Total Bangla Logo
For bangla আজ শুক্রবার 2:48 pm
28 July 2017    ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪    04 ذو القعدة 1438

রম্যরস

তেলবাদিকতায় হঠাৎ ব্যাকগেয়ারে প্রধানমন্ত্রী

মোস্তফা কামাল

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৬:২৫ পিএম, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৮:৩৮ পিএম, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬ বৃহস্পতিবার

মোস্তফা কামাল : নিউজ এডিটর, বাংলাভিশন

মোস্তফা কামাল : নিউজ এডিটর, বাংলাভিশন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটু দেরিতে হলেও সাংবাদিকদের ইজ্জত বাঁচানোর পদক্ষেপই নিয়েছেন। আগের মতো তেল দেওয়ার সুযোগ দেননি গত ৩ ডিসেম্বরের সংবাদ সম্মেলনটাতে। এতে আগের মতো প্রশ্ন করার ছুতায় তার বন্দনার শো-ডাউনটি হয়নি। সাংবাদিকদের বলেছেন শটকাটে সারতে। বিনাভূমিকায় সরাসরি প্রশ্ন করতে।

 

এর আগে, সংবাদ সম্মেলনগুলোতে প্রশ্নের আগে ভূমিকার নামে তেলে ভিজে যেতো চার কিনার। আগের জনকে তেলের নহরে হারিয়ে দিতেন পরের জন। প্রধানমন্ত্রী তা নিতে নারাজ ছিলেন না। যেই তেলে দেখা যেতো গ্যাসের ছটাও। তা দিয়ে আরেকটা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানানোর স্বপ্নও জেগেছে কারো কারো। টিভি লাইভে তা দেখে মানুষ সাংবাদিকদের নিয়েছে স্নেহ আইটেম তেলবাদিক হিসেবে। দলীয় তস্কররা পেয়েছে মনকষ্ট। ক্ষেপেছে সাংবাদিক নামের জীবদের ওপর। যে কাজটি করে তারা স্নেহে পিচ্ছিল হয় সেটি কেন অন্যরা করবে?-এ কষ্টে ভুগেছে দলের খাস তেলবাজরা।

 

৩ তারিখের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর একেবারে ইউটার্ন। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই জারি হয় তেল কম দেওয়ার সতর্কতা। তাতেও ফল না মেলায় শেষমেশ নির্দেশনা। এরপরও কোনো কোনো সাংবাদিক চেষ্টায় খ্যামা দেননি। কুলাতে না পেরে আমতা আমতা করে বসে পড়েছেন অতৃপ্তির শুকনা ঠোঁটে।  ভূমিকা ছাড়া কি প্রশ্ন করা যায়? এ প্রশ্নের তেলে পুড়ছেন তাদের কেউ কেউ।

 

আমাদের প্রধানমন্ত্রীরা তেল এবং তেলেসমাতি কম জানেন না। এরচেয়ে বড় কথা, এমন সংবাদ সম্মেলনে কোন তদবিরে-তকদিরে, কারা দাওয়াত পান, কী তাদের মতলব, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, ব্যস-ব্যসার্ধ তা প্রধানমন্ত্রীদের মুখস্ত। তাহলে এই শ্রেণিটার কাছ থেকে তেল নেবেন কেন?

 

প্রধানমন্ত্রীদের তেলের ক্রাইসিস হয় না। তেলামাথায় তেল ভুতেও জোগায়। মালিশ-পালিশে ঘাটতি পড়ে না ক্ষমতার শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত। অন্তত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তা ভালো করেই জানেন। সেই সহানুভূতি-মহানুভূতিতে তিনি সাংবাদিকদের মহিমাকে ফেলনা করার হাত থেকে রক্ষাই করেছেন। সেদিনের মতো প্রধানমন্ত্রী জাতির বিবেকদের আর তলানিতে নেননি। তলেননি নিজেও।

 

তেলে ভিজতে কে-না চায়? মতলব হাছিলে বিদ্যা-শিক্ষা, সততার বদলে বিকল্প হিসেবে তেলের অর্থটা পাল্টে গেছে। এ সত্যকে রস-সুধায় এক শও বেশি বছর আগে সাহিত্যমর্যাদা দিয়ে গেছেন হর প্রসাদ শাস্ত্রী। বিখ্যাত তৈল  রচনায় ওই সময়কার সমাজ ব্যবস্থার অধঃপতিত চিত্র তুলে ধরেছিলেন তিনি। তা উল্লেখের লোভ সামলাতে পারছি না।    

 

... যে সর্বশক্তিময় তৈল ব্যবহার করিতে জানে, সে সর্বশক্তিমান। তাহার কাছে জগতের সব কাজই সোজা, তাহার চাকরির জন্য ভাবিতে হয় না, উকিলিতে প্রসার করিবার জন্য সময় নষ্ট করিতে হয় না, বিনা কাজে বসিয়া থাকিতে হয় না, কোনো কাজেই শিক্ষানবিশ থাকিতে হয় না। যে তৈল দিতে পারিবে তাহার বিদ্যা না থাকিলেও সে প্রফেসর হইতে পারে, আহাম্মক হইলেও ম্যাজিস্ট্রেট হইতে পারে, সাহস না থাকিলেও সেনাপতি হইতে পারে এবং দুর্লভরাম হইয়াও উড়িষ্যার গভর্নর হইতে পারে।

 

ছোটবেলায় পড়া সেই রচনাটির আরও কয়েক লাইন একটু মনে আছে। যেমন...

