আজ বৃহস্পতিবার 8:37 am09 July 2020    ২৪ আষাঢ় ১৪২৭    18 ذو القعدة 1441
For bangla
Total Bangla Logo

অনেক স্মৃতি, বহু কথা

গণতান্ত্রিক নয়, আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্র গঠনে সক্রিয় ছিলেন এরশাদ

হাসানুল কাদির, প্রধান সম্পাদক, টোটালবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৬:৫০ পিএম, ১৪ জুলাই ২০১৯ রবিবার | আপডেট: ০৬:৫৬ পিএম, ১৪ জুলাই ২০১৯ রবিবার

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক প্রেসিডেন্ট। তিনি ইনতেকাল করেছেন-এ খবর পুরনো। তা টোটালবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম আগেই জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন ভাইয়ের ইন্টারভিউ প্রকাশের মাধ্যমে পাঠকদের জানিয়েছিল। এরশাদ-এর ইনতেকালে নানা মহল থেকে শোক প্রকাশ করা হবে, কিন্তু সেটি রুটিন শোক প্রকাশই হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এরশাদের মৃত্যুতে অবিশ্বাস্য রকমের যাতনায় ভুগছি। এর অনেক কারণ আছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে শুরুতেই এরশাদের জন্য জান্নাতের দোয়া করছি। তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

 


আমার বয়স খুব বেশি নয়। একচল্লিশ চলছে। দূর থেকে বিভিন্ন সময় এরশাদকে দেখার সুযোগ হলেও মুখোমুখি এবং একান্ত আলাপচারিতার সুযোগ হয় ২০০৫ সালে। ১ এপৃল মানবজমিন পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিই। আমার সঙ্গে ইলিয়াস হোসেনও একই দিনে পত্রিকাটিতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ইলিয়াস এখন এসএ টিভিতে কাজ করেন। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ও পত্রিকাটিতে জাতীয় পার্টি বিটের রিপোর্ট করতো। আমি করতাম জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর বিট। তবে বিটের বাইরেও অন্যান্য রিপোর্টারের মতো আমাকেও এসাইনমেন্ট দেওয়া হতো। জুন/জুলাই ২০০৫ সালের দিকে এরশাদ এবং বিদিশার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরশাদ বিদিশাকে তালাক দিলেন। বিদিশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে। তাঁদের সন্তান এরিককে নিয়ে নানা আইনিকথা। জাতীয় পার্টিতে প্রচ- ঝড়। এমন পরিস্থিতিতে একদিন আমাকেও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর সংবাদ সম্মেলনের এসাইনমেন্ট দেন চিফ রিপোর্টার সারোয়ার ভাই। পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় সারোয়ার হোসেন এখন এটিএন নিউজের নিউজ এডিটর হিসেবে কর্মরত। আমার এবং ইলিয়াসেরও তিনি সাংবাদিকতার শিক্ষক।

 


এসাইনমেন্ট অনুযায়ী বনানীতে এরশাদের অফিসে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিই। ওই সম্মেলনে এটিএন-এর মুন্নী সাহাসহ আরও অনেক সাংবাদিক অংশ নিয়েছিলেন। মুন্নী কোনো প্রোগ্রামে গেলে প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করবেই। ওই প্রোগ্রামেও ব্যতিক্রম হলো না। অন্য অনেক সাংবাদিককে ডিঙিয়ে মুন্নীর নানা প্রশ্নের জবাব বিরক্তির মধ্যেই এরশাদ সাহেব দিচ্ছিলেন। আমি কী প্রশ্ন করবো-ভাবতে ভাবতেই এক ফাঁকে একটি প্রশ্ন করি। দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। এরশাদ সাহেব আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে জানতে চাইলেন, তুমি কোন পত্রিকার? বললাম, মানবজমিন। স্যার বললেন, তুমি অনুষ্ঠান শেষে আমার সঙ্গে দেখা করো।

 


