আজ সোমবার 11:50 am06 July 2020    ২১ আষাঢ় ১৪২৭    15 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

যোগাযোগের ভণিতা

তুষার আবদুল্লাহ

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ১১:৫৯ এএম, ২ অক্টোবর ২০১৬ রবিবার | আপডেট: ০৫:৫৯ পিএম, ১১ অক্টোবর ২০১৬ মঙ্গলবার

তুষার আবদুল্লাহ

তুষার আবদুল্লাহ

গণমাধ্যম তার জন্মকাল থেকেই এই দাবি করে আসলেও, এখনও সর্বজনের মধ্যে যোগাযোগের সেতু তৈরি করে উঠতে পারেনি। গণমাধ্যম তার ইতিহাস কাল থেকেই সমাজের একটি শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করেছে। তার আত্মপ্রকাশের পেছনে যে পুঁজির জোগান, সেই পুঁজিতো নিজের সমকণ্ঠস্বরেরই জায়গা দেবে। পুঁজির স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত যে শ্রেণিগুলো তারা সমাজেরই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত শ্রেণি, সেই শ্রেণি পত্রিকার পাতায় নিজেদের প্রোপাগান্ডা করে গেছেন, যাচ্ছেন। তাদের দিক থেকে দাবি উঠতে পারে প্রান্তিক মানুষের কাছে তারা গেছে, তাদের কথা বলেছে, তুলে আনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রমাণিত বিষয় হলো প্রান্তিকজনের সেই কথাগুলো পুঁজির ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। যতটুকু পর্যন্ত সইতে পারা যায়, ততোটুকু প্রকাশের পেয়েছে প্রকাশের অনুমোদন। বাকিটা আড়ালে রাখা হয়েছে, লুকিয়ে ফেলা হয়েছে।
পত্রিকার পর বেতারে প্রান্তিক মানুষের প্রবেশাধিকার আরও রুদ্ধ। এখানে সরকারি বয়ান প্রচার করার উদ্দেশ্যই ছিল মুখ্য। প্রান্তিক মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার নানা প্রামাণিক দলিল হয়তো বেতার সামনে নিয়ে আসতে চাইবে, কিন্তু দেখা যাবে সেখানে সরকারি বা ভাষ্যই প্রধান। প্রান্তিকের কথা অনুচ্চারিত। সরকার বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রান্তিককে যে তথ্য দিয়ে ভুলাতে চেয়েছে, প্রান্তিককে যেভাবে গড়তে চেয়েছে সেই ধারণাই বেতারে উচ্চারিত হয়েছে। প্রান্তিকের বিশ্বাস, তার চিন্তা এই মাধ্যমে ঠাঁই পায়নি। আজকের এফএম যুগেও সমাজের উচুঁতলার সংস্কৃতি, তাদের আরোপিত ভাষা বেতারে ভেসে বেড়ায়। প্রান্তিক শ্রেণিকে নানা ছল চাতুরি দিয়ে উঁচুতলার মানুষের জয়গান গাওয়ানোর চেষ্টা চলছে। দাবি করা হয়েছিল-কমিউনিটি রেডিও প্রান্তিক মানুষের জয়গান গাইবে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো, সেখানেও কোথাও প্রকাশ্য এবং কোথাও ছায়া হয়ে আছে পুঁজি, করপোরেট স্বার্থ, ঔপনিবেশিক স্বার্থ, দাতা গোষ্ঠীর স্বার্থ। তারা নিজেদের কথাকে প্রান্তিক মানুষের জবানীতে বলিয়ে নিচ্ছে। সুতরাং কমিউনিটি, গোষ্ঠী বা সমাজ বলতে আসলে কোন সমাজের কথা বলা হচ্ছে- আদৌ সেখানে প্রান্তিকের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে বা হচ্ছে কিনা, তা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।

টেলিভিশনের বিস্ফোরণই বুঝি সমাজের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। সমাজ যেভাবে চলছে। সমাজের চিন্তা। সমাজের অভ্যাসগুলোকে ভুলিয়ে রাখার জন্য ফ্যান্টাসি তৈরি করাই টেলিভিশনের দর্শন। টেলিভিশনে প্রান্তিকের প্রবেশের দেয়াল আরো উঁচু। এখানে প্রান্তিক মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্র থেকে সে কতটা বিচ্ছিন্ন, বঞ্চিত। তার মধ্যে কেবল ভোগের লালসা জাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোন স্বপ্ন নয় মিথ্যে, তাকে ডুবিয়ে রাখা হচ্ছে মিথ্যে ফ্যান্টাসিতে। এখানেও প্রান্তিককে দিয়ে পুঁজির গুণগান গাইবার চেষ্টা আছে। ভণিতা আছে প্রান্তিকের কথা বলার। কিন্তু প্রান্তিক যখন কেন্দ্রকে, উঁচুতলাকে চ্যালেঞ্জ করে বসে তখনই তাকে বিসর্জন দেওয়া হয়, সংযোগের মিথ্যে সুতোটিও কেটে ফেলা হয়। টেলিভিশনের মাধ্যমে আসলে বাজারের সঙ্গে প্রান্তিকের সংযোগ ঘটানোই মুখ্য উদ্দেশ্য। কারণ এতে পুঁজি প্রান্তিককে তার ভোক্তা বা পণ্যের দাস হিসেবে সহজেই তৈরি করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ টেলিভিশন শুধু ভোক্তা ও বিক্রেতার মধ্যেই যোগাযোগ তৈরি করে যায়। সেখানে চিন্তার কোনও মিথস্ক্রিয়া তৈরি হচ্ছে না।

ভরসা খোঁজা হচ্ছে এখন বিকল্প মাধ্যমে। অনলাইনের দুনিয়াতে। যদিও এখানেও প্রান্তিক মানুষ প্রবেশাধিকারের স্বচ্ছ্লতা নেই। তবে গোষ্ঠীগত চিন্তা, পুঁজি প্রভাবিত যে চিন্তা সমাজের, রাষ্ট্রের যে অংশটিকে এতো দিন প্রান্তিক কুঠোরিতে বন্দি করে রেখেছিল, বিকল্প মাধ্যম বুঝি তাদের মুক্তি দিল। এখন সেই চিন্তা তার কথাকে অন্তত প্রকাশ করতে পারছে বাইরের পৃথিবীর কাছে। হোক সেখানে পুঁজি, অগ্রসর শ্রেণি বা ক্ষমতাশীলদের ভিড়, তবুও প্রান্তিক উচ্চারণগুলো সেখানে স্বল্প পরিসরে হলেও জায়গা করে নিতে পারছে। তৈরি হচ্ছে প্রান্তিকের সঙ্গে প্রান্তিকের যোগাযোগের সেতু। এই মুহূর্তে সেতুটি সরু বাঁশের হলেও অদূর আগামীতে সেখানে বড় সেতু নির্মিত হবে এই ভরসা রাখা যায়। যেই সেতু হবে সকল শ্রেণি, কেন্দ্র ও প্রান্তিকের মতো ও চিন্তার সহজ যোগাযোগের মাধ্যম।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি