Total Bangla Logo
For bangla আজ বৃহস্পতিবার 12:40 am
27 July 2017    ১১ শ্রাবণ ১৪২৪    02 ذو القعدة 1438

নারী নির্যাতন এবং আইন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

সাইদুর রহমান

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৬:২২ পিএম, ৫ মার্চ ২০১৭ রবিবার

একটি প্রতীকী চিত্র

একটি প্রতীকী চিত্র

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে সমাজ কাঠামো, বিকশিত হচ্ছে সভ্যতা। পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে মানুষের জীবনযাত্রায়। শুধু তাই নয়! নারী সমাজের সাফল্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায় সর্বক্ষেত্রে। আশ্চর্য হলেও সত্য, বন্ধ হয়নি-নারী নির্যাতন। নারী চিরকাল পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। নারীর প্রতি বিরূপ আচরণ করতে জাতি, সমাজ, রাষ্ট্র কুণ্ঠাবোধ করেনি। নারীকে সামাজিক ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত অপমান সহ্য করতে হয়। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ পদে নারী তথা প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলেরও প্রধান নারী আর মহান সংসদের স্পীকার পদেও স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে আছেন একজন নারী। এছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের পদেও নারী। কিন্তু যখন ‘নারী নির্যাতনের’ বিষয়টি সামনে চলে আসে তখন হৃদয়ে যেন নীরব রক্তক্ষরণ হয়। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় নারী নির্যাতনের চিত্র বা খবর মনকে হতাশাগ্রস্থ করে। আর এসব নির্যাতন সর্বস্থরে লক্ষ্যনীয় যেমন ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ, পরকীয়া, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, প্রতারণা এমনকি হত্যা। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে মারাত্মক ‘মানসিক নির্যাতন’।

 

আরও পড়ুন-‘নারীরা দুর্বল ছোট কম বুদ্ধি রাখে` ইউরোপিয়ান পারলামেন্টে মন্তব্য



এ কারণে হয়তো-বা অনেক নারীর নীরব হাহাকার চার দেয়ালের ভেতরে ঘুরে বেড়ায়। বর্তমান আমাদের সমাজে নারীরা স্বামীর হাতে বেশি নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। তবে নারীরা নারীর হাতেও নিপীড়নের শিকার হন। যেমন শাশুড়ি ও ননদ। এজন্য নারী-পুরুষ সমানভাবে দায়ী। নারীর ওপর নির্যাতনের প্রভাব সমাজের সব ক্ষেত্রে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। লোকলজ্জার ভয়ের কারণে অনেক নারী তার নির্যাতনের কথা লুকিয়ে রাখে। সেসব না বলা কথা কেউ জানতেও পারেনা। সেসব যদি উঠে আসতো, প্রকৃত পরিসংখ্যানের চিত্র হয়তো শিউরে উঠার মতোই ভয়াবহ হতো। তাই নারীর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধ করতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে এবং সমাজকে বদলাতে গেলে প্রয়োজন সচেতনতা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং বহুমাত্রিক তৎপরতা -প্রথমত নারীকে ক্ষমতাহীন করে রাখার ধ্যান-ধারণা বদলাতে হবে এবং অবশ্যই নারী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। শিক্ষা, চাকরি, পুুঁজি দিয়ে নারীকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার মানসিকতা অর্জন করতে হবে প্রতিটি পরিবারকে।

তাহলেই আমাদের প্রত্যাশা নারী নির্যাতনমুক্ত একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানের নিরাপদ সমাজ গঠন করতে পারবো।
নারীদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নারী প্রবন্ধে লিখেছেন :


‘যে পাখির ডানা সুন্দর ও কণ্ঠস্বর মধুর তাকে খাঁচায় বন্দী করে মানুষ গর্ব অনুভব করে; তার সৌন্দর্য সমস্ত অরণ্য ভূমির, একথা সম্পত্তি লোলুপরা ভুলে যায়। মেয়েদের হৃদয় মাধুর্য ও সেবা-নৈপুণ্যকে পুরুষ সুদীর্ঘকাল আপন ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে কড়া পাহারায় বেড়া দিয়ে রেখেছে। মেয়েদের নিজের স্বভাবেই বাঁধন মানা প্রবণতা আছে। সেই জন্যে এটা সর্বত্রই এত সহজ হয়েছে’। (স্বাতী জসিম, নারীবাদ ও বাংলাদেশের নারী ঔপন্যাসিক, জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ২০১১, পৃ: ২০)

