Total Bangla Logo
For bangla আজ বৃহস্পতিবার 12:38 am
27 July 2017    ১১ শ্রাবণ ১৪২৪    02 ذو القعدة 1438

সোনার বাংলা শশ্মান হলো কেন

আবু মহি মুসা

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ১১:২৬ পিএম, ৮ মে ২০১৭ সোমবার

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা

গত ৩ মে, ২০১৭ তারিখ একটি দৈনিক পত্রিকায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, ‘এশিয়া নতুন অর্থনেতিক শক্তি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর  যখন স্বাধীনতা লাভ করে তখন তাদের কোনো প্রাকৃতকি সম্পদ ছিল না। ২০ লাখ মানুষের চাহিদার তুলনায় খাদ্যে উৎপাদনও ছিল সামান্য। সেই অবস্থা থেকে ৫২ বছরের মাথায় ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রটিই এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাণভোমরা। ১৯৬০ সাল থেকে ৯০ এর দশক পর্যন্ত দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সিঙ্গপুরসহ হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইয়নকে এনে দিয়েছে এশিয়ান টাইগার উপাধি।এই তালিকায় যুক্ত হবার অনেক সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কি জানে বাংলাদেশের দুর্নীতি সূচক। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখা যায়, অনেক সংস্থা বাংলাদেশের প্রশংসায়  পঞ্চমূখ। বাংলাদেশের মানুষ জানে বাংলাদেশ বর্তমানে কোন অবস্থানে আছে। দেশটাকে বর্তমান সরকার এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেছে, কোনো কোনো মন্ত্রি বলছেন, আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় যেতে না পারে তাহলে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া যাবে না।

স্বাধনিতা পূর্বকালে একটি জাতীয় শ্লোগান ছিল, ‘ সোনার বাংলা শশ্মান হলো কেন?’ এরকম শ্লোগানের মধ্য দিয়েই পূর্ব পাকিস্তান নামক দেশটি বাংলাদেশ নামে স্বাধীন হলো। পাকস্তিানরিা এদেশের সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। এ কারণেই রাজনীতিবিদরা আমাদের বুঝিয়েছেন, আমাদের দেশটাকে ওরা শশ্মানে পরিণত করেছে। এ থেকে নিস্তারের জন্যই তো এদেশকে স্বাধীন করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই যা দেখতে পাই, তাতে আমদের মতো লোকদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে যাবে।

গত ৩.৫.২০১৭ তারিখে বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিউজের একটি শিরোনাম দেখে এ কথাগুলো বলতে বাধ্য হলাম। শিরোনামটি ছিল এরকম, ‘সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা পাচার’। জিএফআই প্রতিবেদনে ১০ বছরের চিত্র, ২০১৪ সালে পাচার হয়ে গেছে ৭২ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১০ বছরে পাচার করা হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে এই অর্থ পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন ভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। সংস্থাটি প্রতি বছর বিশ্বের দেশগুলো থেকে অর্থ পাচারের পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করে থাকে। সর্বশেষ গত ১ মে ‘উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অর্থ পাচার: ২০০৫-২০১৪ ‘ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে এ বিপুল অর্থ পাচারের কথ বলা হয়েছে। ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে মোট ৪৬ হাজার কোটি থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা।  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশাল অংকের এই অর্থে বাংলাদেশের দুই বারের  জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা সম্ভব। এই অর্থ দিয়ে সম্ভব তিনটি পদ্মা সেতু বানানো । বাংলাদেশ ব্যাংক  ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দেশ থেকে প্রতি বছর অর্থ পাচাররোধ করতে বিভিন্ন ধনের উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।  ফলে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ বেড়েই চলছে। ২০১৪ থেকে ২০১৫ এই দুবছরে  বাংলাদেশিরা ৩৬০ কোটি টাকার বেশি সুইস ব্যাংকে পাচার করেছে। সেই সঙ্গে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম নেওয়া এবং কানাডায় বেগমপাড়া তৈরি করেছে বাংলাদেশিরাই। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের কারণ মূলত তিনটি। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে  দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলে অর্থ পাচারও বেড়েছে। এ ছাড়া দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায়, রাজনৈতিক অনিশ্চতয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থ পাচার বেড়েছে।

দেশ থেকে অর্থ পাচার একটি বড় ধরনের অপরাধ। এ অপরাধ রোধের জন্য সরকার রয়েছে। সরকার কি তহালে অর্থ পাচার রোধে ব্যর্থ? একমাত্র দুর্নীতির ক্ষেত্র ছাড়া কোন ক্ষেত্রে সরকার স্বার্থক। সরকার বলছে, আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে পৌঁছে গেছি। এ প্রসঙ্গে একটি গল্পের কথা মনে পড়ছে। গল্পটা ছিল এরকম-  দুই প্রতিবেশির মধ্যে একটা মুরগী নিয়ে প্রথমে ঝগড়া, পরে মারামারি। ফলে একজন নিহত হয়েছে। থানায় মামলা হয়েছে। এবার হত্যা মামলার বিচার। তাদের দুজনের মধ্যে মারামারি হয়েছে কেউ দেখেনি। সাক্ষীর স্বাক্ষ্য দিতে হবে। কোর্টে একজন সাক্ষী হাজির করা হলো। আসামী পক্ষের উকিল সাক্ষিকে জিজ্ঞেস করলেন, অপনি কি মারামারির সময় সেখানে ছিলেন? সাক্ষরি উত্তর জ্বি ছিলাম। যে মুরগী নিয়ে মারামারি হয়েছে, মুরগীটা কি দেখেছেন? উত্তর জ্বি দেখেছি। এবার প্রশ্ন মুরগীটা কত বড় ছিল? সাক্ষি  সাক্ষীর কাঠগোড়া দড়িয়ে শুধু ডান  হাত উবুর করে ধরছে।  উকিল বললেন, মুরগীটা কি হাতির মতো, না গরুর মতো?   তলে হাত দেন।

যারা উন্নয়নের মহা সড়কে পৌঁছে গেছেন তারা কিন্তু তলে হাত দেননি। দেশে ফ্লাইওভার এবং  পদ্মা সেতু নির্মাণ উন্নয়নের মাপকাঠি নয়। তাই যদি হয়, তাহলে উন্নয়ন দেখা যাবে মালীবাগ মোড়ে, উন্নয়ন দেখা যাবে যাত্রাবাড়ী। নদীতে ঢেউ উঠলে তারও একটা ছন্দ আছে। এ দুই জায়গার রাস্তার যে অবস্থা, যে ভাবে বাসগুলো লাফিয়ে ওঠে উন্নয়নের চোটে তাতে কখন কার মাজা ভেঙ্গে যায় বলা যায় না।

যুব কর্ম সংস্থা যুবকে ৩৫ লক্ষ লোক, ডেস্টিনিতে ৪৫ লক্ষ এবং স্টকএক্সেঞ্জে ৫০ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কাজ করে আসছিল। এতগুলো লোক আজ  পথে বসে গেছে। এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। মাননীয় অর্থমন্ত্রি বললেন, যুবক নিয়ে আমাদের কারো কিছু নেই। কার করার আছে মন্ত্রিমহোদয়? পরিবহনের সিটিং! সার্ভিসের নামে যত্রীদের হয়রানী করা হচ্ছে। সড়ক মন্ত্রি বললেন, পরিবহনের মালিকরা প্রভাবশালী। আমরা ব্যর্থ। ব্যর্থ হলে আপনারা পদত্যাগ করুন। এভাবে তো দেশ চলতে পারে না। অযোগ্য লোকরা দেশ চালাচ্ছে। কাজেই দেশ যে  কোথায় গিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে এটা বোঝা যাবে ধীরে ধীরে। ৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মন্ত্রিরা গ্যানম্যানের বাসায় গিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। ৪১ বছর পর ক্ষমতা থেকে সত্তেও গিয়ে আর পালাতে হবে না। এতদিন বাঁচলে তো?
 
বিএনপি সরকারের আমলে কোন কোন মন্ত্রির কত টাকার মালিক হয়েছিলেন এবং কোন কোন মন্ত্রির সেকেন্ড হোম রয়েছে বিভিন্ন দেশে।  এর একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছি দৈনিক ইনকলিাবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর এর পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে, কে কত টাকার মালিক এবং কোন কোন দেশে তাদের সেকেন্ড হোম রয়েছে।

দেশপ্রেম হচ্ছে একটি দেশরক্ষার বজ্রকঠিন দেয়াল। রাস্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, দেশপ্রেমের মধ্যে থাকতে হবে জ্ঞান, সততা, ন্যায়পরায়নতা এবং  ত্যাগ। আমাদের রাজনীতিবিদদের ত্যাগ আছে, তবে নিজের স্বার্থে। দেশ বা জনগণের  স্বার্থে  নয়।

লেখক : দার্শনিক।