Total Bangla Logo
For bangla আজ শুক্রবার 2:43 pm
28 July 2017    ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪    04 ذو القعدة 1438

ইসলামে জুয়া হারাম, কেন? জেনে নিন

মাওলানা আহমদ আবু বকর

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০২:৫৯ পিএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৬ রবিবার

জুয়া খেলার একটি প্রতীকী ছবি

জুয়া খেলার একটি প্রতীকী ছবি

জুয়াকে আরবি ভাষায় ‘মায়সির’ ও ‘কিমার’ বলা হয়। মায়সির ও কিমার এমন খেলাকে বলা হয়, যা লাভ ও ক্ষতির মধ্যে আবর্তিত থাকে। অর্থাৎ যার মধ্যে লাভ- ক্ষতি কোনোটাই স্পষ্ট নয়।

 

জুয়ার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। বলা চলে, নবী করিম (সা.)-এর আবির্ভাবের সময় মক্কায় নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন ছিল। বর্তমানে প্রাচীন পদ্ধতি ছাড়াও জুয়ার ক্ষেত্রে আরও বহু নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে। যেমন হাউজি, টাকা বাজি রেখে ঘোড় দৌড় ও তাস খেলা ইত্যাদি। এগুলো সবই হারাম।

 

শুধু নাম পরিবর্তনের কারণে বস্তুর মূল প্রকৃতি এবং হুকুম পরিবর্তন হয় না। কাজেই প্রাচীনকালে প্রচলিত জুয়া সম্পর্কে যে হুকুম প্রযোজ্য ছিল, আধুনিক কালের জুয়ার ক্ষেত্রেও সেসব হুকুম প্রযোজ্য।

 

ইসলামি শরিয়তে জুয়া হারাম। একাধিক আয়াত ও হাদিসে এ সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে,  ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। তোমরা তা বর্জন কর। তাহলেই তোমরা সফল হতে পারবে। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও নামাজ আদায়ে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না।’ -সুরা মায়িদা, আয়াত ৯০-৯১।

 

এ আয়াতে মদ ও জুয়াকে ঘৃণ্য বস্তু আখ্যায়িত করা হয়েছে। এগুলোকে শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। আয়াতে এগুলো থেকে দূরে থাকার হুকুম করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, এতে পরষ্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। এর দ্বারা শয়তান মানুষকে নামাজ আদায় করা এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ রাখে। কাজেই মদের মতো জুয়া খেলাও হারাম। এর হারাম হওয়ার বিষয়টি কোরআনের অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত। কেউ এই হুকুমকে অস্বীকার করলে সে কাফের বলে গণ্য হবে।

 

এ প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেউ তার সাথীকে বললো, এসো জুয়া খেলব। তাহলে (এ কথার অপরাধের কারণে) সদকা করা তার ওপর অপরিহার্য।

জুয়াকে অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করা কোনো মুসলমানের জন্য জায়েজ নেই। একে খেলা, মনের সান্ত্বনা, তৃপ্তি ও অবসর বিনোদনের উপায়রূপে গ্রহণ করাও বৈধ নয়।

 

জুয়া খেলার বহু অপকারিতা রয়েছে। যেমন- এ খেলায় অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।  তেমনি এতে মানুষের চারিত্রিক ক্ষতিও হয়।

 

জুয়ায় অভ্যস্ত ব্যক্তি ক্রমান্বয়ে উপার্জনের ব্যপারে অলস, উদাসীন ও নিস্পৃহ হয়ে যায়। জুয়ার জয়-পরাজয় মারামারি এমনকি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। জুয়াড়ি ব্যক্তি জুয়ার নেশায় মাদকাসক্তের ন্যায় মাতাল থাকে সর্বদা। এ কারণে সে ছেলেমেয়ে, স্ত্রী ও আত্মীয় কারোর খবর রাখতে পারে না। জুয়াড়ি তার পরিবার-পরিজনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারে না। ছেলেমেয়েদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত বানাতে পারে না। বরং তারাও পিতার দেখাদেখি ওই সর্বনাশা খেলায় আংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এভাবে জুয়াড়ির পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।

 

জুয়াড়ির মেজাজ সর্বদা রুক্ষ্ম থাকে। রুক্ষ্ম মেজাজের মানুষগুলো হয় নিষ্ঠুর। জুয়ায় জয়ী আরও লাভের নেশায় মাতাল হয়ে উঠে‍। পরাজিত ব্যক্তি প্রতিশোধের নেশায় উন্মাদ হয়ে উঠে। তাই স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিবাদ, ঝগড়া ও অশান্তি সর্বদা লেগে থাকে। বর্তমানে স্ত্রী কর্তৃক স্বামী হত্যা বা স্বামী কর্তৃক স্ত্রী হত্যা- এ জাতীয় লোমহর্ষক ঘটনার পেছনে জুয়ার প্রভাব লক্ষণীয়।

 

জুয়া খেলায় মানুষ আল্লাহবিমুখ এবং নামাজ-রোজা তথা ইবাদত-বন্দেগির ব্যপারে চরম উদাসীন হয়ে যায়। জুয়াড়ির একমাত্র ধ্যান-ধারণা কেমন করে আরও টাকা বানানো যায় অথবা কেমন করে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া যায়। কাজেই জুয়ার এ সর্বনাশা গ্রাস থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য।

সমাজে লটারি, হাউজি, বাজি ধরা, চাক্কি ঘোরানো ও রিং নিক্ষেপ থেকে শুরু করে প্রভৃতি নামে নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন রয়েছে। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও বসছে জুয়ার আসর। কৃষক, তরুণ, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছেন মরণনেশা জুয়ায়। এসব আসরে উড়ছে লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা। মাদকের মতোই জুয়ার ছোবল এখন দৃশ্যমান। এমতাবস্থায় দেশের সচেতন অভিভাবকদের প্রত্যাশা, অনৈতিক এসব জুয়ার আসর বন্ধে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

সব ধরনের জুয়াবাজি অবৈধ এবং এর থেকে প্রাপ্ত সম্পদ হারাম। হারাম সম্পদ ভোগ করে ইবাদত-বন্দেগি করলে আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয় না। তাই সব ধরনের জুয়াবাজি থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

 

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমিন।

 

লেখক : ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার

 

আরও পড়ুন :

# জুয়া খেলা চলছে, চলবেই