আজ বৃহস্পতিবার 6:34 am09 July 2020    ২৪ আষাঢ় ১৪২৭    18 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

পাঞ্জাব ইউনিভারসিটিতে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ

কলেজ-ভারসিটির ছাত্র-ছাত্রীদের বলছি : মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.

অনুবাদ : হাসানুল কাদির

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০২:২৯ পিএম, ১৩ জুলাই ২০১৯ শনিবার

একটি প্রতীকী ছবি

একটি প্রতীকী ছবি

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, পাঞ্জাব ইউনিভারসিটির ইসলামিয়াত বিভাগ আমাকে তাদের প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের সম্বোধন করার সুযোগ দিয়েছে। আমিও একজন শিক্ষার্থী। শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত এভাবেই আমার জীবন কেটেছে। আপনারা জানেন, ছাত্র-ছাত্রী হওয়ার অর্থ স্কুল-মাদরাসার নির্ধারিত সিলেবাস সমাপ্ত করা নয়; বরং এটি এমন এক ব্যাধি যে এর শিকার হয়েছে, মৃত্যু পর্যন্ত তার নিষ্কৃতি নেই। হযরত ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান রহ.-এর মূল্যবান উক্তি সম্ভবত আপনারা জানেন, যার অর্থ আমাদের এই সাধনা অর্থাৎ ইলম-অন্বেষণ, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত।

 

মাসতুরাত-এর পর্দারক্ষা


আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি, এ বিভাগের দায়িত্বশীলরা সঠিক ইসলামি আদর্শ অনুসরণ করেছেন। সহশিক্ষার পরিবর্তে ছাত্র-ছাত্রীদের আলাদা পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছেন। আমার বক্তৃতায় আমি যদিও ‘ছাত্র’ শব্দ ব্যবহার করব, কিন্তু ছাত্রীরাও তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। একে কুরআনি পদ্ধতি মনে করেই আমি তা অবলম্বন করেছি। কুরআন মজিদ বিভিন্ন জায়গায় ‘হে মুমিনগণ’, ‘হে লোকসকল’ ইত্যাদি শব্দে সম্বোধন করে মা-বোনদের পর্দারক্ষা করেছে। যদিও মুমিন পুরুষ ও নারীা উভয়ই ওই সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত।

 

কুরআনের এই বিশেষ ভঙ্গির কারণে কোনো স্বল্পবুদ্ধি লোকের মনে যদি এই ধারণা সৃষ্টি হয় যে, এতে নারীর মর্যাদা কমানো হয়েছে, তাহলে কুরআন মজীদেই এর জবাব রয়েছে। কিছু আয়াতে মুমিনদের পাশাপাশি মুমিন নারীদেরও উল্লেখ করা হয়েছে। একস্থানে ‘ইয়া নিসাআন নাবি’ বলে বিশেষভাবে নারীদের সম্বোধন করা হয়েছে। কুরআন মজিদের এই ভঙ্গি নারীদের জন্য পর্দা ও লজ্জাশীলতার সূক্ষ্ম পয়গাম বহন করে।

আমি এই অনুষ্ঠানে কিছু নিরস কথা; বরং কিছু তিতা কথা বলার ইচ্ছে করেছি। প্রয়োজনের তাগিদে বিষয়বস্তু নির্ধারণ করলেও কিছুটা লজ্জিত বোধ করছি এই ভেবে, জ্ঞানীদের বৈঠকে জ্ঞানগর্ভ কথারই চাহিদা থাকা স্বাভাবিক। আমি ‘আহারে’র চেয়ে ‘ওষুধে’র দিকটাকে প্রাধান্য দিয়েছি। আমার পূর্বে প্রিয় ফ্রেন্ড আলেমে রাব্বানি মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ বিন্নুরি তাঁর গভীর জ্ঞানের কিছু উপহার এই বৈঠককে দান করে আমার লজ্জা আংশিক হলেও দূর করেছেন।

 