 তৈল যে কী পদার্থ তাহা সংস্কৃত কবিরা কতক বুঝিয়াছিলেন, তাহাদের মতে তৈলের অপর নাম স্নেহ।  বাস্তবিক স্নে ও তৈল একই পদার্থ। আমি তোমায় স্নে করি, তুমি আমায় স্নে কর অর্থাৎ আমরা পরস্পরকে তৈল দিয়া থাকি। স্নে কী? যাহা স্নিগ্ধ বা ঠাণ্ডা করে তাহার নাম স্নেতৈলের ন্যায় ঠাণ্ডা করিতে আর কিসে পারে!

 

হর প্রসাদ শাস্ত্রীর জন্ম বৃটিশ ভারতে ১৮৫৩ সালে ভারতের চব্বিশপরগনার নৈহাটির অনন্য এক বিদ্যাজীবী পরিবারে। তার আসল নাম শরৎনাথ ভট্টাচার্য। শাস্ত্রী তার উপাধি। শৈশবে হর বা শিবের প্রসাদে জটিল অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠায় তার নাম বদলে রাখা হয় হরপ্রসাদপরবর্তীতে সংস্কৃত ভাষা-সাহিত্যে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে স্নাতকোত্তর অর্জন করায় পান শাস্ত্রী উপাধিটি। ১৯৩১ সালের ১৭ নভেম্বর লোকান্তরিত হওয়া শাস্ত্রী মহোদয় এখনো বেঁচে থাকলে আমাদের তেল মালিশ-পালিশবাজ, তস্কর, চাটুকার, মোসাহেবদের অপ্রতিরোধ্য কিলবিল দেখে কষ্ট পেতেন। বিস্মিত-হতভম্ব হতেন। অন্তত সাংবাদিকদের মর্দনকর্ম দেখে আরও কিছু লিখে তৈল রচনাটিকে আপ-ডেট করতেন। কারণ প্রবন্ধটায় তিনি এনেছিলেন উকিল, প্রফেসর, ম্যাজিস্ট্রেট, গভর্নর, সেনাপতিদের কথা। বাদ ছিলেন সাংবাদিকরা।

 

সেই বিবেচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি কাজের কাজ করেছেন। হয়তো তিনি ভেবেছেন, সাংবাদিকরা কেন বাঁকা-পথের মর্দনে মদন হবেন? আদাব-সালাম-কদমবুচির রেসে নামবেন? কেন হবেন কপট, ব্যক্তিত্বহীন, বেশরম?

 

এই বিবেকদের হাতে না জাতির কল্যাণে সত্যের ঝাণ্ডা তুলে ধরার মহান দায়িত্ব? জাতির বিবেক বুঝি দু:স্থ-অসুস্থ, অসহায়-অথর্ব্য হয়? কেন তারা মোসাহেবিতে আন্ধার গলিতে মনজিল মকসুদের দিকে গোছ ল্যাংটি দেবেন? টানবেন তেলের ঘানি?

 

জ্বী-হুজুরদের হুজরতি সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমন্ত্রিতও। বেশিরভাগ মানুষই অকপটে সত্য কথার চেয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে মিষ্টি কথায় মুগ্ধ হন। কোনো সেক্টর বা পেশাতেই বিনাতেলে অর্থ-বিত্ত, পদ-পদবি অসাধ্য। তেল-গ্যাসে রাবিশ-খবিসও কামিয়াবের মগঢালে।    

তেল মতোই চাটুকার- মুষিকরাই ডিজিটাল, হাইবৃড, আতি-পাতি বা সিকি-আধুলি।

 

সাংবাদিকরা কেন যাবেন সেই পালে? কেন হবেন মঙ্গা-নাঙ্গা-ভূখা? দলবাজির রঙে কেন হবেন দু:স্থ-অসুস্থ?  তা চুরি- ছিনতাইয়ের চেয়ে কম অন্যায়ের নয়।

 

হতে পারে অল্পতে বেশি লাভ বা শটকাটে বিশাল প্রাপ্তির লোভ সামলানো কঠিন। জায়গা মতো তৈলমর্দন  বহু সুবিধা এনে দেয়। রাজনীতি, সমাজ, সর্বত্র তাই তৈলমর্দন খুউব উপাদেয়।  এরপরওতো কথা থাকে। সাংবাদিকতা অন্যসব পেশার চেয়ে একটু আলাদা। তারাতো জাতির বিবেক, রাষ্ট্রের চার নম্বর খাম্বার স্থপতি। তেলঅলারা তেলের ড্রাম নিয়ে ঘুরুক। করুক তেলের লেনদেন, সওদাগরি। সাংবাদিকরাও কেন?  

 

মোস্তফা কামাল-এর রম্যরস কলাম-এর আরও কিছু লেখা পড়ুন :

# হুদাই কুদায় মাতা, কন্যা, বধূ, জায়া, ভগ্নীরা

# দিলহারা সুচি দয়াহীনা দেবী