 

আরও পড়ুন-গৃক দেবির মূর্তি সরাতে বুকের তাজা রক্ত দেবেন চরমোনাই পীর

 

নারী নির্যাতন : নারী নির্যাতন বলতে আমরা কোন নারীর উপর দৈহিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগকে বুঝি। অর্থাৎ নারীর দেহ ও মনের উপর জোরপূর্বক খবরদারি বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে দৈহিক বা মানসিক পীড়া দেওয়ায় হলো নারী নির্যাতন। আরো সুস্পষ্টভাবে বললে বলা যায়, বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ নারী। আর ‘নারী নির্যাতন’ বিষয়টি এদেশের জাতীয় উন্নয়নের অন্তরায়। যেমন: স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে শারিরিক নির্যাতন, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারিরিক সম্পর্ক, জোর পূর্বক যৌন নির্যাতন, পরকিয়া প্রেমে মানসিক নির্যাতন, যৌতুক সম্পর্কিত নির্যাতন, বাল্য বিবাহ ইত্যাদি। আর এসব নির্যাতনের ফলে নারীরা তাদের জীবন বিপন্ন করতে বাধ্য হয়। Oxford English Dictionary-তে বলা হয়েছে Violence শব্দটি ল্যাটিন শব্দ। Vialatia শব্দ থেকে এসেছে, যার শাব্দিক অর্থ শক্তি প্রয়োগ, উৎপীড়ন, আক্রমণ ইত্যাদি। জাতিসংঘ ঘোষণা ১৯৯৩ এর Articla-(১), অনুযায়ী নারী নির্যাতন হলো- `Violence against Women Includes aû act of gender base violence that results in or in likely to result in, physical, sexual or psychological harm or suffering to women including threats such as coercion or arbitrary deprivation or liberty weather in public or private life.` (http://www.un.org/documents/ga/res/48/a48r104.htm, access date on: 10.02.2017, 6.15PM)

 

নারীর প্রতি নির্যাতনের ধরন: আমাদের দেশে নারী নির্যাতনের ধরন ও সংখ্যা বাড়ছে। যদিও তা সংখ্যায় কম, তবুও এ ধরনের একটি ঘটনাও আমরা মেনে নিতে পারি না। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল কলেজগুলোতেও যৌন হয়রানির মতো ঘটনা ঘটছে। আমরা বিভিন্ন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের উত্ত্যক্তের ঘটনা লক্ষ্য করেছি। এছাড়া পত্রিকার পাতায় আমরা নারী নির্যাতনের নানা ধরণের খবর জানতে পারি। অর্থাৎ নারীদের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছে। নিন্মে নারী নির্যাতনের কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করা হলো:- বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অগ্রগতি বড় ভূমিকা রাখলেও ঘরের মধ্যে নারীর অবস্থা তেমন বদলায়নি। দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো সময়ে, কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেছেন, ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক এবং ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিস্ময়কর আরও তথ্য হচ্ছে, এসব নারীর ৭৭ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা বিগত এক বছরেও একই ধরনের নির্যাতন ভোগ করেছেন। বড় অংশের নারীকেই তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক গড়তে বাধ্য হতে হয়েছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১৪ সালের সালের ডিসেম্বর মাসে দেশে প্রথমবারের মতো নারী নির্যাতন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি জরিপ ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১’ (Md. Alamgir Hossen, Measuring Gender-based violence: Results of the Violence Against Women (VAW) Survey in Bangladesh, 2014, Mexico.) নামে একটি প্রকাশিত করে। এ জরিপে নারী নির্যাতনের এ ধরনের চিত্রই উঠে এসেছে। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিবিএসের এ জরিপ বলেছে, শারীরিক নির্যাতনের শিকার নারীদের মাত্র অর্ধেক চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পান। এক-তৃতীয়াংশ নারীই স্বামীর ভয়ে বা স্বামী সম্মতি না দেওয়ায় চিকিৎসকের কাছ পর্যন্ত যেতেই পারেননি। জরিপ অনুযায়ী, শহরের তুলনায় গ্রামে নারী নির্যাতনের ঘটনা একটু বেশি ঘটে। বয়স অনুযায়ী নির্যাতনের ধরন পাল্টাতে থাকে। আবার যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে অবিবাহিত নারীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিবাহিত নারীরা এর শিকার বেশি হন। মূলত: স্বামীর বাড়িতে নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার বেশি হন।
বিভিন্ন বয়সে নারীদের নির্যাতনের দৃশ্যগুলো আমরা সাধারণত দেখে থাকি। সেগুলো হলোঃ

 

আরও পড়ুন-ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস ছাড়লেন বাংলাদেশি রুমানা, কেন, জানুন

 


বয়ঃসন্ধী: প্রেম সংক্রান্ত নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে যৌন নির্যাতন ও হয়রানী,  জোরপূর্বক ধর্ষণ ও চলাচলে বাঁধা নিষেধ।

গর্ভ ধারণকালে: গর্ভ ধারণকালীন নির্যাতন এখনও রয়েছে। নারীদের গর্ভধারণকালে স্বামীর নির্যাতন, জোরপূর্বক ধর্ষণ ও কর্মস্থলে নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়।

বার্ধক্যের সময় : নারীদের বৃদ্ধা বয়সে নানা ধরনের অমর্যাদা, অসহযোগিতা এমনকি বৃদ্ধাশ্রমেও পাঠানো হয়।

২০১৪ সালে বিভিন্নভাবে ৫২৫৬ জন ও ২০১৫ সালে ৫৫২২ জন নারী নির্যাতিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধসমূহ কঠোরভাবে দমনের উদ্দেশ্যে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ প্রণয়ন করেছেন।

 

ক্রমিক নং ধরন জানুয়ারি-ডিসেম্বর-2014 জানুয়ারি-ডিসেম্বর-2015 হ্রাস/বৃদ্ধি
01 যৌ্ন হয়রানি (including stalking) 293 360 24%
02 পারিবারিক নির্যাতন 1005 996 (স্বামী কর্তৃক হত্যা) -1%
03  যৌতুক 307 392 28%
04 ধর্ষণ 789 1069 35%
05 কমিউনিটি ভায়োলেন্স 1463 1465 0%
06 ফতোয়া 37 21 -83%
07 এসিড সন্ত্রাস 58 45 -22%

 

08 পাচার 84 25 -70%
09 অপহরণ 252 270 -7%
10 নিখোঁজ 160 78 -51%
11 উদ্ধার 700 760 9%
12 গৃহকর্মী (হত্যা/ধর্ষন/নির্যাতন) 108 48 -56%
  মোটঃ 5256 5522 5%


উপরে উল্লেখিত ছক বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই-


# ২০১৫ সালে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে (৩৫%) বেড়েছে। এছাড়া যৌতুকের কারণে নির্যাতন (২৮%), যৌন হয়রানি (রহপষঁফরহম ংঃধষশরহম) (২৪%) বৃদ্ধি পেয়েছে।


# ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে কমেছে গৃহকর্মী নির্যাতন ৫৬%, ফতোয়া ৪৩% এবং এসিড সন্ত্রাস ২২%।


# ২০১৫ সালে ১৮৪৭ নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং সহিংসতার শিকার হয়ে ৩০১ জন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
সংবাদপত্রে গড়ে প্রতিদিন ১৫ জন বা তার বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশিত হয়।


# ২০১৫ সালে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সহিংসতার শুধুমাত্র এক-তৃতীয়াংশ নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। (http://www.bnwlabd.org/?p=5901 Viewed on: 01.03.2017.)



