আজ শনিবার 6:46 pm08 August 2020    ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭    18 ذو الحجة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

যুদ্ধ কখনও সমাধান নয়

আনিস আলমগীর

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০৩:২২ পিএম, ৫ অক্টোবর ২০১৬ বুধবার | আপডেট: ০৬:০২ পিএম, ১১ অক্টোবর ২০১৬ মঙ্গলবার

আনিস আলমগীর

আনিস আলমগীর

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ কি আসন্ন? জম্মু-কাশ্মির সীমান্তে চলমান উত্তেজনা দেখে বিশ্লেষকরা সেই বিশ্লেষণ নিয়ে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের সন্ত্রাসীরা ভারতে প্রবেশ করে তিনটা হামলা চালিয়েছে। বোম্বের হামলায় প্রচুর লোক হতাহত হয়েছিল।

পাঠান কোট আর উরির হামলা ছিল সেনা ছাউনিতে। তাতেও ভারতের বহু সেনাসদস্য হতাহত হয়েছে। উরির হামলার পর ভারতের সর্বস্তরে উত্তেজনা বিরাজ করছে এমন কী সেনা ছাউনিগুলোও উত্তেজনার বাইরে নেই। প্রতিদিন সীমান্তে উত্তেজনা, গোলাগুলি লেগে আছে।


আশার বিষয় যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাস্তব জ্ঞান প্রখর। তিনি সামরিক বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রিসভা, সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ নামে এক স্বল্পমেয়াদী অভিযান চালিয়েছেন পাকিস্তানের মাটিতে, সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিতে। অভিযান শেষে ভারতের ডিরেকটর জেনারেল (মিলিটারি অপারেশন) খবরটি পাকিস্তানের ডিরেকটর জেনারেলকে (মিলিটারি অপারেশন) জানিয়ে দিয়েছেন। মনে হয়, ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ছিল ভারতীয় জনতার উত্তেজনা ঠেকাবার একটা কৌশল। সরকারতো জনমত একেবারে উপেক্ষা করতে পারে না। ভারত বলেছে এলওসি ঘিরে ২৯ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকস চলতে থাকবে।


ভারতের এই উদ্যোগকে বাংলাদেশসহ অনেকে সমর্থন করেছে। সর্বশেষ সার্জিক্যাল স্ট্রাইকস সমর্থন করেছে রাশিয়া। তারা বলেছে প্রত্যেক দেশের অধিকার রয়েছে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার। মোদি অবশ্য এর মধ্যে স্পষ্ট করে বলেছেন, ভারত কখনও কাউকে আক্রমণ করে না, অন্যের ভূমি দখল করে না, তারা শুধু অন্যের জন্য লড়ে।
ভারত আরেকটা বিষয় স্পষ্ট করে বলছে। তারা বলেছে, পাকিস্তানকে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে একঘরে করার চেষ্টা করছে তারা। তবে তা বাস্তবে কতটুকু সম্ভব বলা মুশকিল। ভারত যখন পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়, পাকিস্তান সেখানে কাশ্মিরের জনগণের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করে। কাশ্মিরের অধিকাংশ জনগণ মুসলমান সুতরাং ওআইসি রাষ্ট্রগুলোর হয়তো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সহজ না। ওআইসির মানবাধিকার সংস্থার প্রধান হচ্ছে তুরস্ক। তারা বলেছে কাশ্মিরের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার জন্য প্রয়োজন তারা তথ্যানুসন্ধান দল পাঠাতে প্রস্তুত।


অতি সম্প্রতি ভারত আর আমেরিকার মাঝে ঘাঁটি ব্যবহার সম্পর্কে একটা চুক্তি হয়েছে। এরপরও আমেরিকা উরির ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে সত্য কিন্তু কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলেনি। অবশ্য আগামী জানুয়ারিতে বারাক ওবামার মেয়াদ শেষ। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বী দুজনের মধ্যে যেই আসুক না কেন কারও কাছে বারাক ওবামার দূরদর্শিতা নেই। হিলারি তো এরই মাঝে বলে ফেলেছেন পারমাণবিক অস্ত্র পাকিস্তানের হাতে নিরাপদ নয়।


ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার মিত্রতা বহু পুরানো। কিন্তু রাশিয়া পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক মহড়ার যে কর্মসূচি নিয়েছে ভারতের আপত্তির পরও তা স্থগিত করেনি। ভারত আমেরিকাকে ঘাঁটি ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে যে চুক্তি করেছে তারপর ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার প্রকাশ্য বিরোধ দেখা না দিলেও ভেতরে ভেতরে যে একটা দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে তা তো উপলব্ধি করা যায়। তুরস্ক রাশিয়ার মিত্র, ইরান ঘনিষ্ঠ মিত্র, পাকিস্তানকে যদি মিত্র বানানো যায় তবে রাশিয়ার জন্য বিরাট এক অঞ্চলে মিত্রতার আবহাওয়া বিরাজ করবে এটা তার জন্য কম স্বস্তিদায়ক নয়। রাশিয়া ভারতের সঙ্গেও সামরিক মহড়া করেছে। তবু সম্পর্কের উষ্ণতার ঘাটতি ভালো চোখে দেখছেন না বিশ্লেষকরা।


আসলে কূটনৈতিক সম্পর্কগুলোও চলছে স্ব স্ব স্বার্থ নিয়ে, বিশেষ করে বৃহৎ শক্তিগুলো স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে অভ্যস্ত। এটা সুদীর্ঘকালব্যাপী বিশ্ব দেখে আসছে। চীন পাকিস্তানের গোয়াধারে বন্দর ও নৌ ঘাঁটি তৈরি করেছে এবং চীন থেকে ইকোনোমিক করিডোরও তৈরি করা হচ্ছে গোয়াধর বন্দর পর্যন্ত। ইরান তার চাবাহার বন্দর পর্যন্ত এ করিডোর সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।


