আজ বৃহস্পতিবার 10:05 pm21 September 2017    ৬ আশ্বিন ১৪২৪    29 ذو الحجة 1438
For bangla
Beta Total Bangla Logo

শেখ হাসিনার সব দাবি অক্ষরে অক্ষরে মানতে হবে ইনডিয়াকে

তাকরিম হাসান, বিশেষ প্রতিনিধি

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ১২:৫৭ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০১৭ সোমবার

শেখ হাসিনা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ

শেখ হাসিনা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ

তিস্তাকে এড়িয়ে তোর্সা, সঙ্কোশ ও রাইদাক নদীর পানি বণ্টন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বিকল্প প্রস্তাবে আশাহত হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অফিসারের বরাতে ইনডিয়ান সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার জানিয়েছে, তোর্সার পানি কখনওই তিস্তার বিকল্প হতে পারে না। মমতার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ।  বিশেষজ্ঞদের মতে, তোর্সার পানি বণ্টনও খুব সহজ হবে না। এজন্য প্রয়োজন আরও সময়।

মমতার বিকল্প প্রস্তাবে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও বিবৃতি দেয়নি বাংলাদেশ সরকার। দিল্লির মতো বাংলাদেশও মমতার এই প্রস্তাবে গুরুত্ব দিতে চায় না বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার।

 

আরও পড়ুন : আবার পড়ুন, জানমাল সব কেড়ে নেয় কালেমা জামায়াত



প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অফিসার আনন্দবাজারকে জানান, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দিল্লিতে আসায় তারা আনন্দিত হয়েছিলেন। সকালে মোদি যেভাবে তাকে পাশে নিয়ে তিস্তা চুক্তি নিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষার আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাতে স্বস্তিতে ছিলেন তারা। পরে মমতা যে কথা প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, তাতে আনন্দের কিছুই থাকলো না।

তিনি বলেন, ‘তোর্সার প্রস্তাব বিবেচনার উপযুক্ত নয়। ৩৪ বছর ধরে আলোচনার পরে তিস্তা নিয়ে ইনডিয়া ও বাংলাদেশের কূটনীতিকরা একটি জায়গায় পৌঁছেছেন। তোর্সা নিয়ে আমরা আবার সেই প্রক্রিয়া শুরু করব নাকি?’

বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক অফিসার জানান, তিস্তা ও তোর্সার অববাহিকা এক নয়। তিস্তার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে এই নদীর অববাহিকায় একটি বিস্তীর্ণ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যে রংপুর জেলার একটি গোটা বিভাগ রয়েছে। ভূ-প্রকৃতিগত কারণে তোর্সার বাড়তি পানি খাল কেটেও আনা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল থেকে তোর্সা ছাড়া জলঢাকা ও রায়ডাক নদী বাংলাদেশে বয়ে এসেছে। খুব বেশি দূর না এসেই তারা বিভিন্ন নদীতে মিশে যাওয়ায় তিনটি নদীর অববাহিকা ছোট। এই কারণে এগুলো বাংলাদেশে কোনও গুরুত্বপূর্ণ নদী হিসেবেই বিবেচিত হয় না। তিস্তার অববাহিকা অনেক বড়। এই অববাহিকায় দ্বিতীয় কোনও বড় নদী না-থাকায় তিস্তার জলের কোনও বিকল্প নেই। তোর্সা, জলঢাকা বা রায়ডাকে ইনডিয়া বাড়তি পানি দিলেও তিস্তা অববাহিকার দুর্দশা ঘুচবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘যৌথ নদী কমিশন গড়ে ১৯৮৩ সাল থেকে তিস্তা নিয়ে আলোচনা চলছে দিল্লি ও ঢাকার। মমতার প্রস্তাব মেনে তোর্সা-জলঢাকা-রায়ডাক নিয়ে আবার নদী কমিশন গড়ে আলোচনা শুরু করতে হলে, পানি কবে পাবে বাংলাদেশ? সুতরাং সময়ের কারণেও এই প্রস্তাবটি অর্থহীন। কারণ- তিস্তা অববাহিকার যা পরিস্থিতি, তাতে এই অঞ্চলে এখনই পানি না-এলে বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।’

