আজ বুধবার 10:22 am08 July 2020    ২৩ আষাঢ় ১৪২৭    17 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

রাজনীতির চাল ১০ টাকা কেজি!

প্রভাষ আমিন

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০৮:১৯ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ শুক্রবার

প্রভাষ আমিন

প্রভাষ আমিন

তবে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কারও মুখে আমি ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর অঙ্গীকারের কথা শুনিনি। ছিল না আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারেও। কিন্তু দাবির পক্ষে বিএনপি শেখ হাসিনার বক্তব্যের ইউটিউবের একটি লিঙ্কও শেয়ার করে। কিন্তু সরকার গঠনের পর অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিতসহ সিনিয়র নেতাদের অনেকেই ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর অঙ্গীকার অস্বীকার করেন। বিষয়টি উঠে আসে সংসদেও।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একে অপপ্রচার হিসেবে অভিহিত করেন। শেখ হাসিনা দাবি করেন, বিএনপি যেই ভিডিও ফুটেজ দিয়ে অপ্রপ্রচার চালাচ্ছে, তা তিনি খুটিয়ে দেখেছেন। তার ওই বক্তব্য ১৯৯৬ সালে তেজগাঁও এলাকার এক নির্বাচনি জনসভার। যেটিকে বিএনপি ২০০৮ সালের বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, ১৯৯৬ সালে ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর যে অঙ্গীকার করেছিলেন, ক্ষমতায় গিয়ে তা রক্ষাও করেছেন। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় এসে ১০ টাকার চালকে ৪০-৪৫ টাকায় তুলে নেয়।
তখন অস্বীকার করলেও আমার ধারণা ১০ টাকা কেজি চালের জিদটা গেঁথে গিয়েছিল শেখ হাসিনার মাথায়। দেরিতে হলেও দেশের হতদরিদ্র ৫০ লাখ পরিবারকে ১০ টাকা কেজি চাল দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। দুদিন আগে একসময়ের মঙ্গাপীড়িত কুড়িগ্রামে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন তিনি। ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’ স্লোগানে এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবার বছরে পাঁচ মাস ১০ টাকা কেজিতে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল পাবে। এ কর্মসূচি চলবে বছরের মার্চ-এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর মাসে। এই কর্মসূচির জন্য প্রাথমিকভাবে সরকারকে বছরে দুই হাজার একশ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। সরকার প্রতি কেজি চাল ৩৭ টাকা দরে কিনে ১০ টাকা দরে হতদরিদ্রদের হাতে তুলে দেবে। সারাদেশে সরকারের নানা জরিপ, পরিসংখ্যান, সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে এ ৫০ লাখ অতিদরিদ্র পরিবারকে বাছাই করা হয়েছে। প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমে পরিবারের সংখ্যা আরও বাড়ানো হতে পারে। সাধারণত চালের বস্তা হয় ৫০ কেজির। তবে এ কর্মসূচিতে দুর্নীতি ঠেকাতে ৩০ কেজির বস্তা বানানো হয়েছে। বোরো এবং আমন মৌসুমের আগে আগে যখন গরিব মানুষের মাঠে ফসল থাকে না, কাজ থাকে না, ঘরে চাল থাকে না, পকেটে পয়সা থাকে না; তখনই সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে। বাংলাদেশে অনেকদিন ধরেই দুর্ভিক্ষ বা মঙ্গার হাহাকার নেই। তারপর অতি দরিদ্র মানুষের জীবন আরও একটি সহনীয় করতেই এ কর্মসূচি। বাংলাদেশে অনেক দুর্নীতি হয়, অনেক অপচয় হয়, অনেক ভর্তুকি দেওয়া হয়। তার অনেক কিছুই পায় ধণিক শ্রেণি। অতিদরিদ্র মানুষের জন্য এই দুই হাজার একশ কোটি টাকার ভর্তুকি প্রশংসাই পাবে।

এমন একটি জনবান্ধব, দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি হাতে নেওয়ায় অবশ্যই ধন্যবাদ পাবে সরকার। একটি কল্যাণকর সরকারের দায়িত্বই হলো প্রান্তে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বিএনপির অপপ্রচারের জবাব দিতেই হোক আর, নিজেদের চিন্তায় হোক, এ ধরনের কর্মসূচির জন্য গরিব মানুষের দোয়া পাবে সরকার। রাজনীতিটা এমনই হওয়া উচিত। পারস্পরিক গালিগালাজ নয়, ভালো কাজের প্রতিযোগিতাই আমাদের দেশকে এগিয়ে নেবে। তবে মজাটা হলো, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর যারা ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর অঙ্গীকার অস্বীকার করছিলেন, তারাই এখন বলছেন, শেখ হাসিনা ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর অঙ্গীকার রক্ষা করছেন। যে যাই বলুক, ৫০ লাখ পরিবারের আড়াই কোটি মানুষ উপকৃত হবে, আমার কাছে এটাই বড়। ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণের মাধ্যমে শেখ হাসিনা রাজনীতির দাবা খেলায় দারুণ একটি চাল দিলেন।

আওয়ামী লীগ হোক আর বিএনপি, আর কখনও কোনও দল ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলে আমি তার প্রতিবাদ করবো। ১০ টাকা তো নয়ই, চালের দাম অন্তত ৩০ টাকার নিচে নেমে গেলে বিপাকে পড়ে যাবে কৃষক। প্রতিবছর বোরো আর আমন মৌসুমে কৃষক এই কম দামের চক্করে পড়ে যায়। যারা মাথার ঘাম পায়ে আমাদের জন্য ফসল ফলান, তাদের উৎপাদন খরচই উঠে আসে না। মৌসুমে ‘এক মন ধানের দামে একটি ইলিশ’ এ ধরনের শিরোনাম প্রতিবছরই দেখা যায়। একটু অপেক্ষা করতে পারলে হয়তো ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে। কিন্তু সাধারণ কৃষকদের অপেক্ষা করার সামর্থ্য থাকে না। তাই তারা কম দামেই লোকসানে বেঁচে দেয় ধান। তখন মজুতদারেরা মাঠে নামে। কম দামে ধান কিনে মজুত করে পরে বেশি দামে বিক্রি করে। তাই বাড়তি দামের সুবিধাটা কৃষক পায় না, পায় মজুতদারেরা। তাই তখন সরকারকে সেখানে নাক গলাতে হয়। তারা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে ধানের পড়তি বাজারে ঠেকা দেন। এটাই সরকারের কাজ। তাই অতিদরিদ্র মানুষ সরকারের ভর্তুকিতে ১০ টাকা কেজি চাল পাবে। কিন্তু আমরা যেন কখনও ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ার স্বপ্ন না দেখি। কৃষকরা বাঁচলেই দেশ বাঁচবে, আমরা খেকে পাবো।

আট বছর পরে হলেও শেখ হাসিনা বিএনপির একটি অপপ্রচারের জবাব দিয়েছে একটি শুভ উদ্যোগের মাধ্যমে। রামপাল থেকে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে শেখ হাসিনা আরেকটি অপপ্রচারের জবাব দিতে পারেন। তাতেও তিনি সাধারণ মানুষের ধন্যবাদ পাবেন, দোয়া পাবেন।

লেখক: অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