ইন্দোনেশিয়া খুবই সমৃদ্ধ ওয়ার হার্ডওয়্যার তৈরি করছে এবং পাকিস্তানের কাছে ওয়ার হার্ডওয়ার বিক্রি করার প্রস্তাবও দিয়েছে। কারও স্বার্থের প্রয়োজনে নয়, বরঞ্চ স্ব স্ব স্বার্থের কথা বিবেচনা করে এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পারদ ওঠা নামা করায়। সুতরাং ভারত যে পাকিস্তানকে একঘরে করার কথা বলছে তা আংশিক সফল হলেও এতো সহজে সফলতা নাও আসতে পারে।


ভারত পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের আচরণে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে গেছে। তাই বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা চিন্তা করছে। এটা তার অধিকারও। ভারতে রাজনৈতিক সরকার বিরাজমান কিন্তু পাকিস্তানে নেওয়াজ শরীফের রাজনৈতিক সরকার থাকলেও তাকে সামরিক বাহিনীর পাণ্ডুলিপিই বাস্তবায়ন করতে হয়। ইসলামাবাদের কলাম লেখক আয়শা সিদ্দিকা তার এক কলামে লিখেছেন সামরিক বাহিনী নাকি নেওয়াজ শরীফকে আপত্তিকর নামে অবিহিত করে। পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা যে ভারতের সঙ্গে বিরোধ কামনা করে তা নয়। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও তার গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই- এর কারণে তারা খোলামেলা কোনও পদক্ষেপ নিতে পারছেন না- সেটা বার বার প্রমাণিত।
জেনারেল মোশাররফ যখন প্রধান সেনাপতি তখনও নেওয়াজ শরীফ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মোশাররফ কারগিলে যে পাকিস্তানি সৈন্য মার্চ করতে বলেছিলেন তাও নাকি নেওয়াজ শরিফ জানতেন না। এ হচ্ছে পাকিস্তানে রাজনৈতিক সরকারের অবস্থা।


পিপিপির প্রধানমন্ত্রী গিলানি সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করতে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু প্রধান বিচারপতি আনোয়ার চৌধুরীর অহেতুক হস্তক্ষেপে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তখন সামরিক বাহিনী গিলানির বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে হাতে নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গিলানিকে সুপ্রীম কোর্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছিল। পাকিস্তানে ভেজালের কোনও অন্ত নেই।


কনভেনশনাল যুদ্ধ ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বেশ কয়েকবার হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছাড়া সব যুদ্ধ ছিল কাশ্মির নিয়ে। এবার যদি সত্যই যুদ্ধ বাধে সমগ্র বিশ্ব উদ্বিগ্ন এ নিয়ে যে, তা যে কোনও সময় পারমাণবিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। সুতরাং উভয় রাষ্ট্রের উচিৎ সব কিছুকে টেবিলে নিয়ে আসা। সে চেষ্টাও হচ্ছে। খবর বেরিয়েছে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকস-এর পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মধ্যে সংযোগ হয়েছে।
তবে ভারত বলেছে, আমরা আলোচনা করবো না কখনও বলিনি কিন্তু আলোচনার ইস্যু জম্মু-কাশ্মির না, ইস্যু হতে হবে সন্ত্রাস বন্ধ করা। টেরর ‘লাঞ্চ প্যাড’-এর বিপরীতে ভারতের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকস’-এর পর ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানি হাই কমিশনার আবদুল বাসিত বলেছেন, পাকিস্তান-ভারত এই অবস্থা চলা অব্যাহত রাখতে পারে না। এর থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। ভারত বেরিয়ে আসতে চাইলে পাকিস্তান আগ্রহী, না চাইলে অপেক্ষা করতে রাজি।
পাকিস্তান আসলে যত সুন্দর কথা বলে কাজে তার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ তার নামের সমার্থক হয়ে গেছে। কাশ্মিরের স্বাধীনতার চেয়ে আফগানিস্তানের মতো সেখানেও সন্ত্রাস রফতানি তার প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দেখা দিচ্ছে আজ বিশ্বাবাসীর কাছে। বেলুচিস্তানে হত্যা নিষ্পেষণ অব্যাহত রেখে কাশ্মিরের স্বাধীনতা চাওয়া রাষ্ট্রটির মানবিক দিকের কোনও পরিচয় প্রকাশ করে না।


অন্যদিকে কাশ্মিরের সমস্যা এমনই এক সমস্যা হাজার বছর পর হলেও ভারতকেই তার সমাধান করতে হবে। পাকিস্তান এতে নাক না গলালেও সমাধান লাগবে। ভারতীয় কলামিস্ট কুলদীপ নায়ার তার এক কলামে লিখেছেন তিনি নাকি কিছুদিন আগে কাশ্মিরের এক ছাত্রসভায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে যোগদান করেছিলেন। ছাত্ররা তাকে বলেছে তারা কাশ্মিরের স্বাধীনতা চায়। স্বাধীনতা এই পরিস্থিতিতে সম্ভব কিনা জানি না তবে নব প্রজন্মের কাশ্মিরিদের ধ্যান-ধারণার কথা মাথায় রেখে ভারতের উচিৎ একটা উন্নত সমাধান বের করা যাতে কাশ্মিরিরাও সন্তুষ্ট থাকতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তিও ফিরে আসে।


ভারত-পাকিস্তান দুই দেশকে বুঝতে হবে সমস্যার সমাধানে যুদ্ধ কখনও বিকল্প নয়।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক
anisalamgir@gmail.com