Total Bangla Logo
For bangla আজ শুক্রবার 2:40 pm
28 July 2017    ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪    04 ذو القعدة 1438

দেওবন্দের দিনরাত্রি | ০১

অল্পস্বল্প সোনালি গপ্পো

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ, ইনডিয়া থেকে

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ০৫:০০ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৬ রবিবার | আপডেট: ০৫:১২ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৬ রবিবার

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ, শিক্ষার্থী, দারুল উলুম দেওবন্দ, ইনডিয়া

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ, শিক্ষার্থী, দারুল উলুম দেওবন্দ, ইনডিয়া

ঢাকার মালিবাগ জামিয়ায় যখন পড়তাম, স্বপ্ন দেখতাম, একদিন আমাদের আকাবিরের চরণভূমিতে যাবো ৷ সেখানে পড়বো ৷ তাদের হাঁটা রাস্তায় হাঁটবো৷ ছুঁয়ে দেখবো তাদের সব কারনামা৷ উপলব্ধি করবো সেই রূপোলি দিন৷

দাওরা শেষ করে বন্ধনহারা হলাম সেই উদ্দেশ্যে৷ পাড়ি জমালাম হিন্দুস্তানের স্বপ্নের সেই দেওবন্দে৷ ভর্তি হলাম ইফতা বিভাগে৷ হাদিসের সনদের জন্য একটি বছর প্রতীক্ষায় থাকলাম৷ দিনক্ষণ শেষে এবার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চললো৷ তবু কেনো যেনো বোধ হচ্ছে স্বপ্নই দেখছি আজও৷

দারুল উলুম দেওবন্দের পথে পথে হাঁটি মুহূর্তেই৷ দেখি একের পর এক বিমুগ্ধ মানাজির৷ এক ইমারত থেকে আরেক ইমারতে অবাক দৃষ্টি ফেলি৷ মসজিদে রশিদে নামাজ আদায় করি৷ মসজিদে সাত্তারে জল পান করি৷ মসজিদে কদিমে বসে বসে অবসর কাটাই৷ নওদারায় হাঁটাচলা করি৷ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পান করানো জলকূপ থেকে তেষ্টা মিটিয়ে জল পান করি৷ তাঁর আঁকা নির্মাণ রেখার ‘এহাতায়ে মুলসুরি`তে সুরা ইয়াসিন পাঠ করি৷ পৃথিবীর সমস্ত বাবার জন্য মাগফিরাতের প্রার্থনা করি৷ তবু কেনো যেনো মনে হয়, আমি স্বপ্ন দেখছি আজও৷ ঘুমের ঘোরটা কেটে যাবে খানিকটা প্রহর বাদেই৷

 

fb

দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিটা ক্ষুদ্র বস্তুও আমায় মুগ্ধ করে৷ সময় লাগিয়ে লাগিয়ে প্রতিটা দেয়ালের প্রতিটা লিফলেট, এলান-ঘোষণাপত্র পাঠ করি৷ মাঝেমধ্যে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখি এই শুভ্র-সফেদ টুপি আর কোর্তা-পাঞ্জাবির ফেরেশতাতুল্য মিছিল৷ আহ, কী সুশীল দৃশ্য! কতো মনোরম এই পরিবেশ!
…………

বছর দেড়েক ধরে দেখে আসছি, স্বপ্নের ‘দারুল উলুম দেওবন্দ`কে৷ কেবল কোনো চেতনার নাম নয় এটি; বরং একটি আদর্শ জ্ঞানগরিমায় অপার যোগ্যতার উচ্চতর শিক্ষাকেন্দ্র৷

মাদরাসাশিক্ষার একাডেমিক স্তর কেবল নয়, প্রতিটা শিক্ষার্থী এখানে অর্জন করে দক্ষসম্পন্ন নানান কারিকুলাম, লেখালেখি, তথ্যপ্রযুক্তি, বক্তৃতাভাষণসহ যুগোপযোগী পাঠদীক্ষা৷
……………

