আজ রবিবার 5:17 pm09 August 2020    ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭    19 ذو الحجة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

চাকা শিল্পীদের একাল-সেকাল

অারাফাতুজ্জামান

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০৯:৩৭ পিএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ মঙ্গলবার | আপডেট: ০২:০৭ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০১৬ রবিবার

চাকা শিল্পীদের একাল-সেকাল

চাকা শিল্পীদের একাল-সেকাল

বাংলা সাহিত্যে নয় শুধু ভারতবর্ষীয় পুথিতে-সাহিত্যে সর্বত্র চাকা এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। সম্রাট অশোকের সিলমোহড় থেকে শুরু করে হাল আমদের অনেক নকশাতেও আমরা চাকার ব্যবহার দেখতে পাই। সভ্যতার উৎকর্ষতার এক অবিস্মরণীয় আবিষ্কার হলো চাকা।

যন্ত্রযান আসার আগের কথা। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় লাল শাড়িতে ঘেরা গরুর গাড়ি অথবা ঘোড়ার গাড়িই ছিল তখনকার দিনে যাতায়াতের একমাত্র বাহন। তবে এখন আর চিড়া-মুড়ি, গুড় বোঝায় করা গ্রামের নব-বধূদের নাইওরে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে না। কালের বিবর্তনে গরু, মহিষচালিত বাংলার ঐতিহ্যবাহী গাড়িগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু তার অস্তিত্ব যে একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি তার প্রমাণ মেলে ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায়।

গাড়িগুলোর অন্যতম উপকরণ হলো কাঠের তৈরি চাকা। সেই চাকা কারিগররা বর্তমানে তেমন একটা ভালো নেই। ব্যবসা আগের মতো না থাকলেও বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে আছেন গুটি কয়েক কারিগর। গাড়াগঞ্জে দেশের সর্বাধিক চাকা তৈরি হয়। এ চাকা যায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে দিন-রাত পরিশ্রম করে চলেছেন তারা। কিন্তু একদিকে সরকারি সুযোগ সুবিধার অভাব অন্যদিকে কাঠের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভালো নেই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সদর উপজেলার আমতলী বাজার, হাটখোলা মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলার বেশ কয়েকটি স্থানে, শৈলকূপার ভাটই বাজার, গাড়াগঞ্জ বাজার, খুলুমবাড়ি, কুমিড়াদহ ও আবাইপুর বাজারে গড়ে উঠেছে একাধিক চাকা তৈরির কারখানা। তবে দেশের বৃহত্তর চাকা উৎপাদনকারী এলাকা হিসাবে পরিচিত গাড়াগঞ্জ বাজার এলাকা। বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও গৃহস্থরা গরুর গাড়ির চাকার জন্য ছুটে আসেন এসব অঞ্চলে।

সরেজমিনে গাড়াগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়কের দুধারে সামান্য জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে ৮টি চাকা তৈরির কারখানা। কারিগরসহ প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি কর্মরত রয়েছেন এখানে। বংশানুক্রমে ব্রিটিশ আমল থেকেই এ পেশা আঁকড়ে পড়ে রয়েছেন তারা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব কারিগররা শৈলকূপার গাড়াগঞ্জ এলাকাসহ ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় এসে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে চাকা উৎপাদনের বৃহত্তর এলাকা হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে ঝিনাইদহ।
গাড়াগঞ্জ বাজারের চাকা তৈরির কারিগর আনছার আলী (৭০) জানান, ‘তার বাপ দাদারাও চাকা তৈরির পেশায় ছিলেন। বাবার কাছেই এ পেশার হাতে খড়ি তার। বাবার সঙ্গে বাড়িতেই চাকা তৈরি করতেন। কিন্তু সেখানে এর চাহিদা কম থাকায় কাজের খোঁজে প্রায় ২০ বছর আগে গাড়াগঞ্জ এলাকায় আসেন তিনি। একটি চাকাতে এক হাজার টাকা থেকে সাড়ে ১২শ টাকার কাঠ লাগে। আর এতে শ্রমিকের মজুরি ৩শ টাকা। বিক্রি করা হয় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। কোনো যান্ত্রিক যন্ত্রপাতি নয়, শুধু হাতুড়, বাটাল, করাতের মাধ্যমে তৈরি করা হয় দৃষ্টিনন্দন এ চাকা। একজন কারিগর একদিনে একটি চাকা তৈরি করতে পারে।’

কারিগর ফিরোজ হোসেন জানান, ‘বাবলা গাছের কাঠই এ চাকা তৈরির একমাত্র উপাদান। চাকার মাঝের গোল অংশ (বেলন), ভেতরের লম্বা লম্বা কাঠ (প্যাকো) ও চওড়া কাঠের বৃত্ত (কৈঠা) বলা হয়।’

চাকার মহাজন গোলাম রব্বানী জানান, ‘মাগুরা, আরপাড়া, বারইচরা, পাবনা, পাংশা, রাজবাড়ি, কুষ্টিয়া, ভেরামারা, যশোর, নড়াইলসহ ঢাকার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়িরা ঝিনাইদহের বিভিন্ন চাকা উৎপাদনকারী কারখানা থেকে ট্রাক ভর্তি করে চাকা নিয়ে যান। অগ্রহায়ন, চৈত্র ও ভাদ্র এই তিন মাস চাকা বিক্রির মৌসুম। ৫ থেকে ৭ বছর আগে বছরে ১৬শ জোড়া চাকা বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১শ জোড়ায় নেমে এসেছে।’

চাকা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগর ও মহাজনরা জানান, চাকা তৈরির বাবলা গাছ আগে সহজেই পাওয়া যেত। এখন বাবলা গাছ পাওয়া দুষ্কর। স্থানীয়ভাবে এ কাঠ আর মিলছে না। বর্তমানে পটুয়াখালি থেকে কাঠ এনে কাজ করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেশি পড়ে। অনেক সময় পুঁজির অভাবে বেশি মুল্যে বাকিতে গাছ কিনতে হয়।

সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতাসহ ব্যাংক ঋণের সুবিধা পেলে কৃষিকাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এ চাকা শিল্প তথা ঐতিহ্যবাহী গরু মহিষের গাড়ি টিকে থাকবে। সেই সঙ্গে ভাগ্যের চাকাও ঘুরবে এ শিল্পের কারিগরদের।