আজ শনিবার 5:04 pm08 August 2020    ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭    18 ذو الحجة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

‘জঙ্গিবাদ’ নিপাত যাচ্ছে না কেন?

মাসুদ মজুমদার

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০৯:২৬ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ বুধবার

মাসুদ মজুমদার

মাসুদ মজুমদার

‘অপহরণ’ শব্দটিও কম পরিচিত ছিল। কারণ, আমরা জাতিগতভাবে এর সাথে ব্যাপকভাবে পরিচিত নই। বিগত ক’বছরে গুম হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বাংলাদেশে। গুম প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এবং ভিন্নমতের মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার কৌশল হতে পারে, তাও আগে ভাবা হতো না। গুম ও অপহরণের সাথে মানুষ ব্যাপকভাবে পরিচিত হলো ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিনসহ বিরোধী দলের অসংখ্য নেতাকর্মী হঠাৎ করে দৃশ্যপট থেকে ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার পর। গুম কিংবা নিখোঁজ হওয়ার পর এখন লাশ মিলে খালে-বিলে-ডোবায়-বনে-জঙ্গলে। অপহরণ করে নিয়ে ‘ক্রসফায়ারে’ও দেয়া হয়। এখন সাদা পোশাকে যখন তখন তুলে নেয়া হচ্ছে। পুলিশ জানিয়ে দেয়, তারা কিছু জানে না। গোয়েন্দারা মুখ খোলে না। তারপর পুলিশ গল্প বানায়। মানুষ কষ্টে হাসে, কিন্তু ব্যথিত হয়। এ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে বিএনপিসহ বিরোধী দলের কত নেতাকর্মী গুম কিংবা অপহৃত হয়ে লাশ হয়ে ঘরে ফিরছেন, তার হিসাব করা কঠিন। সরকার এ ক্ষেত্রে আশ্চর্য ধরনের নীরবতা পালন করে চলেছে। রাষ্ট্র দায় নেয় না। বিচার বিভাগ স্বতঃপ্রণোদিত হওয়ার জন্য উৎসাহ দেখায় না। অথচ রাষ্ট্রের নাগরিক গুম বা অপহৃত হলে তাকে খুঁজে বের করে স্বজনদের কাছে ফেরত দেয়া নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। এই কর্তব্য এখন রাষ্ট্রের পক্ষে আর সরকার পালন করছে না। সকল প্রকার সন্ত্রাসের সাথে জড়িত ব্যক্তিই সন্ত্রাসী। এখন আবার সন্ত্রাসীর নাম নব্য জেএমবি, রূপ পাল্টানো আইএস, আরো কত কী। সব ভাষায় শব্দের রূপান্তর হয়। শব্দের অপভ্রংশও স্বীকৃত। কিন্তু ভুল শব্দ প্রয়োগ করে সংজ্ঞা পাল্টে ফেলার নজির যেন আমরাই সৃষ্টি করছি। বিলম্বে হলেও গুম-অপহরণ নিয়ে জাতিসঙ্ঘ মুখ খুলেছে, তবে শব্দের অপব্যবহার নিয়ে তারা এখনো প্রতিক্রিয়াহীন।


গুম, অপহরণ ও নিখোঁজ-বিষয়ক জাতিসঙ্ঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ সবাইকে সতর্ক করে দিচ্ছে। তাদের পর্যবেক্ষণ হলো, বিশ্বব্যাপী এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সেস বা গুম ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি এটা বর্তমানে একটি অত্যন্ত আতঙ্কজনক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিচ্ছেন। অথচ এর জন্য যারা দায়বদ্ধ, তারা এমনই ভুয়া ও কল্পনাপ্রসূত ‘যুক্তি’ দিচ্ছেন, যা যুক্তির ধোপে টেকে না। তারা বোঝাতে চাচ্ছেন, এ ধরনের গুম ও অপহরণের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ দমন করা যাবে। বাস্তবে এর মাধ্যমে চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদকে শুধু ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে- না, রাষ্ট্রকে একটি অনিবার্য সঙ্ঘাতের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সব দায়িত্বশীল ও নীতিনিষ্ঠ মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে- জুলুম-নির্যাতন, অত্যাচার, অবিচার ও গণতন্ত্রহীনতার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সন্ত্রাসের জন্ম দেয়। বিখ্যাত কলামিস্ট রবার্ট ফিস্ক সবাইকে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন- ‘আমরা জিজ্ঞেস করতে পারতাম, মানবতার বিরুদ্ধে কারা এ অপরাধ করছে বা কিভাবে এ হামলা হয়েছে। কিন্তু কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, কেন এই হামলা হয়েছে, তাহলে তাকে সন্ত্রাস পছন্দকারী বা সন্ত্রাসীদের বন্ধু হিসেবে আখ্যা দেয়া হতো।’ যদিও ফিস্কের বক্তব্য ছিল ৯/১১-এর ১৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে, কিন্তু এ বক্তব্য এখনো প্রাসঙ্গিক।