এ সময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দু’দেশের কূটনীতিকদের কথায় মনে হয়, তিস্তা চুক্তি শুধুই শেখ হাসিনার ভোটে জেতার চাবিকাঠি। এই অঞ্চলের মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি কেউ উল্লেখই করেন না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক অফিসার জানান, ‘হাসিনার সফরে বিভিন্ন বিষয়ে সাফল্যের মধ্যে একমাত্র মন খারাপের বিষয় তিস্তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য। এ যেন ভাত চেয়ে চুইংগাম পাওয়া। বিষয়টি কীভাবে হালকা করা যায়, আমরা এখন সে চেষ্টা করছি।’

 

আরও পড়ুন : এপৃল ফুলের ইতিহাস থেকে বিশ্ব মুসলিমের করণীয় কী, জানুন, জানান দিন



তোর্সার পানি নেওয়া খুব সহজ হবে না বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হয়ে তিস্তা রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন নদী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ কল্যাণ রুদ্র।

তিনি মনে করেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে, তোর্সা বা ধরলার মতো নদীগুলো থেকে খাল কেটে বাড়তি জল তিস্তার দিকে নিয়ে যেতে হবে। সেটা মুখে বলা যতটা সহজ, কাজে করা ততটাই কঠিন।

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ডুয়ার্সের গহীন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এই খাল কাটতে হবে। তাতে পরিবেশ ও ইকোলজির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাছাড়া বর্ষায় এই নদীগুলো সব ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে- তাই সে সময় এই পশ্চিমমুখী খাল চালু রাখতে গেলে ভায়াডাক্ট বা একোয়াডাক্টও তৈরি করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রযুক্তির দিক থেকে হয়তো এই ধরনের খাল কাটা সম্ভব, বাস্তবে কাজটি খুব কঠিন। সার্বিক ইকো-হাইড্রোলজির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে এবং এর প্রভাব কী হবে-সেটা সমীক্ষা না-করে তড়িঘড়ি কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন হবে না বলেই আমি মনে করি।’

এছাড়া পরিবেশগত ছাড়পত্র মিললেও, প্রকল্পটি শেষ করতেই আসলে অনেকটা সময় লাগবে বলে মনে করেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিদ্যার অধ্যাপক সুবীর সরকার।

তিনি বলেন, ‘সময় কত লাগবে তা নির্ভর করছে অর্থায়নের ওপর, সরকারের ইচ্ছা কতটা জোরালো তার ওপর। খুব তাড়াতাড়িও যদি করা হয়, তার পরেও এই প্রকল্প শেষ হতে বছর কয়েক তো লাগবেই। খাল কাটা ছাড়াও তার আগে গবেষণার প্রশ্ন আছে, পরিবেশগত সমীক্ষার কাজ আছে- এটা আসলে একটা বিরাট প্রকল্প!’

বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত সংকট ছাড়াও আরেকটি সমস্যা রয়েছে তোর্সার পানি বণ্টনে। সেটা হলো এই নদীর উৎপত্তি ভুটানে। ফলে দুই দেশের জায়গায় তিন দেশের মাঝেও চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করেন ইনডিয়ান বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ দেবপ্রসাদ রায়।

তিনি বলেন, তিস্তা শুধু ইনডিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হলেও তোর্সার উৎপত্তি ভুটানে- ফলে তোর্সার পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে তৃতীয় একটি দেশের (ভুটান) মতামতও গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র : আনন্দবাজার ও বিবিসি


গোল্ডেন ওয়াটার সিলেক্ট-এর উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ইসলামিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল কাদির বলেন, তোর্সা কিছুতেই তিস্তার বিকল্প হতে পারে না। মমতা যে ভণ্ডামি করছেন, শেখ হাসিনার চাহিদামাফিক সব দাবি আদায় না হলে প্রয়োজনে গোল্ডেন ওয়াটার সিলেক্ট বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিসসা আদায় করবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে ইনডিয়ার সঙ্গে কোনো প্রকার আপসের প্রয়োজন নেই। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার অনুমতি পেলে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সঙ্গে গোল্ডেন ওয়াটার সিলেক্ট সমুদ্রে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিসসা আদায়ে সবসময় প্রস্তুত। ইনিডয়াকে শেখ হাসিনার প্রতিটি দাবি অক্ষরে অক্ষরে মানতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন জনাব হাসানুল কাদির।