আজ সোমবার 10:44 am06 July 2020    ২১ আষাঢ় ১৪২৭    15 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

দেশে প্রতি পাঁচজনের একজনই মানসিক রোগী

তাকরিম হাসান

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০৪:২৩ পিএম, ৮ অক্টোবর ২০১৬ শনিবার | আপডেট: ০২:০৫ পিএম, ১২ অক্টোবর ২০১৬ বুধবার

দেশে মানসিক চিকিৎসার জন্য দুটি মোটে বিশেষায়িত হাসপাতালের একটি এটি।

দেশে মানসিক চিকিৎসার জন্য দুটি মোটে বিশেষায়িত হাসপাতালের একটি এটি।

উষ্কখুষ্ক চেহারা, ধুলা-মলিন পোশাক, দুই হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। তরুণটি ইতিউতি ঘুরছে। মাঝে মাঝেই ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে। তার মা তাকে আটকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।

 

ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের বহির্বিভাগের বারান্দায় এক সকালবেলার চিত্র ছিল এটি। এখানে এ রকম দৃশ্য নতুন নয়। সকাল থেকেই বহু মানুষ সেখানে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটেন। দশ টাকার একটি টিকেট কাটলেই দেখা পাওয়া যায় বহির্বিভাগের ডাক্তারের।

অফিসাররা বলছেন, এই হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন তিন শতাধিক মানুষ আসে চিকিৎসাসেবা নিতে। এদের সবার অবস্থাই যে হাতবাঁধা এই তরুণটির মতো, তা নয়। বেশিরভাগকেই অন্য দশজন সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করা যাবে না।

হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের ওয়ার্ডে ঢুকতেই বড়সড় তালা মারা একটি ফটক। রয়েছেন একাধিক দ্বাররক্ষীও। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে একটি ওয়ার্ডে ঢুকে দেখা গেল বেশ কিছু মানুষ আড্ডা দিচ্ছে। এদের মধ্যে কে রোগী, কে রোগীর স্বজন, আলাদা করার উপায় নেই। একজন মোটে বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে।

কথাবার্তা বলে জানা গেলো, আড্ডায় অংশ নেয়া হাসিখুশি মানুষদের অধিকাংশই এই ওয়ার্ডের রোগী।

এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা গল্প। কেউ প্রেমে ব্যর্থ। কেউ ঋণগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা-প্রবণ। কেউবা মাদক সেবন করতে করতে হারিয়ে ফেলেছেন মানসিক ভারসাম্য।

রোগী অনেক, সুযোগ সামান্য


বাংলাদেশে ২০০৯ সালে ও ২০০৫ সালে সর্বশেষ যে জাতীয় সমীক্ষা দুটি হয়েছে, তার ফলাফল অনুযায়ী দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে অন্তত একজন কোন না কোন মানসিক রোগে আক্রান্ত- যার চিকিৎসা হওয়া প্রয়োজন।

অথচ মোট দুটি বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতালসহ সবমিলিয়ে দেশে রয়েছে মোটে ৮শর মত শয্যা, ২শর সামান্য বেশি মানসিক ডাক্তার এবং ৫০ জনের মতো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট। জানিয়েছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডাক্তার হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

বাজেটেও বরাদ্দ নেই বললেই চলে।

ড. আহমেদ বলছেন, ২০০৫ সালের জাতীয় বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, দেশটির স্বাস্থ্য খাতে প্রতি ১শ টাকা বরাদ্দের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য থাকে মোটে ৪৪ পয়সা। এগুলোকে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে উল্লেখ করছেন তিনি। তার চোখে বড় বাধা হল, অসচেতনতা এবং সামাজিক ধ্যান ধারণার কারণে রোগ গোপন রাখার চেষ্টা।

সংক্ষিপ্ত একটি এলাকাজুড়ে চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, এসব সমস্যার কারণে একজন রোগী তার রোগের লক্ষ্ণণ প্রকাশ হবার পর থেকে ডাক্তারদের দ্বারস্থ হওয়া পর্যন্ত ৬ বছর সময় লেগে যাচ্ছে।

কেন গোপন রাখার প্রবণতা?

নাম পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দম্পতির সাথে আলাপকালে জানিয়েছেন, তাদের লেখাপড়ায় অনিচ্ছুক কৈশোরোত্তীর্ণ ছেলেটিকে নিয়ে তারা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। এটাকে তারা একটি মানসিক রোগ বলে মনে করেন। তারা একথা সবার কাছ থেকে গোপন রেখেছেন।

কেন গোপন রেখেছেন জানতে চাইলে ছেলেটির বাবা বলেন, "তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে। জানলে তো মানুষ তাকে বলবে মানসিক রোগী। এতে তার ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে"।

এই লুকিয়ে রাখার চেষ্টার ফলে সমস্যা আরো ঘনীভূত হওয়া ছাড়া কোন উপকার হয় না, বলছেন ড. আহমেদ।

সারাদেশের সব হাসপাতাল মিলে মানসিক রোগীদের জন্য বিছানা রয়েছে মোটে ৮শ`র কিছু বেশী।

কোনটি সঠিক চিকিৎসা?

একসময় মানসিক রোগের জন্য নানা অপচিকিৎসার আশ্রয় নিত বাংলাদেশের মানুষ। দেশে পীর, ফকির, ওঝা, কবিরাজদের এখনো অনেক ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়তা রয়েছে। এমনকি ঢাকাতেও মানুষকে এ ধরনের চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে।

মানুষজনের মধ্যে সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে অপচিকিৎসার প্রকোপ কিছুটা কমলেও ডাক্তারের দ্বারস্থ হলেই যে মানসিক রোগের সমাধান হবে-সেটাও মনে করছেন না কোন কোন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট।


মনোবিদ মেহতাব খানম বলছেন, রোগীর রোগটা কি ওষুধ দিয়ে ঠিক করার উপযোগী না কি তাকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সুস্থ করে তুলতে হবে, সেটা আগে ঠিক করতে হবে।

কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ঠিক করার মতো রোগ হলে তার গন্তব্য মানসিক চিকিৎসক অর্থাৎ সাইকিয়াট্রিস্ট হওয়া উচিত নয়, তার গন্তব্য হওয়া উচিত মনোবিদ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, বলছেন প্রফেসর খানম।

 

http://www.aljazeerabangla.com/সাহা