দীন ও দুনিয়ার পার্থক্য


ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী হিন্দুস্তানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর ইসলামি ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রীতি-নীতি বিলুপ্ত করার জন্য যে কাজগুলো করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় ছিল, তারা গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা)-এর আদর্শ থেকে শুধু শূন্যই করেনি; বরং তার প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিয়েছে। এ কারণে সমাজের সাধারণ ধার্মিক শ্রেণির মানুষ কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জানাশোনা ও পড়াশোনার জন্য আলাদা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে ইসলামের জ্ঞান ও দুনিয়াদারির জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ইতোপূর্বে গোটা ইসলামের ইতিহাসে এই বিভাজনের কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।

 

পাশ্চাত্যের ভোগবাদ ও নাস্তিক্যবাদ দিন দিন এই বিভাজনকে গভীর করেছে। ফলে মুসলিমজাতির অবস্থা এই দাঁড়িয়েছে, তাদের নেতৃত্বদানকারী শ্রেণি কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে এই জ্ঞানের অধিকারীদের পয়গামও তাদের কাছে পৌঁছতে পারে না।


আজ আমি যে কথাগুলো বলতে চাই, তা শুধু এই বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশেই নয়; বরং গোটা দেশ ও দুনিয়ার কলেজ-ইউনিভারসিটিতে অধ্যয়নরত সকল ছাত্রের উদ্দেশেই আদর করে বলছি। ইসলামিয়াত বিভাগের ছাত্রবন্ধুদের যোগসূত্র মনে করে আমি কথাগুলো তাদের সামনে পেশ করছি। সম্ভবত তাদের মাধ্যমে এই বার্তা সবার কাছে পৌঁছে যাবে।

 

তারুণ্যের দায়িত্ব


ইসলাম হেফাজতের জন্য দেশের তরুণরা সংকল্পবদ্ধ হলে তা সেনাবাহিনীর শক্তির চেয়ে কম নয়। সেনাবাহিনী যেমন দেশের সশস্ত্র শক্তি, তেমনি তরুণসমাজ দেশের নৈতিক শক্তি, যা অনেক বেশি অপরাজেয়। গোটা ইসলামি ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই পাওয়া যাবে, যেখানে মুসলমান তার প্রতিপক্ষের চেয়ে লোকবল ও অস্ত্রবলের দিক দিয়ে অগ্রগামী ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা আমাদের দুশমনদের তুলনায় দুর্বল ছিলাম, কিন্তু যা আমাদের প্রতি রণাঙ্গনে বিজয়ের বরমাল্য দান করেছে, তা হলো ঈমান ও আমলের অদম্য শক্তি। এই শক্তিকে জাগ্রত করতে আমাদের তরুণরা সংকল্পবদ্ধ হলে সেদিন খুব দূরে নয় যখন গোটা বিশ্বে মুসলিম জাতি ইসলামি আদর্শেও আবারও উত্তম নমুনা হয়ে যাবে। তারা এমন অকল্পনীয় ইতিহাস তৈরি করতে সক্ষম হবে যে, দুশমনের পক্ষে এদিকে মুখ তুলে তাকানোরও দুঃসাহস হবে না। কখনও যদি নির্বুদ্ধিতার কারণে এমন কাজ করেও বসে, তবে আমরা তার উত্তর সীমান্তে নয়, তাদের ঘরে পৌঁছে দিতে পারব।


তরুণ ছাত্ররা যেমন গোটা দেশে আদর্শিক চেতনা বিতরণ করতে পারে, তেমনি দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক উন্নতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। শর্ত শুধু এই, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পুরনো চাহিদা ও অভ্যাসের কিছু কুরবানি দানে সংকল্পবদ্ধ হবেন। চেতনা ও কর্মে যে দুর্বলতাগুলো আছে, তা দূর করতে সচেষ্ট হবেন।


লর্ড মেকলের প্রবর্তিত শিক্ষা-ব্যবস্থা আমাদের কর্মের উদ্যম ও নৈতিক পবিত্রতাকে যেমন নষ্ট করেছে, তেমনি আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে পদ ও পদবীর পূজারী বানিয়ে দিয়েছে। আমাদের চিন্তা-চেতনাকেও এত বিষাক্ত করে দিয়েছে যে, আমাদের চিন্তার ধারাই বদলে গেছে। এই শিক্ষায় দীন শুধু অনুপস্থিত নয়, এর জন্য যে পরিবেশ নির্বাচন করা হয়েছে তা একে দীনের প্রতিপক্ষ ও ঈমান নষ্টকারী বানিয়ে দিয়েছে। এর অপরিহার্য ফলাফল এই হয়েছে যে, আমাদের ছাত্রদের চিন্তা ও হৃদয় ঈমানি চেতনা থেকে ধীরে ধীরে শূন্য হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা)-র মাহাত্ম্য ও মহববত এবং তাঁদের আনুগত্যের প্রেরণা আমাদের জাতীয় শিক্ষাঙ্গন থেকে শুধু শেষই হয়ে যাচ্ছে না; বরং এই পবিত্র ও কল্যাণকর প্রেরণা বিলুপ্ত করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। উপরন্তু প্রাচ্যবিদ গবেষকদের নানামুখী চক্রান্ত সন্দেহ ও সংশয়ের এমন জাল বিছিয়ে দিয়েছে যে, দীন ও ঈমানকে রক্ষা করা বাস্তবিক পক্ষে এখন মর্দে মুজাহিদের কাজ।


সন্দেহ নেই, ছাত্রভাইদের মধ্যে এমন অনেক মর্দে মুজাহিদ আল্লাহ তৈরি করেছেন, যারা এসব চক্রান্ত ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। সময়ের দাবি হলো, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শিতা অর্জন যেমন আমাদের ভাইদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে রয়েছে, তেমনি গুরুত্বের সঙ্গে; বরং আরও অধিক গুরুত্ব দিয়ে ইসলাম ও ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানকে গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমরা যদি মুসলমান না হই তবে কিছুই হতে পারিনি। মুসলমান একটি সাম্প্রদায়িক উপাধী নয়; বরং ইসলামি জীবন-দর্শন, ইসলামি চেতনা এবং ইসলামি কর্ম ও চরিত্রের যারা অধিকারী তাদেরই নাম মুসলিম। এর জন্য কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান পূর্ণ আগ্রহের সঙ্গে অর্জন করা জরুরি।


আল্লাহ তাআলার শোকর, সম্প্রতি একটি জাগরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে- আমাদের আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রদের সামনে কুরআন-সুন্নাহর ইলম অর্জনের প্রয়োজনীয়তা এবং পশ্চিমা প্রতারক গোষ্ঠীর অন্ধ অনুকরণের কুফল পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। এখনও পর্যন্ত এই সচেতনতা এতটা শক্তি অর্জন করতে পারেনি যে, অধিকাংশ লোকের কর্ম ও চরিত্রকে প্রভাবিত করে। তাই অত্যন্ত দরদ ও সহানুভূতির সঙ্গে আমি আমার প্রিয় ছাত্রভাইদের একটি চিন্তাগত ও একটি কর্মগত ত্রুটি সম্পর্কে সচেতন করতে চাই। কারণ, সাফল্যের সকল উপাদান থাকা সত্ত্বেও এই দুর্বলতাগুলোই তাদের কর্ম ও প্রচেষ্টার সুফল থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। আল্লাহ করুন, যুবক ভাইয়েরা যদি জীবন সায়াহ্নে উপনীত কোনো বুড়ো মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং গ্রহণ করেন, তবে গোটা জাতিকে তারা ইসলামের রঙে রাঙিয়ে দিতে পারবেন।

 

সালফে সালেহিনের ওপর আস্থা রাখুন


প্রথম দুর্বলতা চিন্তাগত। এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে, আমাদের আধুনিক শিক্ষিত ভাইদের মধ্যে ইসলাম ও ইসলামিয়াত সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ছে। কিছু ভুলের কারণে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতি হয়ে যায় বেশি। হেদায়েতের পরিবর্তে শুরু হয় ফেতনার। একটি ভুল এই যে, কুরআন ও সুন্নাহর ইলম অর্জনের জন্য ব্যক্তিগত অধ্যয়নই যথেষ্ট মনে করা হয়। প্রশ্ন হলো, জগতের কোনো বিদ্যা কি শুধু ব্যক্তিগত অধ্যয়নের দ্বারা অর্জিত হয়? এমন একটি দৃষ্টান্তও কি দেখানো যাবে, শুধু ব্যক্তিগত অধ্যয়নের দ্বারা কেউ কোনো শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করেছেন? তাহলে কুরআন ও সুন্নাহর ইলম কীভাবে এত তুচ্ছ হয়ে গেল যে, কিছু বইপত্র পড়েই এ বিষয়ে পণ্ডিত হওয়ার আশা করি? আমরা যদি সত্যিই কুরআনের ইলম অর্জনে আগ্রহী হই তাহলে শুধু নিজস্ব পড়াশোনার দ্বারা নয়; বরং বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী শিখতে হবে এবং নিজস্ব ধারণার ওপর তাদের সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।


জরুরি বিষয় এই যে, আসলাফে উম্মত অর্থাৎ সাহাবি, তাবেয়িন ও আইম্মায়ে মুজতাহিদীন যাঁরা সরাসরি কিংবা এক-দুই সূত্রে রাসুলুল্লাহ (সা)-এর ছাত্র বিশেষত সাহাবায়ে কেরাম, যাদের সামনে কুরআন নাজিল হয়েছে এবং কুরআনের বিধান বাস্তবায়িত হয়েছে, তাদের দীনদারি ও আমানতদারি সম্পর্কে অমুসলিমদেরও কোনো সংশয় নেই। কুরআন-সুন্নাহর বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনে তাদের মতো দৃষ্টির গভীরতা পরিমাপ করা আমাদের বিশেষজ্ঞদের পক্ষেও সহজ নয়। আমার-আপনার মতো সাধারণ পাঠকের তো প্রশ্নই অবান্তর। কুরআন মজিদে বলা হয়েছে-


صِرَاطَ الَّذِیْنَ اَنْعَمْتَ عَلَیْهِمْ ۙ
‘তাঁরাই হেদায়েতের মিনার।’ তাঁদের ব্যাপারে আস্থা হারানো সকল গোমরাহির সূচনা এখানেই।


‘বাক স্বাধীনতা বা মুক্তচিন্তা অথবা মুক্তবুদ্ধি’র মোহনীয় স্লোগানের আড়ালে আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থা এখানেই প্রথম আঘাত হেনেছে। পূর্বসূরীদের প্রতি ভক্তি ও আস্থা আমাদের অমূল্য সম্পদ। এটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দীনের স্বীকৃত ও সর্বসম্মত বিষয়গুলোতে সন্দেহ করা হচ্ছে। আমরা গবেষণার নামে পূর্বসূরীদের মত ও পথ পরিত্যাগ করে শুধু সংশয়ের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি।


যেসব বিষয়ে পূর্বসূরীদের মতভেদ রয়েছে সেখানে ইলম ও তাকওয়ার বিচারে যাকে আপনার অগ্রগণ্য মনে হয়, তাকে অনুসরণ করতে আপত্তি নেই। অন্য মত পোষণকারীর প্রতি সামান্যতম বেআদবিও দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে যাবে।


