আজ বৃহস্পতিবার 9:59 pm21 September 2017    ৬ আশ্বিন ১৪২৪    29 ذو الحجة 1438
For bangla
Beta Total Bangla Logo

রম্যরস

দিলহারা সুচি দয়াহীনা দেবী

মোস্তফা কামাল

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০১:৪২ পিএম, ২৪ নভেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০২:০২ পিএম, ২৪ নভেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার

মোস্তফা কামাল : নিউজ এডিটর, বাংলাভিশন

মোস্তফা কামাল : নিউজ এডিটর, বাংলাভিশন

অকাতরে রহম নেওয়া সুচিই এখন বড় বেরহম। যেই অবলা-নিপীড়িতাতে দুনিয়াবাসী দিল ভরে রহম করেছে। দোয়া করেছে তার সংগ্রামের সাফল্য ও গৃহবন্দিত্বের অবসান কামনায়। সেই আরাধনা কবুল করেছেন মহান আল্লাহ, ভগবান, গড, প্রভু, নিরঞ্জন। কেটেছে সুচির গৃহবন্দি জীবনের অভিশাপ। ঝুলিতে জুটেছে যশ-খ্যাতি-সম্মান। শেষতক ক্ষমতায়ও।

 

মসনদজুড়ে বসার পর এ কোন মূর্তি শান্তিদেবী অং সান সুচির? নিপীড়িতের প্রতি ভালোবাসা দূরে থাক দয়ার কোনো নমুনাও কি আছে? মহামতি গৌতম বুদ্ধ বেঁচে থাকলে নোবেল বিজয়িনী শান্তিদেবীর আজকের মতি-গতি দেখে কী করতেন? মিয়ানমারের বৈরাগী বুদ্ধদের জঙ্গি লাউয়ার দামামা বাজানো দেখলে কী দশা হতো গৌতম বুদ্ধের? নিশ্চয়ই আত্মহত্যা। নইলে হাই প্রেসারে তাৎক্ষণিক মৃত্যু। কমছে কম হার্ট স্ট্রোকে পঙ্গুত্ব।

 

অভাজনদের জন্য গণনন্দিতা এ শান্তিদেবীর দীর্ঘ সংগ্রাম-ত্যাগে বিমুগ্ধতা কাটানোর মতো নয়। দীর্ঘ সংগ্রাম, গৃহবন্দি জীবন, লেখা-পড়া, বাবা-স্বামীহারা হওয়াসহ নানা কারণে দুঃখিনী রাজকন্যা ও সম্রাজ্ঞীর মায়া ভোলা কঠিন। অক্টোপাসের মতো এ দুর্বলতা। মনে হয়েছে, হিন্দুস্তানের ইন্দিরা গান্ধী-সোনিয়া গান্ধী, পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়ার মান তার। কখনো কখনো তাঁদের চেয়েও বড়। বিদ্যুতের গতিকেও হার মানানো আবেগে কাতর হয়েছি। ঠিক মতন ইবাদত-বন্দেগি করলে হয়তো সুচির জন্য দুয়েক বেলা নফল নামাজ-রোজাও করতাম।

 

কী বর্বরতা চলছে বার্মা মুল্লুকে! অহিংসা পরম ধর্ম, জীব হত্যা মহাপাপ-মহামতি গৌতম বুদ্ধের এই শিক্ষা বৌদ্ধপ্রধান মিয়ানমারে বড্ড বিবর্ণ। কয়েক দিন পর পরই সহিংসতায় রোহিঙ্গাদের প্রাণে নিধন করা হয়। অসংখ্য গো-বেচারা প্রাণভয়ে সাগরেই ভাসে। নিপীড়ন সহ্য করাই এদের নিয়তি। কয়েক দিন পর পর একেকটা গুজব তুলে এই মজলুমদের কচুকাটা করা হচ্ছে। এবারো করা হয়েছে ধর্ষণের গুজব রটিয়ে। এক বৌদ্ধ নারীকে ধর্ষণের গুজব ছড়িয়ে মুসলিমদের দোকানপাট, বাড়ি-ঘরে হামলা। খুন-খারাবি। বাদ যায়নি পবিত্র মসজিদও। বৌদ্ধরা না ভিক্ষু-নিরীহ, শান্ত-সুবোধ, মানবিক-নিরামিষী?

 

রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগের বসবাস মিয়ানমারের রোহিং এলাকায়। রোহিঙ্গা  শব্দের বাংলা তরজমা, নৌকার মানুষ। সমুদ্রে নৌকায় মাছ ধরে জীবিকা চালানোর দোষেই (!) এমন নামকরণ। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, আরবি শব্দ রহম (দয়া করা) থেকে রোহিঙ্গা শব্দের উৎপত্তি। খৃস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে আরবের একটি বাণিজ্য জাহাজ রামবৃ দ্বীপের পাড়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। তখন তারা দয়া ভিক্ষা চায়, রহম- রহম চিৎকার করে। সেই থেকেই তাদের পরিচিতি রোহিঙ্গা নামে। আমাদের কুমিল্লাঞ্চলে অবহেলিত, অন্যের দয়া-মায়ায় বেঁচে থাকাদের বোলায় রোহিঙ্গা নামে। ফরমালিনকে আদর করে ফৃজারভেটিভ বলার মতো। আহাম্মক না বলে অাবুল-মদন নামে সোহাগ করার মতো।

 

জাতিসংঘের তথ্য মতে, বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা । দারিদ্র্যের চরমে রোহিঙ্গারা নিজ দেশেই পরবাসী। অতীতের সামরিক জান্তা তাদের নাগরিক অধিকারই শুধু কেড়ে নেয়নি, সমাজের মূলস্রোত থেকেও বিচ্ছিন্ন করে ঢুকিয়ে দিয়েছে ক্যাম্পের বন্দিজীবনে। চাকরি-বাকরিতে তারা নাজায়েজ-অযোগ্য। শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকারহারা। জাতিসংঘ এখন আমাদের চাপাচাপি করছে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢোকার জন্য বর্ডার খুলে দিতে। খায়েশ কতো? এমনতিইে ঢোকে না তার ওপর আবার ত্যানা প্যাঁচায়। উইকিপিডিয়ার পরসিংখ্যান মতে, নির্যাতনের তোড়ে বার্মা ছেড়ে ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বহু আগেই ঢুকেছে বাংলাদেশে। এরা আমাদের নানা সমস্যা করছে। তাদের কেউ কেউ জঙ্গিপনাসহ নানা অপকর্মে জড়াচ্ছে। মিথ্যা পরিচয়ে নাগরিকত্বও নিচ্ছে। বাংলাদেশি পরিচয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে আজেবাজে কাজ করছে। বদনাম হচ্ছে বাংলাদেশের। এখন জাতিসংঘ বলছে, তাদের ঢোকার জন্য আমাদের সীমানা আরও খুলে দিতে।

 

নিজের ঘরবসতিতে বাঁচার আকুতি বিষাদময়। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সুচিদের জন্যও মনটা তাই কাঁদে। সেনাশাসনের নিপীড়ন, গৃহবন্দিত্বসহ নানা কারণে এই সুচির কান্না-কষ্টে কি কম বেদনাহত হয়েছি? রোহিঙ্গাদের মতো তিনিও তখন রহম-রহম চিৎকারে কম কেঁদেছেন? শান্তিদূতের দল গদিনশিন হওয়ায় আশা জেগেছিল, রোহিঙ্গারা কিছুটা হলেও হালে পানি পাবে। শুরু হবে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও । সব গুড়ে বালি। এতে বিলীনের পথে যেন দেবী-সুচিদের জন্য আফসোসের জায়গাটাও। 

 

অং সান সুচির নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিতে অনলাইনে স্বাক্ষর আবেদনের খবরটাও কষ্টদায়ক। এই আবেদনে এরই মধ্যে সই করেছেন লাখ লাখ সুচিভক্ত। শান্তিরক্ষায় কাজ না করা কারো নোবেল শান্তি পুরস্কার মানায় কি-না, এ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে তারা। সুচিকে দেওয়া শান্তি পুরস্কার হয় জব্দ, নয়তো ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি তাদের। এ দাবির প্রতি একমত-সহমত হওয়া কঠিন। গভীর শ্রদ্ধা-মমতায় ভালোবাসার চুক্তিনামায় সই করে মন-প্রাণ দেওয়া কারো সঙ্গে বিচ্ছেদ কি মুখের কথা? তা আল্লাহর আরশ কাঁপানোর মতো কষ্টময়।

 

 

মোস্তফা কামাল-এর আরও লেখা পড়ুন :

 

# নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে নুরানি প্রার্থী

# সাম্প্রদায়িক সম্পত্তি, সুনামের সুনামি

# বাঁশময় জীবন-উন্নয়ন