আজ শনিবার 5:20 pm08 August 2020    ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭    18 ذو الحجة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

লাশের মিছিল থামাবে কে?

নাদিম মাহমুদ

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ১১:০৯ এএম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার

লাশের মিছিল থামাবে কে?

লাশের মিছিল থামাবে কে?

জাপানে আসার একবারেই শুরুর দিকের কথা। একদিন ল্যাব থেকে রাত আড়াইটার দিকে সুনসান পথে সাইকেলকে সঙ্গী করে ডরমিটরিতে ফিরছি। চার মাথার একটি রাস্তায় যে সিগন্যালটি ছিল যা ৪/৫ কদমে পার হওয়া যায়, সেটি পার হবো এমন সময় দেখি ‘লাল বাতি’ জ্বলে উঠছে। আশে পাশে চেয়ে দেখলাম কেউ নেই। ফাঁকা রাস্তা দেখে সহজে পার হয়ে গেলাম।
দ্বিতীয় দিন এই রকম ফাঁকা রাস্তা, কিন্তু একজন জাপানি দাঁড়িয়ে আছেন। এইবারও ফাঁকা দেখে পার হয়ে গেলাম। ভদ্রলোক আমার দিকে একবার শুধু তাকালেন। কিন্তু কিছু বললেন না।

এইভাবে তৃতীয়দিন রাতে ফিরছি। সিগন্যালে ‘লাল বাতি’ জ্বলে উঠছে। এমন সময় সেই জাপানি যিনি আমাকে ফাঁকা রাস্তা দেখে লাল বাতি জ্বলা অবস্থায় পার হতে দেখেছেন, সেই ব্যক্তি কাছে এসে ‘মাথা ন্যুয়ে’ পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতেই তিনি জানালেন, আমার ল্যাবের পাশের বিল্ডিং এক ল্যাবে তিনি কাজ করেন। যাই হোক, চেহারায় ভারতীয় ভাবখানা দেখে উনি ধরেই নিলেন আমি ভারতীয়। তাই আমাকে বলে বসলেন, আপনাদের ভারতে ট্রাফিক সিগন্যাল নেই?
আমি বললাম, আমি ভারতীয় নই, বাংলাদেশি। হ্যাঁ, আমাদের দেশেও ট্রাফিক সিগন্যাল আছে। তবে এই রকম ছোট ছোট রাস্তায় থাকে না।

এবার জাপানি ব্যক্তি বললেন, তাহলে ওই সিগন্যাল আপনি কখনো মেনে চলেননি?
লজ্জায় পড়ে গেলাম। ভদ্রলোক আমাকে বললেন না যে সেদিন আমি লাল বাতি জ্বলা অবস্থায় পার হয়ে গেছি। কিন্তু কৌশলে দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন।

আমি একটু মাথা নিচু করে বললাম, আসলে যখন রাস্তা ফাঁকা থাকে তখন কেউ এভাবে সিগন্যালের জন্য ওয়েট করে না।

ভদ্রলোক তখন শুধু বললেন, হুম। দেখুন এটা জাপান। এখানে আপনি ট্রাফিক রুল ভঙ্গ করলে আপনাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। যেহেতু আপনি নতুন এসেছেন, তাই হয়তো অনিচ্ছাকৃত ভুলটি করেছেন। আশা করি, এরপর আপনি আর ভুলে যাবেন না।