কুরআন মজিদের ঘোষণা অনুযায়ী সর্বশেষ শ্রেণির মুমিনদেরও বৈশিষ্ট্য এই যে, পূর্বসূরীদের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসে তাদের অন্তর পরিপূর্ণ থাকবে। বলা হয়েছেÑ‘এবং যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, পরওয়ারদেগার! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের ওই ভাইদেরকেও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছেন। আমাদের অন্তরে যেন না থাকে মুমিনদের সম্পর্কে কোনো বিদ্বেষ।’ মোটকথা, পূর্বসূরীদের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা হচ্ছে এমন এক রক্ষাকবচ, যা আমাদের চিন্তা ও জ্ঞানের বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে পারে। একে সৌভাগ্যের বিষয় মনে করুন। তাঁদের রচনা ও গবেষণাকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সূত্র হিসেবে গ্রহণ করুন। তাদের সিদ্ধান্তকে নিজের ধারণার চেয়ে অগ্রগণ্য মনে করুন। ইনশাআল্লাহ, এটা আমাদের চিন্তাকে ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করবে।


যে কথাগুলো আপনাদের সামনে পেশ করেছি, এসব মূলত শ্রেষ্ঠ তাবেয়ি হযরত উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ.-এর একটি চিঠির সারাংশ এবং আহলে ইলমের জন্য কর্মসূচি।


মতের স্বাধীনতা কিংবা রিসার্চ-গবেষণার আপাতসুন্দর শিরোনামে বিভ্রান্ত হয়ে আমরা যদি পূর্বসূরীদের প্রতি আস্থা হারাই, তাহলে বিশ্বাস করুন এটা হবে অত্যন্ত লোকসানের ব্যবসা। এতে সংশি¬ষ্ট বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তটিও যেমন আমাদের হাতছাড়া হবে, তেমনি আসলাফের অনুসৃত মূল ধারা থেকেও আমরা দূবে সরে যাব।

আরেকটি দুর্বলতা


দ্বিতীয় দুর্বলতা কর্মগত। এটা ওই পরিবেশের কুফল, যা প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। মুসলিম জাতির শক্তির উৎস দুটি : ১. কুরআনি শিক্ষা। ২. সুন্নতে রাসুল (সা)-এর অনুসরণ। লেনদেন, কৃষ্টি-কালচার, বেশ-ভুষা সকল বিষয়ে ইত্তেবায়ে সুন্নত মুসলিম জাতির সৌভাগ্যের প্রথম শর্ত। মুসলমানের ভালো-মন্দে মাপকাঠি মদিনাতুর রাসুল (সা)।


এই নতুন আবহাওয়া আমাদের চিন্তাধারাকে এমন বিপরীতমুখী করে দিয়েছে যে, আমাদের কাছেও ভালো-মন্দের মানদ- হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরোপ ও ইউরোপীয় ‘সভ্যতা’। এভাবে আমরা মদিনা থেকে বিমুখ হয়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স অতঃপর আমেরিকামুখী হয়ে পড়েছি, যেখানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং নগ্নতা ও অশ্লীলতা ‘সভ্যতা’র দ্বারা সংজ্ঞায়িত এবং মদ্যপান, নাচ-গান ও ভোগ-বিলাস প্রগতিশীলতার অন্তর্ভুক্ত। আমরা শিল্প ও সংস্কৃতির মোহনীয় নামে এমন সব অপরাধকে জাতীয় উন্নতির উপায় সাব্যস্ত করেছি, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অতীতের ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি-গোষ্ঠীর ধ্বংসের বীজ এগুলোতেই নিহিত ছিল। দুঃখজনক সত্য এই যে, আমরা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক জীবন ওই ছাঁচেই নির্মাণ করে নিয়েছি যা পশ্চিমা প্রতারক চক্র আমাদের সুপ্ত সম্ভাবনাকে নষ্ট করার জন্য প্রস্তুত করেছিল।
আমাদের সুরতে-সিরাতে এখন মদিনার ছাপ নেই। আছে প্যারিস ও লন্ডনের অন্ধ অনুকরণ। এই আধুনিক বর্বরতা ঈমানের নূর ও আমলের তওফিক থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছে। গুনাহ ও পাপাচারের চোরাবালিতে আটক করে দিয়েছে। অন্যদিকে এই জীবন-ব্যবস্থায় খরচের ঊর্ধ্বগতি জাতিকে দেউলিয়া বানিয়ে ছেড়েছে। মানুষ যতই উপার্জন করুক, নিত্য পরিবর্তনশীল ফ্যাশন আর কুঠি-বাংলোর নিত্যনতুন সজ্জায় সবই খরকুটোর মতো ভেসে যায়। প্রগতিশীলতার স্বপ্নে বিভোর বন্ধুরা বৈধ উপার্জনের দ্বারা ‘প্রয়োজনীয়’ অপব্যয়গুলো সমাধা করে উঠতে পারেন না। ফলে অফিস-আদালতে ঘুষ ও দুর্নীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ভেজাল ও প্রতারণার সয়লাব অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।

