আজ বৃহস্পতিবার 8:02 am09 July 2020    ২৪ আষাঢ় ১৪২৭    18 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

ভারতের উচিত নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০১:২০ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সোমবার | আপডেট: ১১:৫০ এএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ বুধবার

ভারতের উচিত নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

ভারতের উচিত নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

আমাদের প্রতিবেশী ভারতের অবস্থাটাও মনে হয় আমাদের সমাজের ওই বড় পরিবারটার মতো। দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে। সারা সীমান্তব্যাপী কিছু দূর পর পর সামরিক ছাউনি। কোন ছাউনির নিরাপত্তা কে দেখে, গোয়েন্দা তৎপরতা আছে কিনা তার কোনও সঠিক তদারকি আছে মনে হয় না।
সাম্প্রতিক সময়ে তিনটা বড় বড় হামলা করলো পাকিস্তানি জঙ্গিরা। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বরের বোম্বের হামলায় তো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ব্যাপক লোক প্রাণ হারিয়েছে। মাত্র ৮/১০ জন সন্ত্রাসী রেলস্টেশন, দুটি তারকা হোটেল তছনছ করে দিয়েছে। এক হাজার নিরাপত্তাকর্মী দীর্ঘ ৪/৫ দিন অভিযান চালিয়ে ৮/১০ জন সন্ত্রাসীকে হত্যা করেছে এবং ১ জন সন্ত্রাসীকে জীবিত ধরেছিল।
দ্বিতীয় হামলাটি হলো পাঠানকোটে। পাঠানকোট পঞ্জাব সীমান্তে। সেখানে ভারতের বিমান বাহিনীর একটা এয়ার বেইজ রয়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের ৬ জন সন্ত্রাসী ভারতীয় বিমান বাহিনীর পোষাক পরে বিমান ঘাঁটিতে ঢুকে পড়েছিলো। দীর্ঘ ৮০ ঘণ্টা তৎপরতা চালিয়ে ভারত শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসীদেরকে হত্যা করেছে। ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে ভারত বিস্তারিত কিছু বলেনি তবে ১ জন কর্নেলসহ ৭ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছে।
এসব সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে লস্করে তৈয়বা ও জৈশ-ই মোহাম্মদ নামক সন্ত্রাসী সংগঠন। এ হামলার পর ভারত-পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ২০১৬ সালের ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি নির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
তৃতীয় হামলা হয়েছে কাশ্মিরের বারামুল্লা জেলার উরির সেনা ছাউনিতে গত রবিবার, ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। সেই সেনা ডেরায় ছিল বিহার রেজিমেন্টের সৈন্যরা। তারা ডোগরা রেজিমেন্টের সৈন্যদের হাতে চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর চলে যাওয়ার কথা। ভোর ৫টায় সেনাদের ঘুম ভাঙার আগেই সন্ত্রাসীরা সেনা ছাউনির তাবুতে আগুন লাগিয়ে দেয় আর ৮টি গ্রেনেড চার্জ করে। ১৭ জন সেনা সদস্য তাৎক্ষণিক প্রাণ হারায় আর ২০ জন অগ্নিদগ্ধ হয়। যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন। অবশ্য অন্য সেনা সদস্যরা ৪ জন সন্ত্রাসীকে হত্যা করে ফেলে।

উরির সেনা ছাউনির সন্ত্রাসী হামলা ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতের সর্বস্তরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য সেনা ছাউনির উত্তেজনা। কাশ্মীরে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে অনেক দিন ধরে। কারফিউ জারি করে রেখেছে দিনের পর দিন। বিদ্রোহী কাশ্মিরিদের হত্যা করা হচ্ছে এমন অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে। সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মিরের বিদ্রোহের স্রোত রুখতে পারছে না। এরূপ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সন্ত্রাসীরা বিদ্রোহী কাশ্মিরিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, কাশ্মিরিদের সাহায্যে এগিয়ে আসা স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় সেনা ছাউনির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতো নাজুক হওয়াতো স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

বিজেপি নেতারা বলছেন ভারত শুধু দাঁত নয় পাকিস্তানের চোয়ালটি পর্যন্ত উপড়ে ফেলবে। ভারতের উচিত চোয়াল উপড়ে ফেলার আগে নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও মজবুত করা। পাঠান কোটের ঘটনা থেকে ভারত কোনও শিক্ষাই নেয়নি। আমি ভারতের এক জেনারেল এর লিখিত বইতে পড়েছি (সম্ভবতো জেনারেল কাউল) এক পাকিস্তানি ভারতের সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ ৬/৭ বছর চাকরি করার পর ধরা পড়েছিল। এই যদি সেনাবাহিনীর অবস্থা হয় তবে চীন-পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করাতো ভারতীয় বাহিনীর পক্ষে সংকটজনক হবে।

