Total Bangla Logo
For bangla আজ বৃহস্পতিবার 12:39 am
27 July 2017    ১১ শ্রাবণ ১৪২৪    02 ذو القعدة 1438

রাশিয়ায় অবিশ্বাস্য ইসলামি জাগরণ, তিন নওমুসলিম মহিলার ইন্টারভিউ

সাদেকা হাসান, জয়েন্ট এডিটর

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০১:০৫ এএম, ৭ নভেম্বর ২০১৬ সোমবার | আপডেট: ০১:১৯ এএম, ৭ নভেম্বর ২০১৬ সোমবার

রাশিয়ায় অবিশ্বাস্য ইসলামি জাগরণ, তিন নওমুসলিম মহিলার ইন্টারভিউ

রাশিয়ায় অবিশ্বাস্য ইসলামি জাগরণ, তিন নওমুসলিম মহিলার ইন্টারভিউ

রাশিয়ায় কমিউনিজমের শাসনে আল্লাহ বা ঈশ্বরের ধারণা গত সত্তুর বছর ধরে অনুমোদন করা হয়নি। এরপরও বর্তমানে রাশিয়ার বাস্তবতা হলো, দেশটিতে অবিশ্বাস্য ইসলামি জাগরণ দেখা যাচ্ছে। দলে দলে মানুষ মুসলিম হচ্ছেন। ইসলাম কবুল করে বুক ভরে তারা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।

রাশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাশিয়ান অর্থডক্স খৃস্টান ধর্মে বিশ্বাসী। রাশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মূলত অভিবাসীদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে। তা সত্ত্বেও দেশটিতে মুসলমানদের বিদেশি বা বহিরাগত হিসেবে গণ্য করা হয় না।

রাশিয়ার অনেক আদিবাসী শত শত বছর ধরে পবিত্র ইসলাম ধর্মের প্রতি তাদের গভীর দরদ-ভালোবাসা এবং আনুগত্য দেখিয়ে আসছে। একই সঙ্গে খৃস্টানদের সঙ্গে একত্রে বাস করছে।

সোভিয়েত আমলে রাশিয়ায় কোনো ধর্মকেই বরদাশত করা হতো না। কমিউনিজমের পতনের পর অর্থডক্স খৃস্টান এবং ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটেছে।

বর্তমানে রাশিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য এবং সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। সর্বশেষ পরিচালিত আদমশুমারিতে দেশটির নাগরিকদের ধর্ম সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের জবাব জানতে চাওয়া হয়নি।

রাশিয়ান মুসলমানদের সংখ্যা গণনা করা হয় সাধারণত ঐতিহ্যগতভাবে মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তদের সব সদস্যসংখ্যা যোগ করার মাধ্যমে। এসব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে তাতার, বাশখির এবং চেচেন।

সবশেষ তথ্য বলছে, দেশটিতে প্রায় ১৬ থেকে ২০ মিলিয়ন ‘জাতিগত মুসলিম’ রয়েছে। এটি রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ১২-১৫ শতাংশ।

দেশটিতে প্রতিদিনই কিছু ‘নতুন মুসলমান’ যোগ হচ্ছেন। এরা মুসলিম ছিলেন না, অন্য ধর্ম বাদ দিয়ে নতুন করে মুসলিম হচ্ছেন। এ ধরনের নওমুসলিমের সংখ্যাও প্রচুর। নওমুসলিমদের তালিকায় নারী-পুরুষ সবাই আছেন।

ককেশাস স্টাডিজ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কেন্দ্রের সিনিয়র সহকর্মী নিকোলাই সিলাভে বলেন, ‘এখানে বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ বিভিন্ন ধর্ম ছেড়ে ইসলাম কবুল করেছেন। এখনো করছেন। এক্ষেত্রে ইসলামের প্রচার বেশ বিরল। কোনো মুসলমান গোঁড়া খৃস্টধর্মে যুক্ত হলে সেই ঘটনা রাশিয়াজুড়ে ব্যাপক প্রচার পেত।’

রাশিয়ার একটি ইংরেজি গণমাধ্যম ‘রাশিয়া বিয়ন্ড দ্য হেডলাইন’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য নেওয়া হয়েছে। প্রভাবশালী এই ইংরেজি গণমাধ্যমটি সম্প্রতি রাশিয়ান তিন নও মুসলিম মহিলার ইন্টারভিউ প্রকাশ করেছে। টোটালবাংলা২৪ ডটকম-এর পাঠকদের সেই ইন্টারভিউ থেকে নওমুসলিম তিন বোনের বলা নির্বাচিত কিছু বক্তব্য তুলে ধরা হলো।

 

salman



ভ্যালেরিয়া। বয়স ২২ বছর। পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১১ সালে তিনি ইসলাম কবুল করেন।

ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘আমি একটি খৃস্টান পরিবারে বড় হয়েছি। মুসলিম হওয়ার সিদ্ধান্তে আমার পরিবার দারুণ মর্মাহত হয়। প্রথমে তারা এ সম্পর্কে খারাপ কিছু চিন্তা করেছিল। তারা বিশ্বাস করতেন, আমি নিকট ভবিষ্যতে বহু যানবাহন বোমা মেরে উড়িয়ে দেব।’


তিনি বলেন, ‘আমি পরিবারের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। তারা আমার পছন্দকে সম্মান জানিয়েছে। বিশেষ করে মায়ের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, তিনি অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ের মধ্যেই আমার সিদ্ধান্তকে সহজে গ্রহণ করে নেন। এমনকি আমার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছ থেকে মা আমাকে সুরক্ষিত রেখেছেন।

ভ্যালেরিয়া বলেন, ‘মুসলিম হওয়ার পর আমি ইসলাম বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করি। নিয়মিত নামাজ শুরু করি। দুই মাস পর থেকে হিজাব পরা শুরু করি। এরপর আমি আমার হবু স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি একজন জাতিগত তাতার। তার পরিবার ইসলাম মেনে চলে না। শেষে আমরা বিয়ে করি। আমরা আমাদের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করি।’

 

zakwan

 


ওলেয়ানা। বয়স ৩০ বছর। সাত বছর আগে মানে ২০০৯ সালে তিনি মুসলিম হয়েছেন।

ওলেয়ানা বলেন, ‘ইসলামের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আমার আকর্ষণ ছিল। ইউনিভারসিটিতে পড়ার সময় আমি ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক ধারণা পাই। আরবি শিখি। সেখানে আমার অনেক মুসলমান বন্ধু ছিল। বর্তমান সমাজে মুসলিমদের নিয়ে স্বাভাবিকভাবে যা বিবেচনা করা হয়, তাদের সবার আচরণ ছিল তা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। এ কারণেই আমি ইসলাম কবুলের সিদ্ধান্ত নেই। আমার বাবা-মা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা আমার পছন্দ বুঝতে পেরেছিল, যেমনটি তারা আশা করেছিল।’


তিনি বলেন, ‘আমি স্কার্ফ পরি না। নামাজের সময় নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেকে নেই। প্রথমে রোজা রাখাটাও আমার জন্য কঠিন ছিল। গত তিন বছরে এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ইসলাম সম্পর্কিত গৎবাঁধা কিছু বিষয় নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, ইসলাম একটি নিষ্ঠুর ধর্ম। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে এমন মতের বিরোধিতা করি। বিশ্বাস করি, সকল ঐশ্বরিক শিক্ষা সুমহান কল্যাণ এবং ভালোবাসা দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে।’

ওলেয়ানা বলেন, ‘ইসলামে কথিত গৎবাঁধা অনেক বিষয় আছে। যেমন, মুসলমান কর্তৃক কাফের হত্যা, প্রাণিজবাই, স্ত্রীদের মারধর ও অমুসলিমদের গ্রহণ না করা ইত্যাদি। এই মনোভাবের কারণ মূলত অজ্ঞতা। আপনি কিছু বুঝতে না পারলে কিংবা কোনো বিষয়ে ভয় পেলে আপনার উচিত, সেই ভয় বাস্তবসম্মত কিনা তা খুঁজে বের করা। আমি মনে করি, ধর্মের সঠিক অনুশীলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সচেতনতা বাড়ানোই তাদের এই ভয় দূর করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।’

 

sufian

 


জয়নাব ওরফে এলেনা। বয়স ৫৫ বছর। ২০০৬ সালে তিনি মুসলিম উম্মাহর একজন গর্বিত সদস্য হয়েছেন।

জয়নাব বলেন, ‘এটি ছিল ৯০-এর দশকের শেষের দিক। আমার স্বামীকে নিয়ে পর্যটক হিসেবে আমরা মিসর সফর করি। কোনো মুসলিম দেশে এটিই ছিল আমার প্রথম সফর। সেখানে আমি সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন মানসিকতার মানুষ দেখেছি। এই সংস্কৃতিতে মগ্ন থাকার ফলে আমি আরব বিশ্বের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি। আমি কোরআন শরিফ অধ্যয়ন শুরু করি।’

তিনি বলেন, ‘৪০ বছর বয়সে আমি আমার স্বামীকে বললাম, আমি মুসলিম হতে চাই। আমার স্বামী এবং সন্তানরা আমার মনোভাব বুঝতে পেরে আমার সিদ্ধান্তে শান্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আমার মা বিষয়টি অতটা সহজভাবে মেনে নেয়নি। মূল সমস্যা ছিল, মাথায় হিজাব পরা নিয়ে। পরিস্থিতি এখন মীমাংসা হয়ে গেছে। এখন আমার মা আমার জন্য হালাল খাদ্য ক্রয় করেন। চার বছরের ব্যবধানে আমার বড় মেয়েও মুসলিম হয়েছে।’


তিনি বলেন, ‘ইসলাম কবুল করার কয়েক দিন পরই আমি বুঝতে পারলাম, আমার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তখন আমি আমার এলেনা নাম পরিবর্তন করে একটি মুসলিম নাম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেই। আমার মুসলিম নাম হয় জয়নাব।

জয়নাব বলেন, ‘আমি ইংরেজি এবং জার্মান কারিগরি অনুবাদক হিসেবে কাজ করি। আমি হিজাব পরা শুরু করলে আমার সহকর্মীরা আমার সঙ্গে একটু ভিন্ন রকম আচরণ শুরু করেন। একটি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে এমন আচরণে আমি খুব কষ্ট পাই। ওই সময় আমি খুবই মর্মাহত ছিলাম। দুই মাস পর আমি প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য একটি ফার্ম থেকে চাকরির প্রস্তাব পাই। ওই একই কাজে তারা আমাকে আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেতন অফার করে। আমি তাদের বলি, কর্মক্ষেত্রে আমি মাথায় হিজাব পরতে পারব কিনা। জবাবে তারা জানায়, এটি কোনো সমস্যা নয়। তাদের প্রয়োজন দক্ষতা এবং কাজ।’


এই নওমুসলিম বোন আরো বলেন, ‘নজির সৃষ্টির মাধ্যমে আমি ইসলাম সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে চাই। মানুষ ইসলাম সম্পর্কে দীর্ঘ বক্তৃতা শুনতে চায় না। সেই সময় তাদের হাতে নেই। তারা শুধু আপনার কাজকেই বড় করে দেখে। আমি বলব, মুসলিমরা প্রকৃত অর্থেই অনেক ভালো।’