তথ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে যে, নারী নির্যাতনের মূূল কারণ হলো ‘বৈষম্য’। সুতরাং বৈষম্য নিরসন করতে না পারলে নারী নির্যাতন কখনোই বন্ধ হবে না। অতএব, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বৈষম্য ভেদে নারী নির্যাতনের কারণসমূহঃ


১. জৈবিক বা শারীরিক পার্থক্য: লিঙ্গ বিচারে মানব জাতিকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে নারী ও পুরুষ। শারীরিক ও গঠনগত কারণে নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমাদের সমাজের নারী পুরুষ মিলেই গড়ে ওঠে পরিবার। আর এ পরিবারে নারীরা সন্তান ধারণ করে থাকে এটা চিরন্তন সত্য। শুধু তাই নয় নারী ও পুরুষের কাজের ধরণও আলাদা। কারণ ঘরের বাইরের কাজে নারীরা দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারবেনা বলে মনে করে সমাজ। যদিও এ কথাটির কোন বৈজ্ঞানিক সত্যতা নেই।


২. ঐতিহাসিক কারণ: কার্ল মার্কসের মতে, সমাজের সূচনায় নারী পরাধীন ছিলনা। তাঁর মতে, ঐতিহাসিক যুগে সমাজের মানুষের মধ্যে কোন শ্রেনী ছিলনা, কেউ কাউকে শোষণ করতো না। তখন নারী পুরুষের মধ্যে সততা বিরাজ করতো। কালক্রমে সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে নারীরা পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। নি¤েœ নারী নির্যাতনের কিছু ঐতিহাসিক কারণকে বিশ্লেষণ করা হলোঃ


(ক) পুরুষতন্ত্রের উদ্ভব: নারী নির্যাতনের মূল কারণ নিহিত রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। মহাত্মা গান্ধীর উক্তির মতো সবল এবং দুর্বল দু’শ্রেণীতে ভাগ হয়ে গেছে। পুরুষরা সবল, নারী দুর্বল। নারী জাতি হিসেবে দুর্বল নয়, পুরুষরাই তাদের দুর্বল করে রেখেছে, রেখেছে অবলা আর অধিকারহীন করে। সময় যত গড়াচ্ছে নারীরা এসব বুঝতে পারছে। তারা যখন সচেতন হচ্ছে ঠিক তখনই নড়েচড়ে বসছে পুরুষ শাসিত সমাজ।


(খ) লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজন : লিঙ্গ বিচারে মানবজাতির দু’ভাগ নারী এবং পুরুষ। বর্তমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মানুষের এ লিঙ্গ ভিত্তিক শ্রম বিভাজন প্রক্রিয়া চালু আছে। ফলে সমাজের গৃহস্থলীর কাজকে নারীর জন্য নির্ধারিত। আর ঘরের বাইরের সম্মানজনক, উপার্জনমূলক কাজ করে পুরুষ। সমাজের এই লৈঙ্গিক শ্রম বিভাজন নারীদের দারুণভাবে আঘাত করে।


৩. সামাজিকভাবেও নারীকে দেয়ালবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তাদের সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ, উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগীতা অর্থ্যাৎ কোন প্রকার সমাজসেবা কাজে অংশগহণের সুযোগ দেয়া হয় না। নিচে কিছু সামাজিক কারণ উল্লেখ করা হলোঃ


(ক) সামাজিকীকরণ: সামাজিকীকরণের কারণে বিভিন্ন আর্থ সামাজিক অবস্থায় নারী পুরুষের অধিকার, মর্যাদা, কাজের ধরণ সর্বোপরি সম্পর্কও বিশেষায়িত করা হয়। নারী অধিকার যে পুরুষের সমান তা অনেক সমাজ সংস্কারক বলে গেছেন। হতাশাজনক এই যে, একুশ শতকেও নারীর অবস্থানের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় নি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় অবস্থানেই নারী পশ্চাৎপদ। যদিও পাশ্চাত্যের অবস্থান তুলনামূলকভাবে উন্নত। তারপরও দেখা যায়, পদে পদে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়, কুনফুসিয়াশের উক্তিটি, ‘পুরুষ উচ্চতর, নারী নিম্নতর’।


(খ) যৌতুক: বর্তমানে নারীরা পুরুষ কর্তৃক যত প্রকার নির্যাতিত হচ্ছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে যৌতুকের শিকার। বর্তমানে এ যৌতুক একটি প্রথা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যা নারী সমাজের জন্য এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যৌতুকের ফলে কত নারীর সোনার সংসার ভেঙ্গে তছনছ হয়েছে তার কোন হিসেব নেই। কত নারী যে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে তারও কোন পরিসংখ্যান নেই। এ জন্য নারী শিক্ষার স¤প্রসারণ বাড়িয়ে যৌতুক বিরোধী কঠোর আইন প্রয়োগ করে যৌতুককে সমাজ থেকে চিরতরে বিদায় করতে হবে। তাহলে দেশে আসবে শান্তি আর পরিবার হবে সুখের।


(গ) অসচেতনতা : আমাদের দেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় কম শিক্ষিত হওয়ায় বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে কম জানে। এছাড়া আইনানুগ ব্যবস্থা সম্পর্কে নারীদের সচেতনতার অভাবে রয়েছে। ফলে নারীরা বিভিন্ন নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়। এ জন্য নারী শিক্ষার স¤প্রসারণ বাড়িয়ে আইন ব্যবস্থা সম্পর্কে নারীদের সচেতন করতে পারলে সমাজ থেকে নারী নির্যাতন কমবে।


(ঘ) দুর্বল সংগঠন: নারীর প্রতি সহিংসতা বা নির্যাতন বন্ধের জন্য বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে কিন্তু সংগঠনগুলো দুর্বল ও সংখ্যায় কম হওয়ায় তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেনা।


(ঙ) তালাকের অপব্যবহার: পারিবারিক জীবনে ভাঙ্গন ও বিপর্যয় অত্যন্ত মর্মান্তিক ব্যাপার। তালাক হচ্ছে এ বিপর্যয়ের চুড়ান্ত পরিণতি। পুরুষের কাছে তালাকের ব্যাপারটি একবোরে তুচ্ছ বিধায় নারীরা সর্বদা আতংকে মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়।


(চ) মূল্যবোধের অবক্ষয় : প্রচলিত আইন, সাংস্কৃতি, সামাজিক, ধর্মীয় রীতিনীতিতে নারীর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করায় ধীরে ধীরে মূল্যবোধের অবক্ষয় হতে চলেছে। দাম্পত্য জীবনে স্বামী স্ত্রী’র মধ্যে বিবাধ-বিরোধ মনোমালিন্য দেখা দিলেই নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়।


বর্তমান সমাজে রাজনৈতিক কারণেও নারীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্যাতন ভোগ করছে। নারীদের জন্যে এক মহাবিপদাপন্ন সময় অতিবাহিত হচ্ছে বললে ভুল হবে না। ঘরে বাইরে যেনো কোথাও নারীর নিরাপত্তা নেই। একের পর এক খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, গণধর্ষণসহ বিবিধভাবে অবিচারের শিকার হচ্ছে নারীরা। নারী নির্যাতন বন্ধে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সততা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে আসা। কিন্তু সেই সদিচ্ছা কোথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। নিম্নে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা কিভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তা উল্লেখ করা হলোঃ


(ক) রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতা: বাংলাদেশ সংবিধানের ২৬,২৭,২৮ এবং ২৯ নং ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশের সকল নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং রাষ্ট্র কর্তৃক যে আইনগুলো প্রণয়ন করা হয় সে আইনে নারী পুরুষ উভয়ই সমান কিন্তু বাস্তবে তার কোন রুপরেখা মেলেনা। এছাড়া রাজনৈতিক দলে, নির্বাচনে, আইনসভায়, শাসন বিভাগে, বিচার বিভাগসহ প্রতিটি সেক্টরে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।


(খ) সিদ্ধান্ত কাঠামোয় নারীর উপস্থিতি নগণ্য: রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বে সংখ্যা কম থাকায় সাধারণভাবে সিদ্ধান্ত কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণ কম। এছাড়া সরকারের প্রশাসন ক্যাডারে নারীদের সংখ্যাও অনেক কম। কিন্তু বর্তমান সরকার তা প্রতিকারের উদ্যোগ নিয়েছে।


(গ) ধর্মীয় রাজনীতি: ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ফলে নারীরা বেশি নিগৃহীত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ইসলাম পরিপন্থী। ইসলামে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিধান নেই। তিনি বলেন, বিশ্বের ১৬২ টি দেশের ওপর চালানো এক জরিপে জঙ্গিবাদ কর্মকান্ডে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩ তম। আসলে দেশের মাদরাসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জঙ্গিবাদ চর্চা বেশিমাত্রায় হয়ে থাকে। এজন্য এ শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিককীকরণ করা উচিত।


(ঘ) অর্থনৈতিক কারণ: অর্থনৈতিক কারণেও নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের নারীদের ভূমিকা অনস্বিকার্য। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান রেমিটেন্স আনে যে গার্মেন্টস সেক্টর সেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী কাজ করছে। কিন্তু সেখানে নারীদের নির্যাতনের ঘটনা নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত নারীদের প্রতি দায়িত্ব পালনে সরকার সব সময়ই সচেতন। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে নারীরা তাদের অর্থনৈতিক হাতকে আরও গতিশীল করতে পারবে।


(ঙ) আইনগত কারণ: মানুষ হিসেবে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে নারীদেরও সমান অধিকার রয়েছে। মানবাধিকার সনদে স্পষ্ট বলা আছে, ধারা ৩ : জীবন, স্বাধীনতা এবং দৈহিক নিরাপত্তায় প্রত্যেকের অধিকার আছে। ধারা ৫ : কাউকে নির্যাতন করা যাবে না। কিংবা কারও প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না। অথবা কাউকে এহেন শাস্তি দেওয়া যাবে না। ধারা :৭ আইনের সামনে প্রত্যেকেরই ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভের অধিকার আছে। কিন্তু নারীর ওপর নির্যাতনের মাত্রা এ সনদের ধারাগুলোকে বৃদ্ধাঙুলী দেখাচ্ছে। অর্থাৎ নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন কোনো বিষয়-ই না। অনেক আন্দোলন, সভা, সমাবেশ হচ্ছে। নারীর জন্য আইনও আছে অনেক। তারপরও চলছে নারীর প্রতি নির্মম আচরণ। নারী নির্যাতনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো আইনের দুর্বলতা এবং যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া।


(চ) পারিবারিক কারণ: বাংলাদেশের মতো পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের স্বীকার হয় স্বামী কর্তৃক তবে নারীরা পরিবারের নারীদের কাছ থেকেও নির্যাতনের স্বীকার হয়ে থাকে। যেমন শাশুরী ও ননদ কর্তৃক। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে নারীরা আত্মহত্যার মতো মহাপাপ করতে বাধ্য হয়। সুতরাং আমাদের গৃহ থেকেই নারী মূল্যায়ন করতে হবে। ঘর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায়ও নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সরকারের জবাবদিহিতার জায়গা থাকা, আইনের সঠিক প্রয়োগ, নারীর প্রতিবাদী হওয়া, নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা, সরকারি কার্যকর পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে নারীর অধিকার রক্ষায় কাজ করতে হবে। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীরা আইনের আশ্রয় নিতেও ভয় পান। তবে যাঁরা আইনের আশ্রয় নেবেন, তাঁরা যেন সুরক্ষা পান, রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে।


(ছ) প্রচার মাধ্যমে নেতিবাচক ভূমিকা: প্রচার মাধ্যমে নারীকে ব্যবহার করা হয়েছে পণ্যের ন্যায়। যার ফলে সমাজে নারীকে পণ্যের মতো দেখে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রচার মাধ্যমের এ নেতিবাচক ভূমিকা নারী নির্যাতনকে আরো দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে। এজন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রচার মাধ্যমের কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরী।


(জ) বৈশ্বিক কারণ: নারীর বিরুদ্ধে নির্যাতন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। নারী নির্যাতন বন্ধে নারীর শিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। এ সমস্যার সমাধানে কেবল আইন করলেই চলবে না, পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ-রাষ্ট্র সবাইকে এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে।


(ঝ) নারীর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধের উপায়: নারীর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হলে প্রথমে গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে জনসচেতনতা।  বেড়েছে আইন প্রয়োগের মাত্রা। তদুপরি নির্যাতনকে সমূলে উৎপাটন করতে হলে আমাদের নি¤œলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবেঃ


(১) সামাজিক ক্ষেত্রে: নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। সমাজে নারী ও পুরুষের ন্যায্য অধিকার ও গুরুত্ব রয়েছে, উভয়ে মিলে তারা  যে অভিন্ন সত্তা, এ মানবিকতাবোধকে পুরুষেরা গভীরভাবে উপলব্ধি না করলে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে না। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সুনীতি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার সামাজিক আন্দোলন জোরদার করতে হবে। নি¤েœ সামাজিক বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো:

ক. নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ: নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই নির্যাতনের মূলসূত্রটি লুকায়িত আছে। এ মনোভাব পাল্টানোর জন্য উপযুক্ত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের পাশাপাশি নারীর প্রতি পুরুষের যখন পরিপূর্ণ আস্থা আসবে এবং স্ত্রীকে প্রেম-প্রীতি ও মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারবে, তখনই পৃথিবী শান্তির নীড় হবে।


খ. পুরুষতন্ত্রের উচ্ছেদ: পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা দুর হলে নারী নির্যাতনের ঘটনা সমাজে বিরল হবে। আধুনিক সমাজর লোকেরা যেখানে নারীর স্বাধীনতা বলে গলা ফাটায় কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় সমাজেই সেই পুরুষতন্ত্রের প্রভাব বিদ্যমান থাকে। সুতরাং পুরুষতন্ত্রের উচ্ছেদ হলে নারী নির্যাতন কমে আসবে।

গ. পুরুষতন্ত্রের মানবিকীকরণ: নারী নির্যাতনকে কাঙ্খিতভাবে রোধ করতে হলে প্রথমে ভাবতে হবে পুরুষদের নিয়ে। কেন তারা নির্যাতন করে এবং কিভাবে এই নির্যাতনের দায় থেকে মুক্তি পেতে পারবে এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সমাজের ধর্মীয় নেতাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

ঘ. যৌতুক বাল্যবিয়ে বন্ধ: বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ যৌতুক ও বাল্য বিবাহ। তাই নির্যাতন বন্ধে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে যৌতুক প্রথা বন্ধ করতে হবে। কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যৌতুক ও বাল্য বিবাহ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এটি বন্ধ করার জন্য সামাজিক সচেতনতা ও বাল্য বিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

ঙ. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো: শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে নারী শিক্ষা স¤প্রসারণ করার মাধ্যমে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। কারণ সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে নারী শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। যেহেতু, সুস্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সুস্বাস্থ্য বলতে আমরা বুঝি নিরোগ ও সতেজ দেহ। দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারি নারী ভবিষ্যতে ভালো জাতি উপহার দিতে পারবেনা। তাই পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সমভাবে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।


চ. সংগঠনের ভূমিকা পালন: নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যে সকল সংগঠন রয়েছে তাদের কার্যক্রম আরো জোরালো করতে হবে। এজন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমাজের শিক্ষিত বিবেকবান সকল মানুষের সামাজিক দায়িত্ব। তাই নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পুরুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নারী নির্যাতন বন্ধে যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নারীদের প্রতি সকল প্রকার নির্যাতনরোধে দেশের সকল সংগঠনকে সচেতন, বলিষ্ঠ ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

ছ. নারীর সচেতনতা : যেখানেই নারী নির্যাতন, সেখানেই নারীদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নারীদের নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিজেদের অধিকার সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। সাহস নিয়ে যেকোনো দাবি তথা অধিকার আদায়ে এগিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে নারীদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হবে এবং নির্যাতনের মাত্রা কমে আসবে।

জ. নারীর দারিদ্র্য দূর করা : দরিদ্রতা ও বেকারত্ব দেশের অভিশাপ। একজন নারীর মুক্তি তখনই হবে, যখন নারীরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। সামাজিকভাবে দারিদ্রতা রেখে নারীর বিরুদ্ধে নির্যাতন প্রতিরোধ ও নির্মূল করা যাবে না। এজন্য নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। নি¤েœ তা উপস্থাপন করা হলো:

ঝ. আইনগত ক্ষেত্রে : নারী নির্যাতন রোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আইনের সুযোগ গ্রহণে সহজলভ্যতা এবং প্রয়োগে রাষ্ট্রকে আরো স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় রয়েছে ‘সিডও’ সনদ। যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার নিশ্চয়তা বিধানের আবশ্যকীয়তা তুলে ধরা এবং নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দান, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে।

ঞ. রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে : সংবিধানের ৬৫ (৩) ধারায় নারীর জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষিত করা হয়েছে এবং ৩ ধারার অধীনে স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ২৭নং ধারায় উল্লেখ আছে- ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ ২৮ (২) ধারায় উল্লেখ আছে- ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবেন।’ কিন্তু এ সকল নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ বৃদ্ধিতে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তাহলে নারী নির্যাতন কমে আসবে।


ট. প্রশাসনিক ভূমিকা : নারী নির্যাতনের প্রশাসনিক ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, মানসিক অসুস্থতা, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক অসচেতনতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে মূলতঃ নারীরা নির্যাতনের শিকার হন। এর সমাধানে প্রথমত রাষ্ট্রকে নারীবান্ধব হতে হবে। পাঠ্যসূচিতে নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা, নারীদের শিক্ষিত করে তোলা এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করা, নারীদেও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে ইতিবাচকভাবে তাদের উপস্থাপন করার বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। তাহলেই নারী নির্যাতন আরো কমে আসবে।


ঠ. ধর্মের সঠিক ব্যাখা : ইসলাম নারীর মান মর্যাদা ও ইজ্জত হেফাযতের ব্যবস্থাই শুধু করে নি, বরং নারী যাতে কোনোক্রমেই দৈহিক কিংবা মানসিকভাবে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত না হয় সে রকম দিক-নির্দেশনা দিয়েছে এবং তদানুযায়ী নিয়ম পদ্ধতি ও বিধান জারী করেছে। একমাত্র ইসলামই পারে নারী নির্যাতন নির্মূল করতে। এক্ষেত্রে ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা অনুসরণ করতে হবে। (http://satkhiranews.net/?p=63580 Viewed on: 01.03.2017.)


ঢ. গণমাধ্যমের ভূমিকা : নারী পীড়কদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা অসাধারণ। নির্যাতনের পদ্ধতির যেন শেষ নেই। প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রে নারী নির্যাতনের নতুন নতুন ধরনের খবর আমরা লক্ষ্য করি। নারী নির্যাতনরোধে গণমাধ্যম অগ্রনী ভূমিকা রাখতে পারে। নিচে গণমাধ্যম যে সকল ভূমিকা রাখতে পারে তা উল্লেখ করা হলো:


ক. নারী নির্যাতন সম্পর্কে জনগণকে সঠিক খবর জানানো।
খ. নির্যাতনের বিষয়ে সচেতন করতে পারে।
গ. নির্যাতনের বিষয়ে জনমত প্রকাশ করতে পারে।
ঘ. বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতন রোধে ভূমিকা পালন করবে।
ঙ. নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে গণমাধ্যমের ভূমিকা রাখতে হবে।


অতএব, আমরা বুঝতে পারি, নারীদের প্রতি নির্যাতন আমাদের দেশে একটি সাধারণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সর্বোপরি আমাদের বিশ্বাস, নারী নির্যাতন বন্ধে গণমাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা এক অপরিহার্য বিষয়। যা দেখে মানুষের মধ্যে সচেতনতার সৃষ্টি হবে। তাহলে নারী নির্যাতন কিছুটা হলেও কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

সাইদুর রহমান : স্টুডেন্ট, সমাজকর্ম বিভাগ, ইউনিভারসিটি অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি এন্ড সাইন্সেস (ইউআইটিএস), ঢাকা

 

E-mail : saidurrahmandsm@gmail.com

 

নোট : অসম্পাদিত।