Total Bangla Logo
For bangla আজ শুক্রবার 2:40 pm
28 July 2017    ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪    04 ذو القعدة 1438

চীনে ইসলাম ও মুসলমানদের কী অবস্থা

সাদেকা হাসান

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৩:১১ পিএম, ১৪ অক্টোবর ২০১৬ শুক্রবার | আপডেট: ০৭:৩৮ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০১৬ রবিবার

চীনে ইসলাম ও মুসলমানদের কী অবস্থা

চীনে ইসলাম ও মুসলমানদের কী অবস্থা

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এখন ঢাকায়। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ আরো অনেকের সঙ্গেই তাঁর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এসব বৈঠকে চীনা মুসলমানদের প্রসঙ্গে কেউ কি কিছু বলবেন শি জিনপিংকে? জবাব জানা নেই।

আমরা আলজাজিরাবাংলা ডটকমের পাঠকদের চীনে ইসলাম ও মুসলমানদের হাল-হকিকত জানাচ্ছি।

চীনে ইসলামের আবির্ভাব হয় হিজরি প্রথম শতকে। ধারণা করা হয়, সাহাবায়ে কেরামের যুগেই চিনে ইসলাম পৌঁছে। চীনে কয়েকজন সাহাবির (রা.) মাজার রয়েছে বলেও জানা যায়।

তং রাজবংশের শাসনামলে সিল্ক রোড ও সমুদ্রপথে আরব ও ইরানি মুসলমানরা গিয়ে প্রথমে এ দেশে ইসলাম প্রচার করে। তখন থেকেই চীনের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছেন মুসলমানরা। মুসলমানরাই চীনে জ্যোতির্বিদ্যা প্রথমবারের মতো নিয়ে আসে এবং এ শাস্ত্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখনও মুসলমানরা চীনের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেছেন। ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা সত্ত্বেও চীনে, বিশেষ করে দেশটির বৃহত্তম হান গোত্রের মধ্যে ইসলামে দীক্ষিতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

গণচীন আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এবং জনসংখ্যার দিক থেকে বৃহত্তম দেশ। সবচেয়ে জনসংখ্যা বহুল এ দেশটিতে বাস করেন আট কোটি মুসলমান। চীনের যেসব এলাকায় উন্নতির ছোঁয়া এখনও তেমনটা লাগেনি, সেখানেই বেশির ভাগ মুসলমানের বসবাস। ধনী রাষ্ট্র চীনের মুসলমানরা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র। চীনের ৫৬টি সম্প্রদায়ের মধ্যে ১২টি গোত্র মুসলমান।

চীনের মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে বহির্বিশ্বে খুব কম তথ্যই প্রচারিত হয়। এ থেকেই বোঝা যায়, কমিউনিস্ট সরকার দেশটির মুসলমানদের ওপর কত কঠিন অবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ধর্মীয় বা আদর্শিক মতপার্থক্য নয়, বরং মূলত চীনা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, বৈষম্য ও অবিচারের ফলেই চীন সরকারের সঙ্গে মুসলমানদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে এবং এসবের বিরুদ্ধে চীনা মুসলমানরা বারবার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।

২০০৯ সালের জুলাই মাসে চীনের সিংকিয়াং প্রদেশে যে সহিংসতা হয়েছিল, তাকে বাহ্যিক দিক থেকে বর্ণবাদী হানদের সঙ্গে উইঘর মুসলমানদের জাতিগত সংঘাত বলে মনে করা হয়। মূলত চীন সরকারের ইসলাম-বিদ্বেষী নীতির মধ্যেই ওই সহিংসতার শেকড় বিস্তৃত হয়েছিল। উইঘুর মুসলমানরাও বেইজিংয়ের ব্যাপক বৈষম্যের শিকার। সেখানে ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৬ সালে সিংকিয়াং-এর ৯৩৮টি মাদরাসা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত কয়েক বছরে মুসলিম অধ্যুষিত সিংকিয়াং প্রদেশে জ্বালানি তেল উৎপাদন দুই গুণ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও সেখানকার মুসলমানরা এই আয় থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

বেইজিংয়ের বিশেষ কিছু নীতির কারণে এ অঞ্চলে হানরা অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব ক্রমেই বিস্তার করে চলেছে এবং উইঘুররা ক্রমেই দরিদ্র হয়ে পড়ছে। এ ধরনের শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চীনে মুসলমানদের ধর্মের প্রতি আন্তরিকতা অনেক বেশি। প্রতি বছর চীন থেকে অনেক লোক হজে যান। দীনের দাওয়াত নিয়ে যারা চীনে যান, তাদের সহযোগিতায়ও যথেষ্ট আন্তরিকতার প্রমাণ দেন চীনা মুসলমানরা।

চীনা মুসলমান ও তাদের স্বপ্নের ভবিষ্যৎ

মক্কা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে চীনের এই অঞ্চলটিতে ক্রমে আরো বেশি সংখ্যায় মুসলমানরা এগিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের ধর্মানুশীলনের দিকে। বাণিজ্য বৃদ্ধি ও তেল প্রাপ্তির প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের সুনজরে থাকার গরজে এ অঞ্চলে ইসলামের ওপর বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করেছে চীনা সরকার।

প্রতিদিন মসজিদে যান হাই নামাজ আদায় করার জন্য। চীনের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় নিংজিয়ায় বড়ো হয়ে ওঠেন হাই। চীনের ৮ কোটি মুসলমানের অধিকাংশের বসবাস এই অঞ্চলে। সিরিয়া অথবা ইয়েমেনের তুলনায় সংখ্যায় এরা বেশি। পুরো নাম জানাতে নারাজ হাই বলেন, সবাই না করলেও আমার পরিবারে ধর্মচর্চা ছিল। ইদানীং ধর্মানুরাগীর সংখ্যা বাড়ছে। ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

চারপাশে বিক্রয়পণ্য ছড়িয়ে বসেছেন হাই। রয়েছে টুপি, ওড়না, শুকনো আঙুর ও কারুকার্যময় হাত-ব্যাগ। হাই বললেন, তাঁর গ্রাহকদের অধিকাংশ হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত পর্যটকরা। পর্যটক, ব্যবসায়ী ও প্রত্যাবাসীসহ মুসলিম ভ্রমণার্থীর চীনে আগমন বেড়ে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে চীনের হুইদের মধ্যে ধর্মপালনের প্রবণতা। মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া থেকে তাদের পূর্বপুরুষরা চীনে এসেছিলেন বলে দাবি করেন চীনে হুই মুসলিমরা।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থায় একজন গবেষক ও চীনা মুসলিম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিকোলাস বিকুইলিন বলেন, চীনা মুসলমানদের ধর্মানুশীলনে মধ্যপ্রাচ্যের গভীর প্রভাব দেখা যায়। নিকোলাস বলেন, চীনের মসজিদগুলোয় লোকজনের সঙ্গে আলাপকালে ঐ প্রভাব স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে এতোদিন তাদের যোগাযোগ ছিল না। বর্তমানে সে অবস্থা নেই। চীনের কমিউনিস্ট শাসকেরা সংঘবদ্ধ ধর্মচর্চা নিয়ন্ত্রিত দেখতে চান। তাদের শাসনের জন্য বড় হুমকি মনে করেন ধর্মচর্চাকে। চীনের সরকার হচ্ছে নিরীশ্বরবাদী।

১৯৫১ সালে ভ্যাটিকানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চীন। ফলে বিভক্ত হয়ে যায় চীনের ক্যাথলিক সম্প্রদায়। আত্মগোপনকারী একটি অংশ ভ্যাটিকানের অনুগত থেকে যায় এবং অন্য অংশটি রাষ্ট্রের অনুমোদন সাপেক্ষে ধর্ম-কর্ম চালিয়ে যেতে থাকে।

চীনের দ্রুত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতির ইন্ধন উপাদান হিসেবে খৃস্টধর্ম কোনো অবদান রাখছে না। অন্যদিকে হুই মুসলমানদের সঙ্গে সু-সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে জড়িত রয়েছে চীনের আন্তর্জাতিক কূটনীতির গরজ। বিকুইলিন বললেন, চীনা মুসলমানদের প্রতি কর্তৃপক্ষের নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে কাজ করছে জ্বালানিজড়িত কূটনীতির তাড়না। নমনীয়তার প্রতিফলন শুধু হুই মুসলিমদের ক্ষেত্রে, অন্যত্র নয়।

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াংয়ের বাসিন্দা বৃহত্তর স্বায়ত্ত্বশাসনকামী উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীনা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। কঠোরতর বিধিনিষেধ আরোপিত রয়েছে তাদের গতিবিধির ওপর। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উন্মত্ততায় নিংজিয়ার হুই মুসলিম অধ্যুষিত টংজিন এলাকায় সব মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে অস্বাভাবিক দ্রুততায় মসজিদগুলো পুননির্মাণ করা হয়। ৩ লাখ লোকের শহরটিতে একটি ইসলামি বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনায় রত ধর্মীয় নেত্রী এক মহিলা বুঝে উঠতে পারেননি মসজিদ মেরামতের টাকা এলো কোত্থেকে। হাজার দশেক চীনা মুসলমান হজ্ব পালন করতে প্রতি বছর মক্কায় যান। টংজিনয়ের মিনার ও গম্বুজ শোভিত নতুন মসজিদগুলোর দিকে তাকালে মধ্যপ্রাচ্যেই রয়েছেন বলে বিভ্রান্ত হবেন অনেকে।
ধর্মীয় নেত্রী বলতে লাগলেন, তার স্কুলে ৬৮ জন ছাত্রী রয়েছে। সর্বকনিষ্ঠজনের বয়স ১৫ বছর। সরকারি বিধানমতে ১৮ বছরের নিম্নবয়সীকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া যাবে না। এখানে তা হচ্ছে।

ভদ্রমহিলা বললেন, ১৯৮৬ সালে আমি যখন হাইস্কুল পাস করে বেরোই, তখন অবস্থা ছিল বড় কঠিন। সরকারের বর্তমান ধর্মীয় নীতি অনেকখানি শিথিল। বর্তমানে ভয়ভীতি ছাড়াই আমরা ধর্ম পালন করতে পারি। চলতি বছর হজ পালন করতে মক্কায় যান ৯ হাজার ৬শ`র মতো মুসলিম। আরো অনেকে যাবেন নিজেদের ব্যবস্থায়, তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে।

চীনের ধর্মবিষয়ক ব্যুরো কী পরিমাণ লোক হজে যাচ্ছেন, তাদের টাকার ব্যবস্থা হচ্ছে কোত্থেকে, ছাত্রবিনিময় কীভাবে হয়- এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে আগ্রহবোধ করে না। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, হুই মুসলমানদের রাজনৈতিক আনুকূল্য আদায়ের প্রয়োজনে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিস্তৃতি ঘটানোর মধ্য দিয়ে সরকার তাদের ক্ষেত্রে এক ধরনের অঘোষিত আপসনীতি অনুসরণ করছে।

ক্যালিফোরনিয়া পমোনা কলেজের একজন বিশেষজ্ঞ ড্রু গ্ল্যাডনি বলেন, চীনা মুসলমানরা সরকারের এই সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল। মুসলমানের বসবাস রয়েছে চীনের প্রায় সর্বত্র। দক্ষিণে রয়েছে মুসলমানের ছোট ছোট গুচ্ছ বসতি। উত্তর-পূর্বে মুসলমানের সংখ্যা বেশি। লাখো মুসলমানের দেখা মেলে উত্তরের চীনা সমতলভূমিতে। মুসলমানদের সবচেয়ে ঘনবসতি হচ্ছে বেইজিং ও তিয়ানজিনে। তা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক অমুসলিমের তুলনায় মুসলিমরা চীনে রয়ে গেছেন ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু হিসেবে।

তুর্কিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশের অধিকাংশ বাসিন্দা ছিলেন মুসলিম। তাদের ভাষাও চীনা নয়। ৪০ বছর হলো, লাখ লাখ চীনা অমুসলিমকে অন্য অঞ্চল থেকে এনে সেখানে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।

তৃতীয় খলিফা উসমান বিন আফফানের (রা) শাসনকালে চীনে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। বাইজানটাইন ও ইরানীদের পরাস্ত করার পর খলিফা উসমান ৬৫০ খৃস্টাব্দে চীনা সম্রাটকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়ে সেখানে একটি প্রতিনিধিদল পাঠান। নবী করিম (সা.)-য়ের মাতৃপক্ষীয় চাচা সা`দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা,) প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। এর আগে নবী করিম (সা,)-য়ের জামানাতেই চীনে ইসলামের বার্তা বহন করে নিয়ে যান আরব বণিকেরা। আরব ইতিহাসে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের (রা.) চীন-যাত্রার বিস্তারিত উল্লেখ না পাওয়া গেলেও চীনের প্রাচীন তাং বংশীয় নথিপত্রে সংক্ষিপ্ত একটি বিবরণ লিপিবদ্ধ পাওয়া যায়।

চীনা মুসলমানরা মনে করেন, চীনে ইসলামের আবির্ভাবের শুরু হয়েছিল সা`দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের (রা.) ঐ সফরের মধ্য দিয়ে। ইসলামের প্রতি অনুরাগের নিদর্শনস্বরূপ সম্রাট ইউং ওয়েই চীনে মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন। যা ছিল চীনে প্রতিষ্ঠিত প্রথম মসজিদ। ১৪শ` বছর পার হয়ে যাবার পরও ক্যান্টন শহরের ঐ সমৃদ্ধ মসজিদ স্মারক মসজিদ হিসেবে আরো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।-ইসলাম অনলাইন