আজ শনিবার 5:11 pm08 August 2020    ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭    18 ذو الحجة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

চ্যালেঞ্জে খালেদা

কমিটি নিয়ে বিএনপিতে অসন্তোষ

যাকুয়ান রিদা

আলজাজিরাবাংলা.কম

প্রকাশিত : ০৭:৩৯ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ শনিবার

কমিটি নিয়ে বিএনপিতে অসন্তোষ

কমিটি নিয়ে বিএনপিতে অসন্তোষ

*%


পদে থাকা অখুশি নেতা এবং পদবঞ্চিত নেতারা নানাভাবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপর চাপ সৃষ্টি করছেন। ইতোমধ্যে অনেকেই তার সাথে সাক্ষাৎ করে নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেও আমলে নেননি তিনি। উপরন্তু বিরক্ত হয়েছেন। বিএনপির একাধিক নেতার সাথে আলাপকালে এমনটাই জানা গেছে।

নেতারা বলছেন, দুই ভুলের কারণে এখন নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তা হচ্ছে- ভুল নীতি আর ভুল সিদ্ধান্ত। সেই ভুলের প্রতিফলন হয়েছে ঘোষিত কমিটির সবখানে। তার এই নীতির কারণে ইতোমধ্যে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত নেতাকর্মী যারা কাক্সিক্ষত পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারা ক্ষোভ আর অভিমান নিয়ে অনেকটা নিভৃতে আবার অনেকে প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে সরে যাবার জন্য মনস্থির করেছেন। আবার অনেকে করণীয় নিয়ে নিজেদের অনুসারীদের সাথে বৈঠকের পর বৈঠক করছেন।

এই অবস্থা চলমান থাকলে আগামী দিনে দলের সাংগঠনিক সমস্যা আরো প্রকট হয়ে উঠবে, খালেদা জিয়া রাজনীতিতে বিশ্বস্তদের হারিয়ে একা হয়ে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন দলটির নেতৃবৃন্দ।

ইতোমধ্যে ঘোষিত কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী ফালু, সহ প্রচার সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম, নির্বাহী সদস্য ও মাগুড়া জেলার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামালসহ চারজন পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগপত্রে কাজি কামাল অভিযোগ করে বলেন, ‘দলের নির্বাহী কমিটিতে কিছু বির্তকিত লোককে সদস্য করা হয়েছে যাদের নেতৃত্বে বিএনপি করা সম্ভব নয়। ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে ১/১১ সময়ে যার ভূমিকা ছিল প্রশ্নবোধক সেই নিতাই রায় চৌধুরী (গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এর বেয়াই) কে কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং মাগুরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক করার কারণেই পদত্যাগ করেছেন বলে উলে­খ করেছেন।

জানা গেছে, ঘোষিত কমিটিতে কাক্সিক্ষত পদ না পাওয়া এবং পদবঞ্চিত নেতাদের অনেকে লন্ডনে যোগাযোগ করছেন। অনেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাথেও সাক্ষাৎ করে ভগ্নমন নিয়ে ফিরে এসেছেন।

নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের সাড়ে চার মাস পর ঘোষিত বিশাল কমিটিতে খালেদাকে ঘিরে থাকা শিমুল-রিজভীর সিন্ডিকেটের একক আধিপত্য আর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। নিরাশ হয়ে পড়ছেন খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের সহচর নেতাকর্মীরা। তারা এখন এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছেন যে, রাজনীতি থেকে তাদের বিদায় এখন সময়ের ব্যাপার।

এদিকে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আরও অনেকে পদত্যাগের জন্য প্রস্ততি নিচ্ছেন। আবার অনেকে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। দলের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করে যাওয়া পদহীন নেতারাও হতাশায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। নব্বই পরবর্তী অনেক ছাত্রনেতার কপালে কোনো পদ এখনো জোটেনি বলে তারাও হতাশ। ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন রাজপথের নারী নেত্রীরাও।

তারা বলেন, রাজপথে থেকে আন্দোলন করেছি। কারাগারে গিয়েছি। পরিবার-পরিজন বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্যাতন সহ্য করেছি। কমিটির পদ-পদবীর বেলায় অরাজনৈতিক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাদের জায়গা হয়। একইরকম রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে শতাধিক বিভিন্ন পেশাজীবী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও নিজেদের ক্ষোভ জানিয়েছেন বঞ্চিত নেতাকর্মীরা।

এছাড়া ঘোষিত নতুন কমিটিতে ছাত্রদলের হেভিওয়েট নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করার প্রবণতায় হতভম্ভ হয়ে পড়েছেন দলটির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী।

অপরদিকে ঘোষিত কমিটির বিশাল অংশ জুড়েই সিনিয়র-জুনিয়র সমন্বয় করা হয়নি বলে অনেকের রাজনীতিই এখন হুমকির সম্মুখীন। অবমূল্যায়ন করা হয়েছে আবদুল­াহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকাদের মতো নেতাদেরকেও। এসকল নেতা এখন তাদের ইমেজ রক্ষার জন্য হলেও রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় থাকার চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

বঞ্চিত নেতাকর্মীরা লন্ডনে বসবাসরত দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন। জানাচ্ছেন নালিশ। সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন তারেক। পাশাপাশি কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমিটি পুনর্বিন্যাসের আশ্বাসও তিনি দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এদিকে কমিটি গঠনের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ওঠায় তাদের ওপর চটেছেন তারেক রহমান। এ ছাড়া দু’একটি ঘটনায় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও তাদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষেপেছেন বলে জানা গেছে।

নেতাদের অভিযোগ, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরেই দলের নিবেদিত নেতাকর্মী থেকে খালেদা জিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার কৌশল অবলম্বন করে চলছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা এই নেতা এক সময়ে ছাত্রদলের ব্যানারে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হন। ওয়ান ইলেভেন সময়ের প্রথমদিকে সংস্কারপন্থিদের ভিড়ে দলের মূল স্রোতের শূন্যতায় খালেদা জিয়ার ওই সময়ের সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহনের ইন্ধনে ও প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় দলের প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সাথে কাজ শুরু করেন রিজভী।

এ বিষয়ে মহিউদ্দি খান মোহন বলেন, ‘ওই সময়ে দলের দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সহ দপ্তর (বর্তমানে ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক) এমরান সালেহ প্রিন্সও সংস্কারপন্থিদের সাথে ভিড়ে যান। প্রিন্সের কাছে বিবৃতি দেয়ার জন্য দলীয় প্যাড চাইলেও তিনি তা প্রত্যাখান করেন। এ পরিস্থিতিতে দলের বক্তব্য বিবৃতি প্রকাশের জন্য আমাদের একজন দপ্তরের নেতা দরকার ছিল। এ কারণেই আমি ওই সময়ে সহ দপ্তর সম্পাদক রিজভীকে মূল ধারা বিএনপিতে নিয়ে আসি। এরপর সবই ইতিহাস।’

ঘোষিত কমিটির বিষয়ে একাধিক ছাত্রনেতা অভিযোগ করে বলেন, যে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে তাতে ভুলে ভরা। তাড়াহুড়া করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেই এই সমস্যা তৈরী হয়েছে। কিছুদিন আগে রিজভী আহমেদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার দোহাই দিয়ে গুলশানা কার্যালয়ে দিনরাত অবস্থান করে খালেদা জিয়ার বাসায় অবস্থনকারী আরেক সিন্ডিকেট শিমুলের সাথে এই কমিটি গঠন করেছেন। কমিটিতে অনেক অপরিচিত এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাকেও পদায়ন করা হয়েছে। পুরো কমিটিকে তাদের অনুকূলে রাখার জন্য তাদের আশীর্বাদপুষ্টদেরকেই পদ-পদবী দেয়া হয়েছে। যারা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারেন বলে আশঙ্কা করেছেন তাদেরকেই কমিটি থেকে বাদ দিয়েছেন অথবা পদাবনতি করে ওএসডি করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

এখন ঘোষিত কমিটি নিয়ে সারাদেশের নেতাকর্মীদের ক্ষোভ ও অপ্রত্যাশার বিষয়ে খালেদা জিয়াকে অন্ধকারে রাখার জন্য প্রতিদিন নিয়ম করে তাদের সিন্ডিকেট বলয়ের নেতাকর্মী দিয়ে খালেদা জিয়াকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এই সিন্ডিকেট এর মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে, ঘোষিত কমিটিতে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত।

তবে বসে নেই বঞ্চিত নেতাকর্মীদের একাংশ। তারাও একাট্টা হয়ে শিমূল-রিজভীকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন। ফলে যে কোনো সময়ে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন দলের নেতা-কর্মীরা।

রাজনীতি-এর সর্বশেষ খবর