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল ২০১৫ সালেই ৩৭টি রাষ্ট্র থেকে ৭৬৬টি নতুন করে গুম হওয়ার তথ্য রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮৩টি ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। সংস্থাটির গত বছরের বার্ষিক রিপোর্টে গুমের যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল, তা থেকে এ সময়ের পরিসংখ্যান তিন গুণেরও বেশি। এর অর্থ হলো, প্রতিদিন একটির বেশি গুমের ঘটনা ঘটছে। এটা হলো জাতিসঙ্ঘের ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রাপ্ত পরিসংখ্যান। তারাই ধারণা করছেন, প্রকৃত গুমের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ণয় করা কঠিন কাজ নয়। বিশেষত ৫ জানুয়ারির কথিত নির্বাচনের পর বাংলাদেশ যে গুম-অপহরণের রাজ্যে পরিণত হয়েছে, তা তো অস্বীকার করা যাবে না।
বিশেষজ্ঞরা যে বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেটা হলো, কথিত ‘সংক্ষিপ্ত মেয়াদে’ নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তিকে আকস্মিকভাবে উধাও করে ফেলা হচ্ছে, আবার কিছু সময় পরে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে, সাময়িকভাবে নিখোঁজ থাকাকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইনের আশ্রয় লাভ করা থেকে বঞ্চিত থাকছেন। স্বজন-প্রিয়জনেরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যাচ্ছেন। অভিভাবকেরা থাকছেন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, এই যে কিছু ব্যক্তিকে তুলে নেয়া হচ্ছে এবং কিছু সময় পরে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে; সেটা কিন্তু কম উদ্বেগজনক বিষয় নয়। এসব ঘটনাও গুমের মতোই মারাত্মক এবং ফলাফল হচ্ছে নেতিবাচক। একই সাথে, অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে। জনমনে একধরনের মানসিক দুশ্চিন্তা প্রতিনিয়ত তাড়া করছে যার অবসান হওয়া উচিত। তারা আরো বলেছেন, আমরা দৃঢ়তার সাথে পুনর্ব্যক্ত করছি, গুম করার প্রশ্নে সময়ের সংক্ষিপ্ততা কোনো অজুহাত হতে পারে না। গুম করে রাখার সময় যত অল্পই হোক, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইন এবং সরকারের অবস্থান দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুঃখজনক। সরকার একতরফা রাজনীতি দিয়ে বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। মানুষ বোবা হয়ে থাকলেও ভেতরের রক্তক্ষরণ থামছে না।

বিগত দুই বছরে দেশে গুম-অপহরণ বৃদ্ধি পেল কেন? এর সহজ উত্তর- সরকার কর্তৃত্ববাদী অবস্থানকে সংহত করতে চাচ্ছে। প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতের ব্যাপারে আরো কঠোর হয়েছে। পুলিশি ব্যবস্থা এমন করা হয়েছে, কেউ যেন কোথাও নিজেকে নিরাপত্তার ভেতর দেখার সুযোগ না পায়। সবার মনে সংশয়- এই না আক্রান্ত হচ্ছি। তা যে নামেই হোক।

এখন অনেকেই বলছেন, সন্ত্রাস ও চরমপন্থা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ, জবরদস্তিমূলক শাসন এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতি। এটা ঠিক, গণতন্ত্র না থাকলে মত প্রকাশের দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে যায়। তখন যে গুমোট পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তার সুযোগ নেয় পেশাদার সন্ত্রাসীরা। বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দল বেড়ে যাওয়ার কারণও নিরাজনীতিকরণের ফসল। এতে কর্মীরা আধিপত্য বিস্তারের মারণ খেলায় মেতে উঠেছে। এখানে সেখানে সরকারি দলের কর্মীদের লাশ পড়ার কারণও গণতন্ত্রশূন্যতার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া। কারণ, রাজপথে বিরোধী দল নেই। নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করেই তারা খবরের উপাদান হচ্ছে। রাজধানীর মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে স্থানীয় যুবলীগ নেতার মৃত্যু তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। মিলকি থেকে বাবু হত্যা- সবটাই সরকারি নীতির অনিবার্য ফসল ও পরিণতি।

এখন প্রশ্ন, জঙ্গিবাদের নিপাত চাইলেও তা হচ্ছে না কেন? প্রথমত আমরা সবাই সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদী ধারণা ও এর শব্দগত অর্থের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি। আমরা যদি একটি মাত্র সংজ্ঞা নিরূপণ করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতাম, তাহলে আসল সন্ত্রাসীরা চিহ্নিত হয়ে যেত, তারা নিপাত হতো। এখন সুস্পষ্ট সন্ত্রাসকে আড়াল করে আমরা ‘জঙ্গি’র বিরুদ্ধে দৌড়াচ্ছি। আর এখানে সেখানে ‘জিহাদি’ বই খুঁজছি। হিজাবধারী মহিলাকে বানাচ্ছি নব্য জেএমবির সদস্যা। শিশু-কিশোর রিমান্ডে নিয়ে তাকে পরিয়ে দিচ্ছি জঙ্গিবাদের আলখেল্লা। তার অপরাধ, বাবা বিনা প্রমাণে জঙ্গি। সে তার সন্তান, অতএব জঙ্গির বাচ্চা জঙ্গিই তো হবে। এভাবে সরলীকরণের কারণেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখোমুখি দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে প্রকৃত সন্ত্রাসীরা। কওমি মাদরাসাকে জঙ্গি প্রজননকেন্দ্র বানিয়ে যে পাপ সরকার করেছে, তার খেসারত দিচ্ছে মানসম্পন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও।

উচ্চশিক্ষিত ও ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়ারা যখন দস্যু বনহুর, বাহরাম, কিরিটি রায় ও রবিন হুড সেজে যাচ্ছে; তখন শয়তানও মুখব্যাদান করে অট্টহাসি দিয়ে সরকার ও ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের বিদ্রুপ করছে।

masud2151@gmail.com