আমার গায়ে ছিল পাঞ্জাবি। মাথায় টুপি। মানবজমিন পত্রিকার রিপোর্টার! ব্যাপারটাই অন্য রকম। প্রশ্নের বিষয়টিও ছিল, ওজনদার। খুবই প্রাসঙ্গিকও। এভাবেই প্রথমবারের মতো এরশাদের সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎ এবং একান্ত আলাপচারিতার সুযোগ হয়ে ওঠে। স্যার প্রোগ্রাম শেষ করেই আমাকে ইঙ্গিত করলেন, তাঁর সঙ্গে যাওয়ার জন্য! কী যে খুশি হয়েছিলাম-ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। কারণ, এরশাদ ছিলেন বালক বয়স থেকেই আমার প্রিয় মানুষ। প্রিয় প্রেসিডেন্ট। যদিও তখন তিনি দেশের নিয়মতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, তারপরও এরশাদকেই আমার প্রেসিডেন্ট মনে হতো।

 


হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আমার প্রিয় প্রেসিডেন্ট এখন দুনিয়াতে বেঁচে নেই-সত্যিই কষ্টদায়ক। স্যার রুমে ঢুকেই প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন, মানবজমিনে কাজ করো? পড়াশোনা করেছ কোথায়? বললাম, কওমি মাদরাসায়। কোন পর্যন্ত? দাওরায়ে হাদিস। বাড়ি কোথায়? তাড়াইল, কিশোরগঞ্জ। লাঙ্গলের এলাকায়। লাঙ্গলের এলাকায়-হাসতে হাসতে বললেন। ওখানে তো আমার এমপি নেই। তাড়াইলের মানুষ আমাকে খুব ভালোবাসে। জানি। আরও কিছুক্ষণ মানবজমিনসহ আলেম-ওলামাদের বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা বললেন। নিজের ব্যক্তিগত নাম্বার দিয়ে বললেন, যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি আমাকে ফোন করবে। সারাজীবন প্রয়োজন হলেই স্যারের সঙ্গে আমার সরাসরি ফোন হতো। তিনিও ফোন করতেন। তবে, বেশি ফোন করতে হতো আমাকেই।  

 


হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে এরপরে বিভিন্ন সময় কারণে-অকারণে বহুবার দেখা-সাক্ষাৎ-আলাপ-আলোচনা হয়েছে। একান্তভাবেও হয়েছে, বৈঠকি সাক্ষাৎও হয়েছে। একবার স্যারকে বললাম, স্যার, আপনার জাতীয় পার্টিতে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। এই অভিযোগ সব মহল থেকেই জোরোশুরে করা হয়। আপনি দলটিকে গণতান্ত্রিকভাবে চালালে...এভাবে বলে শেষ করতে না করতেই এরশাদ সাহেব বললেন, তুমি বলো, বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ কোন দলে গণতন্ত্রের চর্চা আছে? জামায়াতে ইসলামী ইসলাম কায়েমের কথা বলে রাজনীতি করে। অথচ ওরা এখন গণতন্ত্রের কথা বেশি বলে। এই জামায়াতেই কি গণতন্ত্র আছে? এরা ইসলাম কায়েম করবে দাবি করে, গণতন্ত্রের আওয়াজ দেয়। বিএনপি-আওয়ামী লীগ শুধু মুখে মুখে গণতন্ত্র গণতন্ত্র করে। গণতন্ত্র কাকে বলে? গণতন্ত্র কী? এগুলো কি খালেদা-হাসিনারা বুঝে? আমার দলে গণতন্ত্র নেই। কেন থাকবে? আমি কি গণতন্ত্রের জন্য রাজনীতি করি? আমাকে স্বৈরশাসক অভিযোগ তুলে আমার বিরুদ্ধে খালেদা-হাসিনারা আন্দোলন করলো। আমি ক্ষমতা ছেড়ে দিলাম। কই, এতদিনেও তারা তাদের প্রিয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে না কেন? আমার তো দলে গণতন্ত্র নেই। ওরা দেশ চালায়। বলেছে, গণতান্ত্রিক দেশ গঠন করবে। কই, গণতান্ত্রিক দেশের নমুনা কি এটাই?  ওরা তো দেশেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে নাই। আমি যদি স্বৈরশাসক হয়ে থাকি, তাহলে খালেদা-হাসিনা কী?

 


জনাব এরশাদ সেদিন বলেছিলেন, আমি ক্ষমতায় গিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেছিলাম। আমি কোনোও বাদ-মতবাদের প্রবক্তা নই। কোনোও তন্ত্রে-মন্ত্রে আমি বিশ্বাস করি না। আমি মুসলমান। কুরআনে বিশ্বাস করি। হাদিসে বিশ্বাস করি। পবিত্র কুরআন আমাদের সংবিধান। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বড় মুসলিম রাষ্ট্র। আমি একটি আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রের চিন্তা করেছি। যেখানে আমার কোনো মত থাকবে না। আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ক্ষমতার মালিক আল্লাহ। জনগণ ক্ষমতার উৎস নয়। গণতন্ত্র কী? গণতন্ত্র মুসলমানদের ধ্বংস করার একটি ষড়যন্ত্র। এখন দেখছি, অনেকে ইসলামি গণতন্ত্রের কথা বলে। ইসলামি আবার গণতন্ত্র হয় কীভাবে, বলো? ইসলাম ইসলামই। গণতন্ত্র গণতন্ত্রই। দুটি ভিন্ন চিন্তা, সাংঘর্ষিক বিষয়।

 


হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর সঙ্গে জঙ্গিবাদ বিষয়ে কয়েকবার কথা হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। তবে, তিনি সেই স্পষ্ট বক্তব্য সবখানে পরিষ্কার বলতে পারেননি। যেমন তিনি রাজনীতিবিদ হলেও ‘শৃঙ্খলমুক্ত’ রাজনীতি করতে পারেননি, ঠিক তেমনি জঙ্গিবাদসহ ইসলামের নানা বিষয়ে অনেক কাজ করতে চাইলেও করতে পারেননি। এর জন্য কি বিদিশারা দায়ী? ঠিক এভাবেই একদিন প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, বিদিশারা দায়ী নয়। বিশ্বাসঘাতকেরা দায়ী। আমাদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকের সংখ্যা অনেক। ষড়যন্ত্রকারী বহুত। বিশ্বাসঘাতক চিনে সামনে এগুনো খুব কষ্টকর। দুনিয়াতে বর্তমানে দুই শ কোটির মতো মুসলমান। অথচ আমাদের কী দুঃসহ অবস্থা! কী করুণ দিনকাল! মুসলমান পরিচয়ে নরমাললি বেঁচে থাকাই সম্ভব হচ্ছে না।

 

# তাবলিগ পরিস্থিতি
বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের কাছে আল্লামা তাকি উসমানির বিশেষ চিঠি

 


হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সব তো এক লেখায় লিখে শেষ করা যাবে না। তাঁর বহু কথা আমার ভাণ্ডারে জমে আছে। মাঝেমধ্যেই সেসব থেকে কিছু কিছু হয়তো আলোচনা করবো। আজ রবিবার [১৪ জুলাই ২০১৯] তাঁর ইনতেকালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ চলে গেছেন না ফেরার দেশে। মহামান্য প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে গত কয়েক বছর আমার শুধুই পলিটিক্যাল আলোচনা হয়েছে। একদিন তিনি আমাকে বললেন, আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন আমি আর আমি নেই। আমি এক অতীত। এই কোনো রকম বেঁচে আছি। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। তোমার হাত ধরে বাংলাদেশে নতুন সূর্যের উদয় হবে। জানি, সেদিন আমি বেঁচে থাকবো না। বাংলাদেশের সংবিধান, আমরা চাই আল-কুরআন। তোমার দল বাংলাদেশ ইসলামিক ইউনিয়ন। তোমার এবং আমার সংবিধান পবিত্র কুরআন। ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতিটুকু দিতে পেরেছিলাম। এর চেয়ে বেশি কিছু পারি নি। চেয়েছি। এখনো চাই।

 

# আসছে ‌আলেম `সাংবাদিক আমি হাসানুল কাদির` বই

রবিবার, ঢাকা
১৪ জুলাই ২০১৯

জাতীয়-এর সর্বশেষ খবর