সবুজ বাতি জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা পার হলাম। এরপর সমগ্র রাস্তা হেঁটে এসেছি আর ভেবেছি, আসলেই তো ভুল করে ফেলছি। এর কয়েকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিভাবে বাই সাইকেল চালাতে হয়, কিভাবে ট্রাফিক নিয়ম মানতে হয়, তা দেখে শরীর শিউরে উঠেছে। এখানে কোন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে সেই ব্যক্তির পুরো চিকিৎসা খরচ থেকে শুরু করে পুরো পরিবারের জন্য দণ্ডিত ব্যক্তিকে বহন করতে হয়, যা আমাদের দেশের টাকার হিসেবে ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে বলতে গেলে সমগ্র জাপানে কয়েক মিনিট পর পর ট্রাফিক সিগন্যাল চোখে পড়ে। আর পুরো রাস্তায় সিসিটিভি সার্ভিলেন্স করা। মূলত জাপানের পুলিশ থানা বা পুলিশ ফাঁড়িতে বসে বসে ট্রাফিক সিগন্যাল ও ট্রাফিক রুল মনিটর করে। রাস্তায় পুলিশ দেখলে বোঝা যায় কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। অথচ কোথাও কোনো ট্রাফিক পুলিশ থাকে না। পরে ল্যাবমেটদের কল্যাণে জানতে পেরেছিলাম, জাপানি শিশুরা যখন স্কুলে ভর্তি হয়, তখনই তাদের শিক্ষার প্রথম পাঠ হলো ‘ট্রাফিক নিয়ম’।

মাস দুয়েক আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নোটিশ দিয়েছিল ‘প্রতিটি সাইকেল’ চালকের সাইকেল ইনস্যুরেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। সেটিও করেছিলাম। এখন রাস্তায় বের হলে, ওই সেদিনের কথাটি মনে পড়ে যায়। গত দুই বছরে ভুলেও লাল বাতি জ্বলা অবস্থায় রাস্তা পার হইনি। এমনকি গভীর রাতে ল্যাব থেকে ফেরার সময় পুরো রাস্তা ফাঁকা দেখেও কখনো সিগন্যাল ভাঙার দুঃসাহস হয়নি।

এখানে রাস্তায় কখনো গাড়িগুলোকে হর্ন দিতে শুনিনি। সারি সারি গাড়ি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, কখনো ওভারটেকও করতে দেখি না। সাইকেল রিং কিংবা গাড়িতে হর্ন দেয়া মানে ‘সে কোনো বিপদে আছে’। ভুলেও কখনো দুই বছরে সাইকেলে রিং দিতে হয়নি।

দিন শেষে যখন বাসায় ফিরলাম, তখন অনলাইন পোর্টালগুলোতে দেখলাম সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল। এই লাশের মিছিল থামবে কবে? কবে পরিবারগুলোর কান্না থামবে? আমাদের দেশের যে সিগন্যালগুলোর অধিকাংশ অকেজো কিংবা বাতি-জ্বলা নেভার মধ্যেই থাকে। এই জ্বলা নেভার মধ্যে নিভে যায় অসংখ্য জীবন প্রদীপ। আনন্দের যাত্রা হয়ে যায় কান্নার।

মূলত কড়াকড়ি ‘শাস্তির বিধান’ না থাকা এবং সহজে লাইসেন্স পাওয়াটাই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সারাজীবনের চিকিৎসাসেবা, ভুক্তভোগীর পরিবারের খরচ এবং নির্দিষ্ট অংকের টাকা জরিমানার বিধান রেখে সরকার একবার একটা আইন করে দেখাক দেখি। এছাড়া দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির লাইসেন্স বাতিল, ৮/১০ বছরের জেলেল বিধানও থাকতে হবে। হয়তো বলবেন, আইন আছে প্রয়োগ নেই। তো যে আইনের প্রয়োগ নেই সেই আইনের প্রয়োজনটা কী? আইনের প্রয়োগ ঠিকই হয়, যখন কেউ গণতন্ত্রকে হারিকেন ধরিয়ে দেয়, তখন ৫৭ ধারা খাড়া হয়ে যায়।

আঙুল কচলিয়ে উন্নতি হয় না। অসভ্যতার চর্চা করে সভ্যতার ছাতা খুঁজতে যাওয়া মূলত ভণ্ডামি। ফাটা কেষ্টর সংসাজ না হলেও চলবে। ঘরে বসেই নিয়ন্ত্রিত হবে ট্রাফিক, যদি আমরা হতে পারি সভ্য।

লেখক: সাংবাদিক, জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত