আজ শনিবার 6:39 pm08 August 2020    ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭    18 ذو الحجة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি

ভাবতে হবে অনেক কিছু

মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০৫:৩৮ পিএম, ১৩ অক্টোবর ২০১৬ বৃহস্পতিবার

ভাবতে হবে অনেক কিছু

ভাবতে হবে অনেক কিছু

বর্তমান সরকার কওমি মাদরাসা শিক্ষাসনদের স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্যে কওমি মাদরাসা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয় এবং সেই কমিশনের রিপোর্টের আলোকে সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ (স্বাধীন ও স্বাতন্ত্র্য) কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’ (Bangladesh (Independence) Qawmi Madrasah Education Authority) নামে একটি বিলও তৈরি করেছে, যা মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

কওমি মাদরাসা শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন গঠনের পর থেকেই এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বাদানুবাদ শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত আছে। কারণ এ যাবৎ যত শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে, সকল শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের আলোকে ইসলামি শিক্ষা সংকোচনের পথ প্রশস্ত হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই স্বীকৃতি গ্রহণ করা হলে আলিয়া মাদরাসাসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মত কওমি মাদরাসাও সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। আধুনিকায়নের নামে কওমি মাদরাসার সিলেবাসেরও পরিবর্তন হবে। এতে কওমি মাদরাসার বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকবে না।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্যে এ যাবৎ বহু কমিশন ও কমিটি গঠিত হয়েছে। যেমন শেরেবাংলার ঘোষণা, ১৯৩৯; শরীফ কমিশন,১৯৪৯; আকরাম খাঁ কমিশন, ১৯৫১; আশরাফউদ্দিন চৌধুরী কমিটি, ১৯৫৬; আতাউর রহমান খান কমিটি, ১৯৫৭; মোয়াজ্জাম কমিশন, ১৯৬৩; হামুদুর রহমান কমিশন, ১৯৬৬ইং; নুর খান কমিশন, ১৯৬৯; শিক্ষা কমিটি, ১৯৭০; কুদরতে-খুদা কমিশন, ১৯৭৪; জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন কমিটি, ১৯৭৮; অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষা কমিটি, ১৯৭৯; সামশুল হক কমিটি, ১৯৯৭; জাতীয় শিক্ষা উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন কমিশন ২০০৯। বর্তমান সরকারের আমলে গঠন করা হয় কওমি মাদরাসা শিক্ষা কমিশন, ২০১২। কওমি মাদরাসা শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে এ ধরনের কমিটি গঠন এ বারই প্রথম। এতে কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নেজামে ইসলাম পার্টি নেতৃবৃন্দ ও প্রয়াস চালান তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে পাকিস্তানে কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।


গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ও মাদরাসা উন্নয়ন কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তা বেশিদূর এগোইনি। বর্তমান সরকারের আমলেই প্রায় ১৪৭ বছরের পুরনো কওমি মাদরাসা সনদের বিষয়টি সম্পর্কে জোরদারভাবে আলোচনা আসে।

প্রসঙ্গক্রমে উপমহাদেশে মাদরাসা শিক্ষার ওপর কিছুটা আলোকপাত করা দরকার এই জন্যে যে, অনেকেই এ ব্যাপারে অবহিত নন। ১৭৫৭ সালে বৃটিশের দখলদারিত্বের আগে উপমহাদেশে কোন পৃথক শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। তখন উপমহাদেশে ইসলামভিত্তিক একক শিক্ষা ব্যবস্থা যেটা চালু ছিল, তা মাদরাসা নামেই পরিচিত ছিল। সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কারিগর, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, উলামা-মাশায়েখ প্রভৃতি দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠতো। বৃটিশরা এদেশ দখলের পর বিদ্যমান ইসলামভিত্তিক একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার অবসান ঘটায়। তারা তাদের ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি মোতাবেক ইসলামি শিক্ষা বিবর্জিত বহুমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। বৃটিশ প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামি শিক্ষা না থাকায় ঐশী বিধান ও মহানবীর (সা.) জীবনাদর্শভিত্তিক শিক্ষা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রথমে ১৭৮০ সালে লর্ড হেসটিংসের সময় আলিয়া মাদরাসা এবং এর ৮৬ বছর পর অর্থ্যাৎ ১৮৬৬ সালে কওমি মাদরাসা শিক্ষার প্রবর্তন হয়। আলিয়া মাদরাসা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এবং কওমি মাদরাসা সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

কলকাতায় মাদ্রাসা-ই-আলিয়া প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে উপমহাদেশে প্রথম পৃথক মাদরাসা শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা পদ্ধতির অনুসরণে ক্রমান্বয়ে অবিভক্ত বাংলা ও আসামের বিভিন্ন স্থানে আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইনডিয়ার উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম কওমি মাদরাসা। যা দারুল উলুম দেওবন্দ নামে বহুল পরিচিত। এরপর থেকে দেওবন্দ মাদরাসাকে অনুসরণ করে বাংলাদেশ, ইনডিয়া ও পাকিস্তান ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কওমি মাদরাসা শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

কওমি শিক্ষা কমিশন গঠনের পর থেকেই উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। কারণ আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার বর্তমান হাল-হাকিকত দেখে কওমি মাদরাসার শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত উলামায়ে কেরাম কওমি মাদরাসা সনদের সরকারি স্বীকৃতি গ্রহণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বলে মনে হয়। কারণ হিসেবে যা অনুমান করা যায় তা হচ্ছে, যুগোপযোগী ও আধুনিকায়নের নামে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার সিলেবাসে মাত্রাতিরিক্ত সাধারণ বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি, আলিয়া মাদরাসায় সহশিক্ষা প্রবর্তন, বিধর্মী শিক্ষক নিয়োগ এবং সর্বশেষ শতকরা ৩০ ভাগ মহিলা শিক্ষিকা নিয়োগের নির্দেশ। তাছাড়া একমুখী শিক্ষার নামে কওমি মাদরাসা শিক্ষাকেও সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার প্রয়াস হচ্ছে মূলত কওমি মাদরাসা শিক্ষা সনদের সরকারি স্বীকৃতি গ্রহণের ক্ষেত্রে অনীহার আরেকটি কারণ। ক্রমশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাও অভিন্ন শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত হলে, এ দেশের জনগণের লালিত ও ধারণকৃত চিন্তা-চেতনা, চিরায়ত ইসলামি মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ নাস্তিক্যবাদী চিন্তা-চেতনা সম্বলিত সাধারণ বিষয়ও এক সময় কওমি মাদরাসায় বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানোর ব্যবস্থা করার আশংকাও করা হচ্ছে। সুদীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষার বর্তমান ধারা বৈশিষ্ট্যহীনতায় রূপান্তরের ধারণাও করা হচ্ছে। ইসলামভিত্তিক কওমি মাদরাসার সিলেবাসের বদল ঘটিয়ে সেক্যুলার চিন্তা-চেতনা সৃষ্টি করা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার ন্যায় কওমি মাদরাসায়ও ইসলাম ধর্মচর্চা থেকে সরিয়ে নৈতিকতা ও ব্রত চর্চায় উদ্বুদ্ধ করা হয় কি না-এ নিয়েও কওমি মাদরাসা শিক্ষকরা চিন্তিত। কারণ ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক বিষয় সম্বলিত সাধারণ সিলেবাস অধ্যয়ন করে তৌহিদবাদী কওমি শিক্ষার্থীদের মনে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসুলের (সা.) প্রতি অটল বিশ্বাস গড়ে তোলা কিছুতেই সম্ভব হবে না। বর্তমান শিক্ষানীতির আলোকে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর নামে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে মাত্রাতিরিক্ত সাধারণ বিষয় ঢোকানো থেকে আশংকা করা হচ্ছে যে, সরকারি নিয়ন্ত্রণভুক্ত করা হলে, শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের অন্যান্য ধারার সঙ্গে কওমি মাদরাসা শিক্ষায় ও সাধারণ আবশ্যিক বিষয়সমূহে অভীন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করতে হবে। ইবতেদায়িসহ সবধরনের মাদরাসার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্যে সারা দেশে প্রাথমিক স্তরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত বিষয়সমূহ এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করা হবে। উলামায়ে কেরাম হয়ত মনে করেন, সাধারণ শিক্ষার অনুরূপ এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক পড়িয়ে এবং প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিয়ে কওমি মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা এবং উপরোক্ত গুনাবলী কওমি মাদরাসা ছাত্রদের কাছ থেকে আশা করা বাতুলতা মাত্র। তাছাড়া সাধারণ শিক্ষার ন্যায় শিক্ষার সকল স্তরের মতো কওমি মাদরাসায়ও পরিচালনা, তদারকি, স্থানীয় জন-তদারকি, পরিবীক্ষণ ও এ্কাডেমিক পরিদর্শনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়েও উলামায়ে কেরাম চিন্তিত।