ভারতীয়দের মনে রাখা উচিৎ পাকিস্তানের লস্করে তৈয়রা, জৈশ-ই মোহাম্মদ, তালেবানে পাকিস্তান- এই তিন সন্ত্রাসী সংগঠনের কর্মীরা আত্মহননে দ্বিধা করছে না। আর অচিরেই কাশ্মিরিদের থেকেও আত্ম-হননে প্রস্তুত হওয়া শত শত যুবক বের হয়ে আসবে এদের মোকাবিলা করার ভারতীয়দের প্রস্তুতি কী! ভারত তার ভূখণ্ডে চালানো সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের অধিকার রাখে কিন্তু সন্ত্রাসের জনপথ বা মুক্তির সংগ্রাম যে নামেই ডাকা হোক না কেন- কাশ্মিরের সমস্যা ভারতের জন্য একটি বড় সমস্যা, পাকিস্তানের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে  লিপ্ত থাকার পেছনে বড় অজুহাত। তাই এই সমস্যাকে সম্মানজনক সমাধান দিয়েই ভারতকে এগিয়ে যেতে হবে।

পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদতো আছেই, তার ওপর একটা জাতি যখন লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আত্ম-হননের পথ বেছে নেয় তখন তারা খুবই ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ভিয়েতনামের সঙ্গে আমেরিকা বিজয়ী হতে পারেনি। অথচ আমেরিকা ৬ লাখ সৈন্যের সমাবেশ করেছিল ভিয়েতনামে। ভিয়েতনামের এমন কোনও জঙ্গল নেই যেখানে আমেরিকা নাপাম বোমা নিক্ষেপ করেনি। আমেরিকা ১৩ লাখ টন নাপাম বোমা ফেলেছিল ভিয়েতনামে।

ভারতীয় শাসনতন্ত্রের ৩৭০ অনুচ্ছেদ মূলে কাশ্মির বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে। ভারতের অন্য রাজ্যের লোক গিয়ে কাশ্মিরে জমি কিনতে পারে না। ভারতীয় লোকসভায় পাস হওয়া কোনও আইন কাশ্মির বিধানসভা অনুমোদন না দিলে কাশ্মিরে ওই আইন চালু হতে পারে না। এ সমস্ত কারণে কাশ্মির ভারতের অন্য রাজ্যের মতো অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয়।

১৯৪৭ সালে হায়দারাবাদের নিজাম পাকিস্তানে যোগদানের কথা ঘোষণা দিয়ে ছিলেন আর কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ভারতে যোগদানের কথা বলেছিলেন। তখন ভারতের উপ-প্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লব ভাই পেটেল পাকিস্তানকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন হায়দারাবাদ ও কাশ্মির বিনিময়ের। নেহরু কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ। মুঘলের শেষ সময়ে তার পরিবার কাশ্মির থেকে দিল্লি এসে মুঘল রাজদরবারে চাকরি নিয়েছিলেন। পরে এলাহাবাদে গিয়ে বসতি গড়ে তোলেন তাই কাশ্মিরের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল। আর এ কারণে সর্দার পেটেলের প্রস্তাব নেহরু বাস্তবায়িত হতে দেননি।

পেটেল ছিলেন বাস্তবতাবাদী রাজনীতিবিদ। তিনি দেশীয় রাজ্যগুলো ভারতভুক্ত না করলে বলকানের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতো। তিনি কাশ্মিরের বর্তমান পরিস্থিতি তখনই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। নেহরু লেখা পড়ায় পেটেলের চেয়ে বেশী সমৃদ্ধ ছিলেন কিন্তু আবেগী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তার আবেগের কারণেই ৭০ বছরব্যাপী ভারতকে যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে।

কাশ্মিরে তিনটি অংশ(১) কাশ্মির (২) জম্মু (৩) লাদাখ। (১) কাশ্মিরের শতভাগ মুসলমান (২) জম্মুতে মিশ্রিত জনসংখ্যা, হিন্দু মেজরটি (৩) লাদাখ একটা জেলা, এ জেলার লোক শতাংশে বৌদ্ধ। ১৯৬২ সালের যুদ্ধের সময় লাদাখের অর্ধেক অংশ চীন দখল করে নেয়। এখন ভারতের উচিৎ জম্মু ও লাদাখকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে পররাষ্ট্র ও দেশ রক্ষার বিষয় ভারতের হাতে রেখে কাশ্মিরকে পৃথক করে দেওয়া।

না হয় অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে আয়ারল্যান্ড যেমন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে শত শত বছর যুদ্ধ করেছিল কাশ্মিরিরা ও ভারতের বিরুদ্ধে অনুরূপ অবস্থান নেবে। পাকিস্তানের সন্ত্রাসীরাও কাশ্মিরিদের সাহায্যে সীমান্ত অতিক্রম করে আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করবে। ভারতের অগ্রগতিকে রুখে দিচ্ছে বার বার কাশ্মিরের সমস্যা।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক