আজ শনিবার 5:41 pm08 August 2020    ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭    18 ذو الحجة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

মায়েদের নিয়ে কাজ করে বিশ্ব দরবারে

আ হ ম ফয়সল

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০১:৫২ পিএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ বুধবার | আপডেট: ০৪:৪১ পিএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ বুধবার

মায়েদের নিয়ে কাজ করে বিশ্ব দরবারে

মায়েদের নিয়ে কাজ করে বিশ্ব দরবারে

অপরপক্ষে যারা সুবিধাবঞ্চিত স্ব-কর্মসংস্থানে জীবনযাপন করেন, ছুটি চাওয়ার কোনো স্থান নেই, দরখাস্ত পাঠানোর কোনো জায়গা নেই, গরিব, দুঃস্থ, নদীভাঙা, গৃহহীন, খোলা আকাশের নিচে বিশেষ করে শহরের বড় বড় সড়ক, অলি-গলিতে, রোজ আনে রোজ খায়, স্বামীর বাড়িতে নির্যাতন, বাপের বাড়িতে অগ্রহণীয়, মর্যাদাহীন জীবন অতিবাহিত করেন।

এই মায়েদের দারিদ্র্যনিরসনের জন্য সরাসরি মাতৃত্বকালীন ভাতা অর্থাৎ গর্ভকাল ও বুকের দুধ পানের সময়সহ মোট ২৪ মাস বা ২ বছর নগদ ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করা হলে নারীর মর্যাদা, প্রজনন স্বীকৃতি, ধনী-গরিব বিভেদ ও বৈষম্যের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে গর্বিত মা ও সুস্থ শিশুর জন্ম অধিকার রক্ষা হবে; ভবিষ্যতে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার পথ রচনা হবে-এই লক্ষ্য নিয়েই মাতৃত্বকালীন ভাতা কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়।

বিশ্ব মা দিবস উদযাপন উপলক্ষে ২০০৫ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘র্ডপ’ দারিদ্র্য নিরসনে তাদের কর্মস্থ এলাকায় যেসব মা গর্ভধারণ করেন, তাদের মধ্যে মাত্র ১০০ জন অতিদরিদ্র মাকে চিহ্নিত করে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদানের ঘোষণা দেয়। দেশের দারিদ্র্য হ্রাসকরণে এটি নতুন উদ্ভাবনী ও প্রথম উদ্যোগ। সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম ভবিষ্যত প্রজন্ম তথা সুস্থ শিশু ও গর্বিত মা পাওয়ার জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা অনস্বীকার্য। যা একদিকে গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্যসেবা ও সঠিক পুষ্টিগত অবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মায়ের মর্যাদা অক্ষুণœ রাখতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে সন্তানও দীর্ঘ ২ বছর সুস্থ মায়ের দুধ পান ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সুযোগ পাবে তথা পারিবারিক সম্প্রীতি সংরক্ষিত হবে। সর্বোপরি জাতি একটি সুস্থ কর্মক্ষম প্রজন্ম উপহার পাবে।

দরিদ্র মাদের ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ প্রদান একটি নতুন ইতিহাস। সোনালি হরফে লিখে রাখার মতো বর্ণিল উদ্যোগ। এটি র্ডপ এর প্রতিষ্ঠাতা জনাব এএইচএম নোমানের চিন্তা ও পরিশ্রমেরই চমৎকার ফসল। রাত-দিনের নির্ঘুম পরিশ্রমের গবেষণাকর্ম সম্পন্ন না করেই আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি ঘোষণা করলেন, মাতৃত্বকালীন ভাতা দানের কর্মসূচি। জনাব নোমান বলেন, দৌলৎ খাঁর মাটি ও মানুষের মালিকানা, নদী ভাঙাগড়ার নিষ্ঠুর খেল-তামাশা দেখেই সম্ভবত গরিব মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতার চিন্তা মাথায় আসে। আমার বিশ্বাস, এই উদ্যোগটি আমার জন্য আল্লাহপাকের এক অনন্য অবদান। আমি নদীভাঙা এলাকার লোক বলেই হয়ত আমার মনে অসহায় গরিবÑদুঃখী মায়েদের কষ্ট কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছি। তা না হলে পুরুষ হয়ে নারীদের প্রসব বেদনা বা এই বিষয়ে আমার মতো অখ্যাত লোক দিয়ে এই উদ্যোগ হবে কেন?

জনাব নোমানের আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশের দরিদ্র মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কার্যক্রম চালু করে। শুরুতেই দেশের ৩ হাজার ইউনিয়নে ৪৫ হাজার মাকে এই ভাতাদান করা হলেও বর্তমানে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকার সারা দেশে মাসে ৫০০/- টাকা করে বছরে প্রায় ৩ লক্ষ মাকে এই ভাতা প্রদান করছে। মায়ের গর্ভে বাচ্চা আসা থেকে শুরু করে বুকের দুধ খাওয়া পর্যন্ত ২৪ মাস পরিকল্পিত পরিবার গঠনে মা শুধু এই ভাতা পাচ্ছে। এতে বাল্যবিবাহ, তালাক ও যৌতুক রোধ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও জন্ম নিবন্ধন উৎসাহিত হচ্ছে। সরকারের মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এই ভাতাদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

