Total Bangla Logo
For bangla আজ রবিবার 9:02 pm
23 July 2017    ৮ শ্রাবণ ১৪২৪    28 شوال 1438

রাশিয়ান কাতিয়ার ইসলাম কবুলের গল্প, আরো কী বললেন, পড়লে অবাক হবেন

সাদেকা হাসান, জয়েন্ট এডিটর

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৫:২৮ পিএম, ৪ নভেম্বর ২০১৬ শুক্রবার

রাশিয়ান কাতিয়ার ইসলাম কবুলের গল্প, আরো কী বললেন, পড়লে অবাক হবেন

রাশিয়ান কাতিয়ার ইসলাম কবুলের গল্প, আরো কী বললেন, পড়লে অবাক হবেন

কাতিয়া কোতোভা। এক রাশিয়ান নারী। বয়স ২৩ বছর। চলতি বছরের গত মার্চ মাসের কথা। এক সন্ধ্যায় তিনি মস্কো ক্যাথেড্রাল মসজিদে ঢুকেন। তার মিশন, ইসলাম কবুল করা। তিনি মুসলিম হতে চান।

রাশিয়ান এই কাতিয়ার জন্য মসজিদে ঢোকার এটি ছিল দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে মাত্র ৩ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার পা রেখেছিলেন বাসকোটোস্থানের একটি মসজিদে। ওই মসজিদটি তার জন্মস্থানে অবস্থিত। সে সময় কাতিয়ার নানী তাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন।

কাতিয়া বলেন, ‘আমার সেই দৃশ্য এখনো স্পষ্ট মনে আছে। নারীরা উপরতলায় নামাজ আদায় করছিল। আমি কাছাকাছি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নিচতলার পুরুষদের নামাজ আদায় দেখছিলাম।’

বাসকোটোস্থানের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা হলো ‘জাতিগত’ মুসলিম। ঐতিহাসিক কারণেই সেখানকার অধিবাসীরা ইসলামের নিয়মকানুন পালন করে থাকেন। অতীতের নাস্তিক সোভিয়েতের আলোকে আধুনিক রাশিয়ায় এটি একটি সাধারণ অবস্থা।

কাতিয়ার বাবা-মা ধর্মনিরপেক্ষ। তার পিতা রাশিয়ান। জাতিগতভাবে অর্থোডক্স। তার মা আবার তাতার জনগোষ্ঠীর। জাতিগতভাবে মুসলিম।

তাদের আগের প্রজন্ম আরো বেশি ধর্মীয় মনোভাবের লোক ছিলেন। কাতিয়ার মুসলিম নানী তাকে ইসলামি রীতিতে দোয়া-মোনাজাত করতে শিখিয়েছিলেন। তার দাদী ছিলেন গোঁড়া খৃস্টান। কাতিয়া কোনো অর্থ বোঝা ছাড়াই পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরা মুখস্থ করেন।

কাতিয়া বলেন, ‘কিছু কারণে মাঝেমধ্যে আমি একজন শিশুর মতো ভয় পাই। তখনই আমি সুরাগুলো তেলাওয়াত করি।’ শৈশবের পুরোটা সময় কাতিয়া উভয় ধর্মের দোয়া বা প্রার্থনার নিয়মগুলো পড়ে ঘুমাতে যেতেন।

কাতিয়ার বয়স ১৩ বছর। তখন তিনি উপলব্ধি করেন, একই সঙ্গে দুই ধর্মর অনুসরণ করা ঠিক নয়। কাতিয়া অর্থোডক্স খৃস্টান হিসেবে একজন বাপটিজ। তাঁর স্কুলে প্রায়ই বলা হতো, ‘তুমি রাশিয়ান’। এ কারণে তিনি ইসলামি নিয়মমাফিক দোয়া-মোনাজাত-নামাজ-রোজা এসব ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। গলায় ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তি ধারণ করেন। এছাড়াও কাতিয়ার বড়ভাইয়ের গোঁড়া খৃস্টান ধর্মের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায়। এখনো সে খৃস্টানি বিশ্বাসই মেনে চলছে।

সময় তার আপন গতিতে চলে। প্রবাদও আছে, সময় কথা বলে। ঠিকই সময়ের ব্যবধানে কাতিয়ার মনে জন্ম নেয় বহু প্রশ্ন। এর মধ্যে অধিকাংশ সওয়ালের জবাব তাঁকে কেউই দিতে পারেনি। যেমন- কাতিয়া মেনে নিতে পারছিলেন না, যিশু কোনো নবি নয়। তিনি খোদ ঈশ্বর। ধ্বংসাবশেষ-এর উপাসনার মতো কিছু গোঁড়া রীতিনীতির সঙ্গেও তিনি একমত হতে পারেননি।

এসব চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর বয়স। কাতিয়ার বয়স তখন ১৮ বছর। এ সময় তিনি মস্কোর রাশিয়ান স্টেট ইউনিভারসিটির আইনের স্টুডেন্ট। তার ইচ্ছা, একজন আইনজীবী অথবা তদন্ত অফিসার হওয়া।

কাতিয়া তার হোস্টেল রুমে একজন মুসলিম মেয়ের সঙ্গে থাকতেন। তাদের মাঝে প্রায়ই ধর্ম সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক হতো। এজন্য কাতিয়া খৃস্টান এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের প্রতি তাঁর বিশ্বাসের ভিত মজবুত থেকে দৃঢ়তর মজবুত হতে থাকে।

স্নাতক পাশের কয়েক মাস আগে কাতিয়া ‘ইনভেসটেগেটিভ কমিটি’ বিষয়ে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করেন। এ বিষয়ে কাজ শুরুর ইচ্ছা এবং আগ্রহ ব্যক্ত করেন। একই সময়ে কাতিয়া সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইসলাম কবুল করেন। বনে গেলেন মুসলিম। আমাদের চোখে কাতিয়া এখন নওমুসলিম। বিশ্বের ২ শ কোটি মুসলিম পরিবারে তিনিও একজন সম্মানিত সদস্য।

ইসলাম কবুলের পর কাতিয়া বলেন, ‘ইসলামের সৌন্দর্য আমাকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে।’

হিজাব পরে ইনভেসটেগেটিভ কমিটিতে কাজ কিছুটা কঠিন। তাই কাতিয়া নিজের ভবিষ্যতের বিকল্প বিবেচনা করে একটি ছোট বিরতির সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের জটিল একটি সময়।

তিনি এখন একটি দাগেস্তানি হালাল ক্যাফেতে কাজ করেন। তিনি সেখানে ওয়েট্রেস। দাগেস্তানে রাশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার বাস। তিনি বাড়ি ফিরে যেতে চান কিনা, জিজ্ঞেস করলে জবাবে বলেন, না। আমি পেছনে ফিরে যেতে চাই না। অতীত নিয়ে ভাবি না। বর্তমান এবং ভবিষ্যতই এখন অামার ভাবনার প্রধান বিষয়।

কাতিয়া বলেন, ‘মস্কোতেই আমি নিরাপদ ভাবছি। এখানে আমার হিজাব নিয়ে ভয় নেই। এখানে আমাকে নিশ্চিতভাবে প্রায়ই কিছু অশ্লীল কথা শুনতে হয়। এটি বাস্তবতা হলেও কোনো ধরনের শারীরিক আগ্রাসনের শিকার হতে হয় না। এ কারণে মস্কো ছাড়ার আপাতত কোনো প্ল্যান নেই। মস্কো ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে আমি তাতারিস্তানে যাব। সেখানে অনেক বেশি মুসলিম। অসংখ্য হিজাবি নারী। আছে অনেক হালাল ব্যবস্থাপনাও।’

কাতিয়া সাহসী ও স্বাধীন নারীর গল্পে অনুপ্রাণিত হন। আলাপচারিতায় তিনি আইরিনা সেন্ডলারের গল্প বলেন। আইরিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘ওয়ারশ ঘেটো’ থেকে ২,৫০০ জন শিশুকে উদ্ধার করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম নারী মহাকাশচারী ভালেনতিনা তেরেশকোভা এবং পাকিস্তানি মানবাধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাইয়ের গল্প তাঁকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। পরিবার, নারী ও শিশুদের সাহায্য করতে অচিরেই তিনি কোনো মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

নওমুসলিম কাতিয়া বলেন, ‘রাশিয়ান মানসিকতায় বলা হয়, প্রকাশ্যে মলিন লিনেন কাপড় ধোয়া উচিত নয়। এর অর্থ, পারিবারিক সহিংসতাসহ পারিবারিক সমস্যা তেমন কোনো সমস্যা নয়। এটি হচ্ছে নারীর সমস্যা। সাধারণত একাই তাদের এ সমস্যাটি মোকাবেলা করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, পারিবারিক দ্বন্দ্বের রেজল্যুশনে উভয় পক্ষই জড়িত হওয়া উচিত।’

বোন কাতিয়া বলেন, ‘ইসলামে নারীরা মুক্ত। কিছু মুসলিম নারী বাঁধাধরা নিয়মে বিশ্ব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে খাঁচার পাখির মত বাড়িতেই বিচরণ সীমাবদ্ধ রাখছে। প্রথমে তাদের বাবা-মায়ের দ্বারা, তারপর তাদের স্বামীদের দ্বারা এ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। ইসলাম অনুযায়ী, একজন স্ত্রী চাইলে ইসলামি সব নিয়মকানুন মেনেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারেন। মুসলিম ইতিহাসে এমন অসংখ্য নারীর সাফল্য সোনালি হরফে লিখে রাখা হয়েছে। কোনো স্ত্রী ইসলাম মেনে যেকোনো কাজকর্ম করতে চাইলে তার স্বামী তাকে সমর্থন করতে বাধ্য।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, একজন নারীর প্রধান কাজ বা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তার পরিবারে শান্তি-শৃঙ্খলা-সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করা।’

এই মুহূর্তে নওমুসলিম কাতিয়ার প্রধান কাজ হচ্ছে, তার ফ্যামেলি ঠাণ্ডা করা। ইসলাম কবুল করা এবং হিজাব পরায় কাতিয়ার বাবা তাঁর ওপর কিছুটা ক্ষুব্ধ। কাতিয়ার ভয়, এ নিয়ে হয়তো তাকে কিছু সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমার ইসলাম কবুলের সিদ্ধান্ত, রক্ষণশীল পোশাক এবং তাতার অঞ্চলের নারীদের মতো মাথায় হিজাব পরা সম্পর্কে আমার বাবা জানেন। তারা জানেন না, হিজাব পরার সময় আমি আমার পুরো ঘাড়ও ঢেকে রাখি।’

২০১৭, মানে নতুন বছর শুরুর আগেই কাতিয়া ছুটিতে বাড়ি যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সূত্র : রাশিয়া বিয়ন্ড দ্য হেডলাইন্স

শুধুই নারী-এর সর্বশেষ খবর