 

আপনারা দেখলেন, শয়তানের এই ‘মিঠাই’ পরিস্থিতিকে কোথায় নিয়ে গিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার ওই ছিদ্রপথে সকল অপরাধ-নগ্নতা, অশ্লীলতা, দুর্নীতি সবই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে। আজ যখন ইউরোপের প্রতারণাগুলো এক এক করে আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরিয়ে দিয়েছে এবং আমরা পরিষ্কার বুঝেছি, তাদের মধ্যে আমাদের কোনো বন্ধু নেই; বরং জাতির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠূুকে দেওয়ার জন্যই তাদের সকল পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়েছে, তো এখনো কি আমাদের সময় হয়নি, ওই সব প্রতারকদের বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আসার, তাদের ‘সভ্যতা’ তাদের মুখে নিক্ষেপ করে দেওয়ার? এরপর নতুন করে মদিনাতুর রাসুল (সা)-কে চিন্তা ও কর্মের আদর্শরূপে গ্রহণ করার? ইসলামের পরিচ্ছন্ন ও অনাড়ম্বর সহজ-স্বাভাবিক জীবন অবলম্বন করব, যা আমাদের কর্ম ও চরিত্রকেও শুদ্ধ করবে এবং ঈমানি শক্তি আমাদের মধ্যে জাগ্রত করবে? আসুন, আমরা ইউরোপের আবিল ও খরুচে জীবনযাত্রা পরিত্যাগ করি।


আমি জানি, এই কাজ দীনি-দুনিয়াবি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সকল বিবেচনায় আমাদের জন্য যতটা জরুরি ঠিক ততটাই কঠিন। কেননা, গোটা জাতি ওই কলুষিত ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুধু মসজিদ-মিম্বারের আলোচনায় এই ধারার পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। এখন একটি আন্দোলন প্রয়োজন, যার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত শক্তি আমাদের ছাত্রসমাজ। অন্যদিকে এজন্যও এটা তাদের দায়িত্ব যে, এই নতুন ‘সভ্যতা’র প্রচলনও তাদের মাধ্যমেই আরম্ভ হয়েছিল। অতএব এর মুখ খুরিয়ে দিতে তারাও সহজে সফল হতে পারেন। কাজের সকল যোগ্যতাই আমি তাদের মধ্যে বিদ্যমান দেখছি। শুধু একটি বিষয়ের অভাব, যা আমি আলোচনা করেছি। হযরত মাজযুব রহ.-এর ভাষায়-


اوصاف حسن سب ہيں نہيں سوز عشق محتاج شمع ہے يہ بهرى انجمن ہنوز


সবশেষে দুআ করি, আল¬াহ তাআলা যেন আপনাদেরকে, আমাকে ও সকল মুসলমানকে রাসুলে কারীম (সা)-এর ও পূর্বসূরীদের সুন্নত মোতাবেক চলার ও অন্যদের অনুকরণ করা থেকে বাঁচার তওফিক দান করেন। আমিন। #

অনুবাদ : হাসানুল কাদির

 

শিক্ষাদীক্ষা-এর সর্বশেষ খবর