এ ক্ষেত্রে ১৯৫৭ সালে মোহসেনিয়া মাদরাসা শিক্ষা বিলুপ্তির বিষয়টিও আলোচনায় আসছে। বৃটিশ আমলে চালু করা হয়েছিল মোহসেনিয়া মাদরাসা, যা জুনিয়র বা নিউ স্কিম মাদরাসা হিসেবে পরিচিত ছিল। সাধারণ ও ইসলামি বিষয় সমান সমান রেখে প্রণীত সেই সিলেবাস অনুযায়ী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকার ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমান কবি নজরুল কলেজ), হাম্মাদিয়া মাদরাসা (আরমানিটোলার হাম্মাদিয়া হাই স্কুল) চট্টগ্রামের মোহসেনিয়া মাদরাসা (বর্তমানে মহসিন কলেজ), রাজশাহীতে মাদরাসা ময়দান আছে, বাস্তবে মাদরাসা নেই। এই ধরনের বহু উদাহরণ আছে। এসব ভেবে আশংকা করা হচ্ছে, অবশেষে আলিয়া এবং কওমি মাদরাসাও একদিন অবলুপ্তির শিকার হয় কি না। কারণ এরই মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আলিয়া মাদরাসা থেকে উত্তীর্ণ দাখিল ছাত্র-ছাত্রীরা কলেজে এবং আলিম পাস ছাত্র-ছাত্রীরা ইউনিভারসিটিতে চলে যাচ্ছে। ফলে আলিয়া মাদরাসার উপরের শ্রেণীতে শিক্ষার্থীর স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে। অথচ এক সময় আলিয়া ও কওমি মাদরাসার সিলেবাস প্রায় একই ছিল। কওমি মাদরাসা থেকে পাস করা আলেমরা আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতাও করতে পারতেন।


কওমি মাদরাসা সনদের সরকারি স্বীকৃতি গ্রহণে অস্বীকৃতির আরো যেসব কারণ দৃশ্যমান, তা হচ্ছে কওমি মাদরাসা সম্পর্কে বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের বিরূপ মন্তব্য। যেমন কেউ কেউ বলেন, সরকার মাদরাসার ছাত্রসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাছাড়া হেফাজতি হুজুররা লন্ডন-আমেরিকা থেকে আনীত মদ বিক্রির টাকায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করছে। কওমি মাদরাসা জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র। ছাত্ররা জঙ্গি। এতে আলেমসমাজের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করে উলামায়ে কেরাম বলছেন, মাদরাসা ও আলেমসমাজ সম্পর্কে এসব ব্যাঙ্গাত্মক, কুরুচিপূর্ণ ও অশোভন উক্তি এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে মারাত্মক আঘাত স্বরূপ। কেন না এদেশের মানুষ নিজেদের সাহায্য, সহযোগিতা, পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়নে দেশে হাজার হাজার মাদরাসা গড়ে তুলেছেন। মাদরাসা শিক্ষা সম্পর্কে অনবহিত এক শ্রেণীর মানুষ মনে করে, মাদরাসায় শুধু বেহেশত-দোযখ ও জিহাদের কথা পড়ানো হয়। আসলে তা মোটেও সত্য নয়। ইসলাম শুধু একটি বিশ্বাসের নাম নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই মাদরাসা শিক্ষার বিশেষ করে কওমি মাদরাসার সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়। মানুষের আমল-আখলাক, আচার-ব্যবহার, জীবন ধারণ, জীবন-মনন, শাসন পদ্ধতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, দর্শন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, আইন-আদালত, সংস্কৃতি, উত্তরাধিকার, জীবন-মনন, উৎসব, আনন্দ, জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রেখে সুস্পষ্ট ঐশী বিধান ও মহানবীর (সা.) সর্বোত্তম জীবনাদর্শানুযায়ী জীবন পরিচালানার ধারা অব্যাহত রাখার দিকে লক্ষ্য রেখে কওমি মাদরাসার সিলেবাস প্রণীত হয়।

কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত আইনের খসড়া উলামায়ে কেরামকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। আলেমগণ মনে করেন, এই কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে কওমি মাদরাসার স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে না। একসময় কওমি মাদরাসাও মোহসিনিয়া ও আলিয়া মাদরাসার ভাগ্য বরণ করতে বাধ্য হয়। কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠনের জন্যে প্রণীত খসড়ায় শুধু কর্তৃপক্ষ গঠন প্রক্রিয়ার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও কার্যাবলীর (গ) ধারায় দারুল উলুম দেওবন্দের ৮টি মূলনীতির আলোকে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। অথচ দেওবন্দ মাদরাসার ৮টি মূলনীতির ৭টিতেই সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে। ‌‌‌‌‌কথিত কর্তৃপক্ষ এর ব্যতিক্রম। (ছ) ধারায় যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। উলামায়ে কেরাম বিদ্যমান সিলেবাস বহাল রাখার দাবি জানাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ গঠন প্রক্রিয়ার (৩)(২) মহিলা কওমি মাদরাসার প্রতিনিধির কথা বলা হয়েছে। এই প্রতিনিধি পুরুষ না মহিলা তা বলা হয়নি। (৩)২) ধারায় কর্তৃপক্ষে সরকারি প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষকে সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখার দাবির পরিপন্থী। তাছাড়া ৬(১) ধারায় চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মধ্যেও দু’জন সরকারি প্রতিনিধি থাকবেন। তাছাড়া বেফাকুল মাদারিসলি আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক), ইত্তেহাদুল মাদারিস চট্টগ্রাম, এদারায়ে দ্বীনি তা’লিম সিলেট, তানযিমুল মাদারিস উত্তরবঙ্গ, তানযিমুল মাদারিস ফেনী, জমিয়তুল মাদারিস নোয়াখালী, ইত্তেহাদুল উলামা মযমনসিংহ ও গওহরডাঙ্গা বোর্ড ফরিদপুরসহ ৮টি বোর্ড থেকে সদস্য নেয়া হবে।

এখন দেখা যাক বিশ্বে ধর্মীয় শিক্ষা কোন পর্যায়ে আছে। এ ব্যাপারে যতদূর জানা যায়, শুধু বাংলাদেশ নয়, ইদানিং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৃথক ধর্ম শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে দেখা যাচ্ছে। তাই বেসরকারিভাবে গড়ে উঠছে পৃথক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পশ্চিমা বিশ্বের বহু দেশে পৃথকভাবে খৃস্টধর্ম শিক্ষা চালু করা হচ্ছে। আমেরিকায় ধর্ম শিক্ষার জন্যে স্কুল-কলেজ ছাড়াও ওয়াশিংটনে একটি ক্যাথলিক ইউনিভারসিটি রয়েছে। এককালের কমিউনিস্ট দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নে ৭০ বছর পর আবার ধর্ম শিক্ষা শুরু হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক মহাচীনেও ধর্মীয় শিক্ষা দিতে পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে কোনো বাধা নেই। আমেরিকায় আলাদা খৃস্টধর্ম ও ইহুদি ধর্ম শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। ইনডিয়ায় পৃথক জৈন স্কুল, বৈশ্য স্কুল, রাজপুত স্কুল চালু আছে। ফ্রান্স ধর্মীয় বিদ্যালয়েও ভর্তুকি দিয়ে থাকে। জার্মানি ও গৃসে অর্থডক্স খৃস্ট ধর্ম শিক্ষা চালু আছে। কানাডায় ক্যাথলিক ধর্ম শিক্ষার জন্যে বাজেট বরাদ্দ বাধ্যতামূলক। তুরস্কে ধর্ম শিক্ষাকে নিঃশেষ করে দেয়ার কামাল আতাতুর্কের প্রয়াস সফল হয়নি। সৌদি আরবসহ সব মুসলিম দেশে কোনো না কোনোভাবে পৃথক ধর্মীয় শিক্ষা চালু আছে। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ট কওমি মাদরাসা ইনডিয়ার দেওবন্দে অবস্থিত। বিশ্বে যখন ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা সংকোচিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ দুঃখজনক বৈ কি।

বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে এক শ্রেণীর মানুষের বিরোধিতার কারণ বোধ করি এই, মাদরাসা শিক্ষার কারণেই ভ্রান্তির বেড়াজাল ছিন্ন করে ইসলামের আদর্শ পুনরায় জনগণের চিন্তাজগতকে নাড়া দিচ্ছে। প্রবল প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে আজ দেশে ইসলামি আদর্শের পতাকা হাতে নিয়ে জনগণকে অগ্রসর হতে দেখা যাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও সমাজতন্ত্রীদের সর্বাত্মক বিরোধিতা সত্ত্বেও নানা তন্ত্র-মন্ত্র, মতবাদ, ইজম-বিভ্রান্ত মানুষ এখন মানুষ মাদরাসা শিক্ষার দিকে হন্যে হয়ে ছুটতে শুরু করেছে। দেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে গড়ে উঠছে কওমি মাদরাসা। কারণ কওমি মাদরাসাই ইসলামের শাশ্বত নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধের চেতনা নতুন করে সঞ্জীবিত করার প্রেরণা যোগাচ্ছে দেখে মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। কওমি মাদরাসার মাধ্যমে ইসলামি আদর্শিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুব সমাজ বলিষ্ঠ পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে, বিধায় তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র কায়েমের লালিত স্বপ্ন ভেস্তে যাবার উপক্রম হওয়ায় মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে নেতিবাচক ও অরুচিকর বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। উলামায়ে কেরাম মনে করেন, দেশব্যাপী কওমি মাদরাসা শিক্ষার ব্যাপক প্রসারে অভাবিতপূর্ব ইসলামি জাগরণে ভীত হয়ে কওমি মাদরাসা শিক্ষা সংকোচনের উদ্যোগ নিয়েছেন সরকার। জনগণ কর্তৃক এদেশে প্রতিষ্ঠিত কওমিসহ বিভিন্ন মাদরাসায় শিক্ষিত উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে পবিত্র কোরআনকে ভিত্তি করে সমাজ ও রাষ্ট্রীক জীবন গড়ার লক্ষ্যে ইসলামি আন্দোলন উচ্চকিত হয়ে উঠতে শুরু করায় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী সরকারের মন্ত্রী ও বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে হয়। তাঁরা ইসলামি শিক্ষা বিশেষ করে কওমি মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করেছে। কওমি মাদরাসা শিক্ষিত এবং পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহক আলেমসমাজের ধর্মরিপেক্ষতাবাদবিরোধী অনড় অবস্থানের কারণেই ধর্মনিপেক্ষতাবাদী ও সমাজতন্ত্রীরা আজ আলেমসমাজকে প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনায় তাদের জঙ্গি এবং মাদরাসাকে জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করে ইসলামের নিশান-বরদার আলেমসমাজকে শেষ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। উলামায়ে কেরাম শুধু এখন নয়, বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের যুগ থেকে শুরু করে এখনো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে পবিত্র কোরআন নির্দেশিত পথে শক্তি ও সাহস যুগিয়ে আসছে। কওমি মাদরাসা শিক্ষার বর্তমান সিলেবাস ঐশী বিধান ও মহানবীর (সা.) জীবনাদর্শানুযায়ী প্রণীত।

