Total Bangla Logo
For bangla আজ শুক্রবার 2:43 pm
28 July 2017    ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪    04 ذو القعدة 1438

জিয়া ফ্যামেলির কঠিন দুর্দিন, এজন্য মূল দায়ী কে বা কারা?

যাকুয়ান রিদা, সিনিয়র সাংবাদিক

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৩:১৪ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ রবিবার

খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান

খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান

চরম দুর্দিনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ফ্যামেলি। চারদিকে শুধুই অন্ধকার। একের পর এক ঝামেলা তাদের পিছু নিচ্ছে। অনেক দিন ধরেই এই দুর্দিন শুরু হলেও দিন যতই যাচ্ছে, ঝক্কি-ঝামেলাও ততই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। কোনো দিকেই আশার তেমন কোনো আলো নেই। তাদের এই দুর্দিন কাটছে না।


খালেদা জিয়ার বয়স এখন ৭১। বিধবা হয়েছেন ৩৬ বছর বয়সেই। অবুঝ দুই ছেলেকে নিয়ে পথচলা শুরু। এরপর নিয়তির ডাকেই রাজনীতিতে আসা। দলে স্বামীর শূন্যতা পূরণে নেতানেত্রীদের পীড়াপিড়িতেই আশির দশকের গেড়ার দিকে অনেকটা হঠাৎ করেই রাজনীতির মাঠে নামেন তিনি।


একদিকে অবুঝ দুই শিশু সন্তান নিয়ে ঘর-সংসার; অন্যদিকে স্বামীর হত্যাকারী জেনারেল এরশাদকে উৎখাতে মাঠের রাজনীতি। এরপরও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বেই মূলত ’৯০-এর পটপরিবর্তন ঘটে। দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হওয়ার পরও জিয়ার ইমেজ এবং তাঁর আপসহীন অসাধারণ নেতৃত্বে আকৃষ্ট হয়ে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়ে দেশের ক্ষমতায় বসায়। এরপর আরও দুইবার ক্ষমতায় বসেন বেগম জিয়া।


সেই সময়টা খালেদা জিয়ার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত’ ছিল।  এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়টি বেগম জিয়ার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সময়’ হয়ে থাকলে পরবর্তীতে শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে ‘খারাপ সময়’। এমন মন্তব্যই অনেক দক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকের।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি খালেদা জিয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্বাধীনভাবে চিন্তার মাধ্যমে পরিস্থিতির মূল্যায়ন, দ্রুত সমন্বয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে ব্যর্থ হন। এর অন্যতম উদাহরণ প্রধানমন্ত্রীর ফোনের বিষয়টি এবং নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠনে সাড়া দিতে ব্যর্থ হওয়া। এর শুরুটা হয় ২০০৮ এর নির্বাচনকে দিয়ে। ওই নির্বাচনের পরাজয়কে জনগণের রায় হিসেবে না মেনে তাকে তথাকথিত ‘১/১১ সরকারের’ মেকানিজম হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। এমনকি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকার চালানোর সময় তার ছেলে যে ভুল করেছেন, তা তিনি পর্যালোচনা করেননি।


এর আগে ১৯৮১ থেকে ২০১৫ এই ৩৫ বছরে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে জিয়া পরিবারকে। চড়াই-উৎরাই পাড় করতে হয়েছে তাকে। এরশাদের শাসনামলে ’৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় তাকে চরম জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হয়। এরপর ২০০৭ সালের ১/১১ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়। দুই ছেলেকেও পাঠানো হয় কারাগারে। ছেলেদের উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।


খালেদা জিয়া কখনো ক্ষমতায় থেকেছেন, আবার কখনো বিরোধী দলে থেকেছেন। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রীয় কোনো পদে নেই। নেই সংসদেও। এরপরও তিনি দেশের দ্বিতীয় বড় দল বিএনপির চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোটনেত্রী। দেশের মানুষের ‘ভোটের অধিকার’ আদায়ের দাবিতে তাঁর নেতৃত্বে চলছে ৮ বছর ধরে আন্দোলন। মূলত জনগণকে ঘিরেই তার সবকিছু। এরপরও বাস্তবে এখন তাঁর নিজের এবং ফ্যামেলির চরম দুর্দিন চলছে। ফলে সামনের দিনগুলো আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে তাঁর ফ্যামেলিতে।


সরকারবিরোধী আন্দালনের মধ্যেই ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো নির্বাসনে থাকাবস্থায় মারা যান। লাখো মানুষের শ্রদ্ধা-ভালবাসায় ২৭ জানুয়ারি লাশ দাফন করা হয়। বড় ছেলে তারেক রহমান সেই ২০০৮ সাল থেকেই স্বপরিবারে নির্বাসনে রয়েছেন।


২০০৯ সালের মে মাসে ৪০ বছরের স্বামীর স্মৃতি বিজরিত বাড়ি ছাড়া হয়ে উঠেছেন ভাড়া বাসায়। এখানেই শেষ নয়, খালেদা জিয়া, তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে অর্ধশতাধিক মামলা। কোকোর মৃত্যুর পর তার নাবালিকা দুই কন্যাকেও মামলার আসামি করা হয়েছে।



বিশেষ করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুই মামলায় (জিয়া অরফানেজ এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট) খালেদা জিয়ার (জেলে যাওয়ার মতো) সাজা হতে পারে এমন ধারণা এখন সবার মুখে মুখে। সরকার দলীয় শীর্ষ নেতানেত্রী এবং বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মুখেও উচ্চারিত হচ্ছে খালেদার জেলে যাওয়ার বিষয়টি। এ নিয়েও শুরু হয়েছে নানা অপ্রকাশ্য গুঞ্জন। এমন কী কয়েকদিনের মধ্যেই খালেদা জিয়া কারাগারে যেতে পারেন-এমন গুঞ্জন রাজনৈতিক পাড়ায় বেশ আলোচিত হচ্ছে।


বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বেগম জিয়ার কারাগারে যাওয়ার মতো কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। বেগম জিয়া কারাগারে গেলে এ দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আদালতে প্রমাণ হলে খালেদাকে শাস্তি পেতেই হবে। আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করছেন, বেগম জিয়াকে সাজা দেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই আওয়ামী লীগের। আদালতে সাজা হলে তাদের কিছুই করার থাকবে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বেগম জিয়াকে সরকারের শাস্তি দেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। এটি আদালতের বিষয়। এখানে আমাদের কিছু বলার নেই। আবার কেউ কেউ ইনডিয়ার তামিলনাডুর শশীকলার উদাহারণ টেনে বলছেন, শশীকলার জন্য যেমন তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রীর পথ থেমে থাকেনি, খালেদা জিয়ার জন্যেও প্রধানমন্ত্রীর পথ পড়ে থাকবে না। তিনি আরও বলেছেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছেন না সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। তাদের মতে, এমন অঘটন ঘটলে দেশের রাজনীতির পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে। নতুন করে সহিংস হয়ে উঠতে পারে দেশের রাজনীতি।


সবমিলেই হিসাব-নিকাশের সময় এসেছে। স্বামীর ৪০ বছরের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি ছাড়া হয়ে, পুত্র হারানোর শোক এবং কঠিন দুর্দিনে ম্যাডাম জিয়ার চোখের পানিও যাদের আন্দোলনের মাঠে নামাতে পারেনি। দলের যারা অতীতে অনেক আখের গুছিয়েছেন আন্দোলনের সময় তাদের ভূমিকা কী ছিল? মন্ত্রী-এমপি হওয়ার জন্য নিত্যদিন যারা ছক আঁকেন এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ আকড়ে রয়েছেন বছরের পর বছর; তারা আন্দোলনের সময় কোথায় ছিলেন, তারা কী করেছেন। সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে।


ফলে দল এবং দেশের স্বার্থেই ম্যাডামকে এখন বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুতে হবে। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আগামী দিনে ম্যাডাম কোন পথে হাটেঁন সেটাই এখন দেখার বিষয়। সামনের পথ যে একেবারেই মসৃণ হবে, সেটি বলার বা ভাবার সুযোগ নেই।

 

বিএনপিপন্থী খাঁটি বুদ্ধিজীবী এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, জিয়া ফ্যামিলির বর্তমান এই দুঃসময়ের জন্য প্রথমত দায়ী জামায়াতে ইসলামী। দ্বিতীয়ত দায়ী খালেদা জিয়া নিজে। তৃতীয়ত দায়ী তারেক রহমান হলেও সেক্ষেত্রেও তারেককে নেপথ্যে থেকে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে জামায়াতে ইসলামী। চার দলীয় জোট গঠন করে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ক্ষমতায় গিয়েই বিএনপিকে গ্রাস করতে বহুমুখী পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র করে। এরই অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট পদে বি চৌধুরীকে সরিয়ে ইয়াজউদ্দিনকে প্রেসিডেন্ট করা হয়। এরপর থেকে একের পর এক যত সিদ্ধান্ত খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান নিয়েছেন এবং বাস্তবায়ন করেছেন, তার বেশির ভাগেই পেছনে থেকে বিভিন্নভাবে করিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে খালেদা জিয়া জামায়াতি ষড়যন্ত্রে এতটাই কাবু হয়ে আছেন যে, তাঁকে জামায়াতের বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত কোনো কথা বলতে চাইলেও তাঁর কাছে বলা সম্ভব হয় না, অথবা কেউ বলে ফেললেও পরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়। খালেদা জিয়ার জামায়াতপ্রীতিটা জামায়াতনির্ভরতায় পরিণত হওয়া এবং এখনো জামায়াতি ষড়যন্ত্রের জাল সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাসহীতার কারণেই মূলত দিনে দিনে খালেদা জিয়া তথা জিয়া ফ্যামেলির এই দুর্দিন বাড়ছে।

 

 

আরও পড়ুন :

 

# কারাগার নয়, যেন বিনোদন কেন্দ্রই