আজ বুধবার 12:52 am20 September 2017    ৪ আশ্বিন ১৪২৪    27 ذو الحجة 1438
For bangla
Beta Total Bangla Logo

পদ্মা সেতু তদন্ত : দুদকে আস্থা নেই! কানাডায় কেন জবাব নেই?

তাকরিম হাসান, বিশেষ প্রতিনিধি

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৫:২৫ এএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সোমবার

১২ ডিসেম্বর ২০১৫ পদ্মা সেতুর মূল অংশের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

১২ ডিসেম্বর ২০১৫ পদ্মা সেতুর মূল অংশের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। ২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতুর ভিত স্থাপন করা হয়েছিল। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ১৯৯৮-৯৯ সালে পদ্মা সেতুর পৃফিজিবিলিটি সম্পন্ন করে। ২০০৮-এর নবম পারলামেন্ট ইলেকশনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণের অঙ্গীকার করা হয়।

 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরই ফেব্রুয়ারি মাসে পদ্মা সেতুর জন্য ডিজাইন কনসালট্যান্ট নিয়োগ করে। কনসালট্যান্ট সেপ্টেম্বর ২০১০-এ প্রাথমিক ডিজাইন সম্পন্ন করে এবং সেতু বিভাগ পৃকোয়ালিফিকেশন দরপত্র আহবান করে। ২০১১ সালে সরকার বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে- অভিযোগ তুলে ১২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি বাতিল করে। এ সময় শুরু হয় ষড়যন্ত্রের খেলা। বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি জাইকা, এডিবিসহ দাতাসংস্থাগুলোও সরে দাঁড়ায়। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সচিবসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। অথচ মন্ত্রীসহ কারোর বিরুদ্ধেই কোনও অভিযোগই প্রমাণ হয়নি। পরে কানাডার এক আদালতে মামলা করা হয়। বিশ্বব্যাংক সেখানেও কোন প্রমাণ তুলে ধরতে পারেনি।

 

শেখ হাসিনা সরকারের ইমেজকে কলঙ্কিত করা হয়। বিএনপিসহ দেশের সুশীল সমাজ সরকারের সমালোচনায় মেতে ওঠে। ২০১২ সালে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার ফ্যামেলির সদস্যদের দুর্নীতির জন্য বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়িয়েছে। বিএনপির নেতারাসহ অনেক বরেণ্য (!) ব্যক্তি সরকারের সমালোচনা করে। মনে হয়, সরকারকে অপরাধী প্রমাণ করতে পারলেই তাদের লাভ। মূল কথা হলো, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ৫ বছরে পদ্মা সেতুর কাজ এক ইঞ্চিও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। সে সময় দুর্নীতির অভিযোগে যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতের ৬টি প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক অর্থ ফিরিয়ে নেয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই বিশ্বব্যাংক আবার বাংলাদেশে অর্থায়ন শুরু করে। বিষয়টি নতুন মাত্রা লাভ করে।

 

অনেক অভিযোগ-ষড়যন্ত্র-চাপ উপেক্ষা করে ২০১২-এর ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু হবে। জুলাই মাসেও প্রধানমন্ত্রী পারলামেন্টে ঘোষণা দেন, প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নেই হবে পদ্মা সেতু। তিনি বলেন, এতে কোনও দুর্নীতি করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সে কথা কেউ কানে তুলেনি। বারবার দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করার পরও বিদেশি কিছু দালাল-এজেন্ট ও বিএনপি-জামায়াতপন্থী নেতা-বুদ্ধি-চুক্তিজীবীরা মানুষকে ভুল বোঝাতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগের সামনে কখনই মাথা নত করবে না বাংলাদেশ।

 

শান্তিতে (!) নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বব্যাংককে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বাংলাদেশকে ঋণ সহায়তা দিতে বাধা দেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, পদ্মা সেতুতে টাকা দিতে বিশ্বব্যাংক সবসময় রাজি ছিল। ইউনূসের কারণে সেটি হয়নি। বিশ্বব্যাংক যেন টাকা না দেয়, সে জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে সংস্থাটিকে চাপ দিয়েছিলেন। বহির্বিশ্বে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তিনি অনবরত অভিযোগ করে যাওয়ায় অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খুবই অবাক হই এই ভেবে, একজন নোবেলজয়ী কী করে নিজের দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন।

 

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পারলামেন্টে জানিয়েছিলেন, নিজস্ব অর্থায়নেই হবে পদ্মা সেতু। পরের বাজেটেই এই সেতুর জন্য তিনি অর্থ বরাদ্দ করার কথা বলেন। ২০১৫-এর ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে কাজ শুরু করে দেওয়ার পর বিশ্বব্যাংক বলে, এত বড় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার উচিত কাজ হয়নি। সেতুটি হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য স্টিল লাইফলাইন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেতুটির শুধু উদ্বোধনই করেননি, তাঁর সরকার এরই মধ্যে এর প্রায় অধেক কাজ সম্পন্নও করেছে।

 

দেখতে দেখতে কয়েক বছর চলে গেল। অবশেষে এখন সত্য প্রকাশ হলো। প্রমাণ হলো, শেখ হাসিনা সত্য বলেছিলেন। পদ্মা সেতু ঘিরে দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির কোনও প্রমাণ মেলেনি। তাই এ মামলায় তিন বিবাদীকে শুক্রবার অব্যাহতি দিয়েছেন কানাডার একটি আদালত। কানাডাভিত্তিক পত্রিকা দ্য গ্লোব এন্ড মেইল এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে জানা যায়, অব্যাহতি পাওয়া তিন ব্যক্তি হলেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী ভূঁইয়া, কানাডার প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস ও প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ। অভিযোগ প্রমাণ করতে ফোনে ধারণ করা যেসব তথ্য আদালতে তুলে ধরতে আবেদন করা হয়, তা সবই নিছক গুজব-গুঞ্জন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন আদালত। অথচ বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে কয়েক বছর ধরে শুনতে হলো মিথ্যা অপবাদ। আওয়ামী লীগ সরকারকে সমালোচনা সহ্য করতে হয়। আক্ষেপের বিষয়, এই দেশের আদালতে কোনও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ না হওয়াটা অনেকে বিশ্বাসই করেনি। দুদক বিষয়টির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে বলেছিল, অভিযোগ সব মিথ্যা। কেউ দুদকের তদন্ত বিশ্বাস করেনি। সরকারবিরোধীরা তো বিশ্বাস করেইনি, এমনকি ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণার কারণে আওয়ামী লীগপন্থী অনেকেও দুদকের তদন্তে বিশ্বাস করেনি। সমালোচনা করে বরং বলেছে, সরকার দুর্নীতি আড়াল করছে। দুদকের মাধ্যমে সরকার দলীয় দোষীদের সাদা সারটিফিকেট দিচ্ছে।

 

গুজব-গুঞ্জন-বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশে প্রখ্যাত-কুখ্যাত লোকের অভাব নেই। এমনকি দেশের বিরুদ্ধে ষড়য্ন্ত্র চললে অনেকে খুশি হন, অনেকে জেনে-বুঝে-স্বেচ্ছায় দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্তও হন, যা আমাদের মারাত্মক আশাহত করে। খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকার কখনোই পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারবে না। তিনি আবার ক্ষমতায় গিয়ে একটি নয়, দুটি পদ্মা সেতু করবেন। খালেদার কথা মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। বেগম জিয়ার নতুন করে ক্ষমতায় যাওয়ার খায়েশ এখনো পূরণ হয়নি। বিএনপি অনেক ভুল করেছে। এখন দলটির উচিত, দেশের স্বার্থে জাতীয় বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকা। নইলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। বিদেশি এজেন্টদের মধ্যে নিজের সুবিধা ছাড়া দেশপ্রেম বলে কিছু নেই। যাদের দেশপ্রেম নেই, মানুষের প্রতি ভালোবাসা নেই- তাদের দ্বারা দেশ ও জাতির কোনও কল্যাণ হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, ‘দুর্জন বিদ্ব্যান হলেও পরিত্যাজ্য’

 

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেখা গেছে, স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে এই দেশের পাকিস্তানি দোসররা। এই রাজাকার আল বদর, আল শামসরা শুধু স্বাধীনতার বিরোধিতাই করেনি, তারা আরও অনেক জঘন্য অপরাধ করেছে। তাদের যেমন বিচার হচ্ছে, তেমনি পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যারা জেনে-বুঝে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, সরকার ও দেশের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সম্ভব হলে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে অথবা অন্য যেকোনো আইনি ব্যবস্থায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার জরুরি। তাহলে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপকর্ম করার সাহস পাবে না। এমনি এমনি তাদের ছেড়ে দিলে এরাই অথবা এদের প্রেতাত্মারা সুযোগ পেলেই দেশের বিরুদ্ধে আরও ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়বে। এই সুযোগটি আমরা কেন বন্ধ করবো না?

 

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী বলেই তাঁর ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তায় পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ সম্ভব হয়েছে। তিনি এক্ষেত্রে পুরোপুরি ন্যায় ও সত্যের পথে ছিলেন বলেই জাতি কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়েছে। শেখ হাসিনার অকল্পনীয় দৃঢ়চেতা মনোভাব এবং ঐকান্তিক চেষ্টায় শত বাধা থাকার পরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। এরই মধ্যে স্বপ্নের পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। শুধু যোগাযোগই নয়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এই পদ্মা সেতু। আশা করা হচ্ছে, পদ্মা সেতু দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াবে অন্তত ১ দশমিক ২ শতাংশ। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশগ্রহণকারী দেশি-বিদেশি কম্পানি, প্রকৌশলীসহ কয়েক হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করছে। সকলের সমন্বিত চেষ্টায় আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই পদ্মা সেতুটি ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

 

বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এই বদলে যাওয়া এবং এগিয়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে পদ্মা সেতু। স্বপ্নের সোনার বাংলা একদিন বাস্তব হবে। পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন দেখেই আমাদের এই বিশ্বাস। বিশ্বাসঘাতকদের চিহ্নিত করতে হবে। তাদের শাস্তি দিতেই হবে। এটা আমাদের প্রাণের দাবি।

 

 

আরও পড়ুন :

 

# পারলামেন্টে মন্ত্রী-এমপিদের দাবি, পদ্মাসেতু ষড়যন্ত্রকারীদের ধরুন

 

# সরকারের কাছে চরমোনাই পীরের দাবি, দেশের সব মূর্তি ভেঙে দিন