জনাব নোমান একজন স্বীকৃত দক্ষ সংগঠক। তিনি ছাত্র থাকা অবস্থায়ই নিজেকে সেবামূলক উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষার কাজে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭০ এ ‘ধ্বংস থেকে সৃষ্টির’ প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে এখন পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৫ বছর এই সেবাকাজেই আছেন। মাতৃত্বকালীন ভাতা কর্মসূচির উদ্ভাবক হওয়ায় তিনি ইতিমধ্যে ‘মাতৃবন্ধু’ খেতাব পেয়েছেন।

মাতৃত্বকালীন ভাতা বাস্তবায়নের পর পুনরায় মাদেরকে কেন্দ্র করে জনাব নোমান দারিদ্র্যমোচনের জন্য শুরু করেন স্বপ্ন প্যাকেজ নামে আরেকটি সমৃদ্ধ কার্যক্রম। সোস্যাল এসিসট্যান্স প্রোগ্রাম ফর নন এসেটার্স-‘স্বপ্ন’ প্যাকেজ কার্যক্রমটি মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত মা-বাবা-শিশুকেন্দ্রিক ৫ ভিত্তি সম্বলিত সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রম। দিন বদলের জন্য ৫টি স্বপ্নের প্যাকেজ বাস্তবায়ন হলে সমাজে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো বৈষম্য থাকবে না। গড়ে উঠবে চমৎকার সামাজিক বন্ধন। স্বপ্ন প্যাকেজে রয়েছে- ১. স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্ড, ২. শিক্ষা ও বিনোদন কার্ড, ৩. স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনসহ একটি ঘর, ৪. জীবিকায়ন সরঞ্জাম, ৫. সঞ্চয়, বনায়ন ও প্রয়োজনে উন্নয়ন ঋণ।
 
‘স্বপ্ন’ প্যাকেজ কর্মসূচিটিও এখন সরকারিভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ কর্মসূচি সরকারিভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য জনাব এএএইচএম নোমান প্রায় চারটি বছর সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লবি, এডভোকেসি করেন। জনাব নোমান সরকারকে বুঝাতে সক্ষম হন যে, এ কর্মসূচিটি দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ অবদান রাখবে। তার দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে সরকার প্রায় এক হাজার মা’য়ের দারিদ্র্য বিমোচনে ২০১৪-১৬ দুই অর্থ বছরে ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করে। এ উন্নয়ন মডেলটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর দেশের সাতটি বিভাগের ১০টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করেছে। র্ডপ এ কাজের সমন্বয় ও সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করছে।

স্বপ্ন প্যাকেজ কর্মসূচির স্বপ্নদ্রষ্টা জনাব নোমান বলেন, ‘দিন বদলের সনদ-স্লোগান, সরকারের কাছে নতুন প্রজন্মের নাগরিকদের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন অনেক। এই ‘স্বপ্ন’ বাস্তবায়নে মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত গরিব মা-বাবা-শিশুকেন্দ্রিক পরিবার উন্নয়নই দারিদ্র্যমোচনের মূল চাবিকাঠি। ভাতাপ্রাপ্ত মা শিশুকে কেন্দ্র করে স্বপ্ন প্যাকেজ বাস্তবায়ন করলে আগামী প্রজন্ম অর্থাৎ ২০ বছর মেয়াদে কমবেশি ১ কোটি মা কাভার করলে দেশে দরিদ্র পরিবার থাকবে না। বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ ও সুখী সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হবে’।

দেশের মাতৃত্বকালীন ভাতা ও স্বপ্ন প্যাকেজপ্রাপ্ত মায়েরা জনাব নোমানকে নিজেদের পরম বন্ধু ভাবছেন। তাদের প্রতিক্রিয়া খুবই ইতিবাচক। তারা অকপটে বলছেন. মানুষটি সত্যিই মায়েদের বন্ধু। জনাব নোমানের মতো তারাও আলোকিত সন্তান জন্ম দিতে চান, যারা নোমানের অবর্তমানে হাজারো নোমান হয়ে শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের প্রতিটি মায়ের জন্য বন্ধু হিসেবে সহযোগিতার হাত বাড়াবে। মায়েদের বিভিন্ন ধরনের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে কাজ করবে।

আমাদের দেশের অনেক গুণীজন ছিলেন যারা জীবিত থাকতে সরকারিভাবে মূল্যায়ন পাননি। বড় মানুষেরা কখনো মূল্যায়ন বা পদক পুরস্কার লাভের আশায় কাজ করেন না। তারা নৈতিকতাবোধ থেকেই শুভ কাজগুলো সম্পন্ন করেন। তবে জনাব নোমান মায়েদের নিয়ে কাজ করে পৌঁছে গেছেন বিশ্বদরবারে। দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবহিতৈষী কাজে অবদান রাখার জন্য তিনি ‘গুসি আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার-২০১৩’ লাভ করেছেন। বাংলাদেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তিনি এই আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেন। জনাব নোমানের জন্য দেশের লাখো মায়ের অশ্রুঝরা প্রার্থনা বলে দেয়, মায়ের প্রতি আমাদের ঋণ শোধ হবার নয়, যিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন মায়েদের সেবার জন্য। মায়েদের নিয়ে কাজ করে জনাব নোমান যে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন তা ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে-সবখানে।


লেখক: ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক