Total Bangla Logo
For bangla আজ শুক্রবার 2:47 pm
28 July 2017    ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪    04 ذو القعدة 1438

দেওবন্দের দিনরাত্রি | ০৭

কভি না কেহনা আলবিদা

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৪:১১ পিএম, ২৫ জানুয়ারি ২০১৭ বুধবার

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ | স্টুডেন্ট : দারুল উলুম দেওবন্দ, ইনডিয়া

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ | স্টুডেন্ট : দারুল উলুম দেওবন্দ, ইনডিয়া

‘আইয়ে, আইয়ে হজরত মুফতি সাহাব!`
বেশ আনন্দিত স্বরে বললেন কথাটি৷ মাস কয়েক বাদে শুনলাম প্রিয় কণ্ঠটি ফের৷ তাকে আমার জন্য অধীর অপেক্ষিত মনে হলো তারই গলার দরদি শব্দে৷

মুচকি হাসতে হাসতে এগোলাম৷ আস্তিন টেনে পাশে বসালেন৷ মুসাফার জন্য হাতদুটো বাড়ালেন৷ আমি নিচু স্বরে কথা বলি, তিনি জানেন৷ বড় ভালোবাসেন আমায়৷ পছন্দ করেন অন্যদের তুলনায়ও বেশি৷

সালাম করলাম৷ জানতে চাইলাম,
   ‘খায়রিয়্যাত হে?`
   ‘জী, আলহামদুলিল্লাহ৷ লেকিন দো দিন তাক বোখার চাল রাহা হ্যায়৷`
   ‘হামে পাতা হি নেহি লাগা৷`
   ‘মাগার এতনে দিনুঁ তাক অাপ কাহা থে?`
   ‘কামরে মে৷`
   ‘ও তো হামে ভি পাতা হ্যায়৷`

হাসলাম৷ হজরত আমার হাতদুটো ধরলেন৷ মুচকি হাসলেন৷ বললেন, ‘আপ খবর হি নেহি রাখতে হে হামারি!`
   ‘নেহি, এয়সি কৈ বাত হি নেহি৷ দারাসাল টাইম নেহি মিলতা৷`
   ‘আচ্ছা, তো হামে বাতা দে-তে৷ আপ হি কি জিয়ারত মে হাম খোদ হি আ-জাতে৷`

লজ্জায় এতোটুকুন হয়ে গেলাম৷ কাচুমাচু করলাম খানিকটা৷ কতোটা সহজে তিনি এসব বলেন৷ বিল্কুল সাদাসিধে ধরণ তার বাক্যবুলির৷ কথা বলেন ধীরে ধীরে; একদম ক্ষীণস্বরে৷ পাশের মানুষটি ছাড়া অন্য কারোর বোঝার ক্ষমতা নেই৷ হাসি হাসি রেখা টানেন মুখে-অবয়বে৷ আরম্ভ করেন ফের নিজের হাস্যরস কথায় কথায়৷

.
গেলোবার প্রতিদিন প্রায় আসা হতো তার কাছে৷ কিন্তু এইবার সেরকমটা ফুরসৎই মেলে না৷ হজরতও তাই অভিমান করলেন, বোঝা গেলো৷ হাতদুটো ধরে তো অনেকটা দিন বলেই বসতেন, ‘আপকো আজ জানে নেহি দেঙ্গে হাম৷` আমার মনটাও বলতো, ‘কাশ, এ ভি হোতা…৷`

.
বহুদিন বাদে আজ এলাম মহল্লায়ে খানকায়৷ হজরতের দাওয়াখানা এখানেই৷ সবার মতো আমরাও বসলাম৷ একের পর এক তালিবে ইলম নিজের শারীরিক হালত জানালো৷ একে একে সবাইকে ওষুধ দিলেন তিনি৷ ক`জন বাদেই এলো আমাদের পালা৷

এখানটায় ঢুকতেই হজরতের নজর পড়েছে আমার ওপর৷ টের পাইনি প্রথমে৷ কাছে যেতেই জানালেন কথাটি৷ মৃদু হাসলাম আমি৷ বড় আদর করেন হজরত আমায়, আমাদের৷ সম্পর্কে দাদুভাই যেনো তার৷

.
পাশের কেদারাটিতে বসালেন৷ কুশল বিনিময় হলো৷ আমার কামরায় দাওয়াতের কথা বললাম৷ না আসবার অজুহাত দাঁড় করালেন জ্বরকে৷ পরে আসবেন বলে জানালেন খুশি মনে৷ ফোন নম্বর বদলেছেন বলে নতুন নম্বর দিলেন নিজ আগ্রহেই৷

.
হজরতের হাতে হাত রেখেই আসর-মুহূর্ত কাটলো আমার৷ দেখালাম দুজন সাথীকে৷ ওদের শারীরিক হালত বেজায় খারাপ৷ দিনের পর দিন কাটে সুস্থতার নেয়ামত থেকে বঞ্চিত থেকে৷ শেফা চেয়ে পুরো বিবরণ পেশ করলাম হজরত বরাবর৷

দুজনকেই ওষুধ দিলেন তিনি৷ আমায় বললেন,
   ‘তুম আ-তে রাহা করো৷`
   ‘জী, জরুর৷`
   ‘আভি আগার না আও গে, তো ঘর জানে কে বাদ তো কভি লৌট কার ভি নেহি দেখো গে৷`

.
বাত কব ইশক কি হোটুঁ সে বয়াঁ হোতি হ্যায়
ইশক হোতা হ্যায় তো আঁখো মে যবাঁ হোতি হ্যায়
বোলতে রেহতে হে যব কুচ্ছ ভি নেহি কেহ পাতে
বাত যব বানতি হ্যায় তব বাত কাহাঁ হোতি হ্যায়!

.
আমি বসে বসে হজরতের কথা শুনি কেবল৷ নিজে বলি না কিছুই৷ কেনো যেনো তার কথাগুলো শুনতে আমার বড্ডো ভালো লাগে৷ তার অনন্য ভঙিমা আমায় মোহাবিষ্ট করে তোলে৷ নিষ্পাপ বালকের মতো প্রস্ফুটিত হাসিটুকুন অন্যরকম ভালোবাসায় হারায়৷

কথা বলার চেয়ে হাসির ফুল ফুটোনোয়ই আমায় বড্ডো মানায়৷ সবসময়ের মতো সেটাই শোভা পেলো৷ হজরত খুশি হলেন৷ নিজের হাতের মুঠোয় আমার হাতটি বাঁধলেন৷ চশমার আড়ালে নিজের ‘নিজেকে` ঢাকলেন৷ স্নেহস্বরে বললেন, ‘ফের কব আয়েঙ্গে?`
   ‘কভি নেহি আয়েঙ্গে৷` দুষ্টুমি করলাম আমি৷

হজরত খুব হাসলেন৷ দাঁত দেখা গেলো গোটা কয়েক৷ মুখে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘কভি না কেহনা আলবিদা৷`

ততোক্ষণে মসজিদে রশিদে আজান পড়ে গেছে৷ হজরত বললেন, ‘দোয়া কি দরখাস্ত হে ছোটা মুফতি সাহাব!` ধরা ধরা গলায় আমিও বললাম, ‘আপসে ভি৷`

.
বেঁচে থাকুন হজরত৷ ইফতা, ফতোয়ার অনেকটা পথ হাঁটুন আরও৷ হায়াতে তয়্যিবা নসিব হোক তার৷

.
এতোটা স্নেহ, গভীর মোহ আমি অন্য কোথাও পাই না খুঁজে৷ কতো অল্পতেই আপন করে নেন তিনি! তবেই না তিনি আমার, আমাদের হৃদয়রাজ্যে বসবাস করেন জিন্দেগি ভর৷ এমন উন্নত চরিত্রের লোকেরাই তো হন পৃথিবীখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দের ‘মুফতিয়ে সদর`৷

.
এরাই আমাদের আকাবির; আমাদের উলামায়ে দেওবন্দ৷ হজরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের সঠিক উত্তরসূরী৷ এরাই তো আমাদের সর্দার৷ আমাদের গুরু৷ আমাদের মহামানব৷

চলবে…

 

দেওবন্দের দিনরাত্রি কলামের আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন নিচে-

 

# তবুও হাঁটি স্বপ্নপথে