কওমি মাদরাসার সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডভিত্তিক বাংলাদেশি চেতনা এবং জীবনভিত্তিক ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ৯০ ভাগ মানবমণ্ডলির অস্তিত্বের ভিত্তি তৈরি করে। এদেশের জনগণের অস্তিত্ব স্বাধীন মর্যাাদা, সামগ্রিক কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ সবকিছুই ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ইসলাম ধর্মভিত্তিক জাতিসত্ত্বার ওপরই নির্ভরশীল। সেই ভিত্তি তৈরি হয় মাদরাসা শিক্ষায়। এই শিক্ষার বিরুদ্ধে বিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়ার যে অভিযোগ আনা হয়, তা ভিত্তিহীন। মাদরাসা শিক্ষায় সাম্প্রদায়িকতা শিক্ষা দেওয়া হয় না। মাদরাসায় সর্বজনীন সাম্য ও মৈত্রীর কথাই শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষা দেওয়া হয় মানবিকতা ও কল্যাণের কথা। মাদরাসা শিক্ষায় অমুসলিদের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করার কথাই শিক্ষা দেয়া হয়ে থাকে।

কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে সরকার নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করতে পারে। যুগোপযোগী করার নামে কওমি মাদরাসা শিক্ষার মূল আদর্শ, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও অবকাঠামোকে সংকোচিত করা হচ্ছে বলে যে ধারণা করা হচ্ছে, তা দূর করতে হবে। কওমি মাদরাসা শিক্ষাকে মেডিকেল, প্রকৌশল ও কারিগরি প্রভৃতির ন্যায় একটি স্বতন্ত্র, বিশেষায়িত এবং পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করার মধ্যেই এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। জাতীয় জীবনের প্রয়োজন পূরণে যেমন মেডিকেল, প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষা প্রয়োজন, তেমনি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সমুন্নত রাখার প্রয়োজনীয় লোক তৈরির জন্যে কওমি মাদরাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও অস্বীকার করা যায় না। এমপিওভুক্তি না হওয়ার শর্তে বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রেখে কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি প্রদান করে কওমি মাদরাসা শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট ওলামায়েকেরামের সমন্বয়ে একাডেমিক কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে কওমি মাদরাসা শিক্ষার সিলেবাস প্রণয়ন করার কথা বিবেচনায় রাখতে হবে।

এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়, যতদিন না পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকেই ইসলামিকরণ করা হবে এবং সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা বিশেষ করে ইসলামি শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি না হবে, ততদিন এদেশের জনগণ ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতি বজায় রাখার স্বার্থে কওমি মাদরাসা শিক্ষার অস্তিত্ব বিলীন হতে দেবে না। কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দলিল প্রণয়নে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, ইত্তেহাদুল মাদারিস চট্টগ্রাম, এদারায়ে আজাদ দ্বীনি তা’লিম সিলেট, তানযিমুল মাদারিস উত্তরবঙ্গ, তানযিমুল মাদারিস ফেনী, জমিয়াতুল মাদারিস নোয়াখালী, ইত্তেহাদুল উলামা মযমনসিংহ, গওহরডাঙ্গা বোর্ড ফরিদপুর মোট ৮টি বোর্ড এবং কওমি মাদরাসা শিক্ষক ফেডারেশন ছাড়াও ব্যাপকভাবে জনগণ, ইসলামি শিক্ষাবিদ, উলামায়ে কেরাম ও ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। এর জন্যে প্রয়োজন কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের খসড়া আইন জনসমক্ষে প্রকাশ করা, যাতে এই আইনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলেই মতামত প্রদানের সুযোগ পায়। একতরফাভাবে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ-এর আইন পাস করা হলে বিতর্ক থেকেই যাবে।

লেখক : মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী
চেয়ারম্যান, ইসলামী ঐক্যজোট