশ ও ধর্মবিরোধিতা এক নয়


আমার ছাত্রজীবন থেকেই স্নেহ পেয়েছি মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের। ১৯৯৬ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত আমার জীবনের পরতে পরতে খান সাহেবের অবদান খুঁজে পাই। তাঁকে ঘিরে স্মৃতিচারণ করতে গেলে হাজার পৃষ্ঠার বই হয়ে যাবে। সর্বশেষ খান সাহেবকে দেখেছি শমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। সঙ্গে ছিলেন আমার বন্ধু মাওলানা সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ। কিছুটা সময় তাঁর সান্নিধ্যে কাটিয়ে বলেছিলাম, হুজুর, আপনি আমাকে এমন একটি নসিহত করুন, যেন সারাজীবন মেনে চলতে পারি। জবাবে তিনি বললেন, ‘অনেকেই তোমার ক্ষতি করতে চাইবে, তুমি কারো ক্ষতি করো না।’ খান সাহেবের এই নসিহতই আমার জন্য অমূল্য উপহার। এই নসিহতটি শুধু নসিহত নয়, এটিই আমার খান সাহেব। এই নসিহতটির যেমন মরণ নেই, তেমনি আমার কাছে খান সাহেবেরও মরণ নেই। মুহিউদ্দীন খান, আমার কাছে এক অমর প্রাণ।

 

হাসানুল কাদির : প্রধান সম্পাদক, টোটালবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম

জাতীয়-এর সর্বশেষ খবর