বাংলায় যখন ছিলেম;
কেউ বিদেশি শব্দ বললে খারাপ লাগতো৷ গোস্বা করতাম তার ওপর৷ কিন্তু এখন আর তা করা হয় না৷ নিজেই বরং বিদেশি শব্দবাক্যে হাবুডুবু খাই৷ বিদেশি ভাষাজ্ঞান, সাহিত্যচর্চায় বুঁদ হয়ে থাকি৷ এখানে এসে শিখলাম উর্দু, হিন্দি, মারাঠি, অসমীয়া, ভৌজপুরি, নেপালিসহ দশখানা ভিনভাষা-সাহিত্য৷
……………

দারুল উলুম দেওবন্দের কোনো বিভাগেরই তুলনা হয় না অন্যটির সঙ্গে৷ প্রতিটা শাখা, শোবাই নিজ বৈশিষ্ট্যে অনন্য৷ তবু এর সাহিত্য-সংস্কৃতির পরশ যেনো এই এহাতা ছাড়িয়ে গোটা দুনিয়াজুড়ে৷

দারুল উলুম দেওবন্দ তৈরি করেছে মানাজির আহসান গিলানি, মানজুর নোমানি রহিমাহুমুল্লাহ—এর মতো লাখো ইতিহাসখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক৷
……………

প্রতিটা ভোরে আমি সদর গেট হয়ে ভেতরে ঢুকি৷ মাদানি গেট হয়ে ভরদুপুরে ফের বেরোই৷ আবার মাদানি গেট হয়ে সন্ধ্যেয় ঢুকি, সদর গেট ধরে বেরোবার পথটা খুঁজি৷ এরই মাঝে আত্মস্থ করি আকাবিরের চেতনা, ঐতিহ্য, চিন্তা-প্রতিমা৷
……………

সদর গেট ধরে ভেতরে কদম বাড়াতেই চোখে পড়ে চারপাশের দেয়ালজুড়ে টাঙানো বিভিন্ন ভাষার দেয়ালপত্র৷ এহাতায়ে মুলসুরির পূর্বকোণে ও মাঝ বরাবর বকুল গাছদুটির শেকড়ে রাখা আরও কতোগুলি উর্দু, আরবি, হিন্দি, ইংরেজি, নেপালি, মারাঠি, তামিল, ফার্সি, কেরালা ভাষার দেয়ালপত্র নজর কাড়ে৷ তেমনি মাদানি গেটের ছাদনাতলায়ও দৃষ্টি কাড়ে বাংলা, অসমীয়া, ঊড়িষ্যা ভাষার রঙবেরঙের দেয়ালিকা৷

আরবিতে ১৭টি, উর্দুতে ৬৫টি, হিন্দিতে বিশেষ সংখ্যা, বাংলায় ৫টি, ইংরেজিতে ১টি, ফার্সিতে ১টি, নেপালিয়ানে ১টি, তামিলে ১টি, কেরালায় ১টি সাপ্তাহিক, মাসিক দেয়ালপত্র প্রকাশিত হয় নিয়মিত৷

আমি সব ক`টায় নজর বোলাই৷ সময় লাগিয়ে, ঠায় দাঁড়িয়ে এসবের বুকজুড়ে নির্মিত আঁকিবুঁকি দেখি৷ শুদ্ধ মানব বনে যাই অভিনব রচনা, নান্দনিক শিলালিপিতে৷ উর্দু, হিন্দি, ফার্সি, আরবি, ইংরেজি শিরোনামগুলো দেখে দেখে মুগ্ধ হই৷ আমারও ইচ্ছে জাগে খুব লিখতে৷

কামরায় আসি৷ বইপত্তর বন্ধ করি৷ ল্যাপটপ কোলে তুলে নিই৷ লিখি ইচ্ছেমতোন যা খুশি তাই৷ দারুল উলুমের ছবি আঁকি শব্দকথায়৷ মুক্তগদ্যের ছন্দতালে আবিষ্কার করি চিন্তা-চেতনা কাসেমিয়্যাতের৷ দেওবন্দি আদর্শ খুঁজে পাই এই দেয়ালপত্রের প্রতিটা কলাম, রচনায়৷

 

fbdd

 

আরবিতে প্রকাশিত দেয়ালপত্রের নাম-সারি বেশ দীর্ঘ, অভিনব—
১. আন নাদিল আদাবি
২. আর রাশাদ
৩. আল বালাগ
৪. আল ফজিলাহ
৫. আল হেলাল
৬. আল হাক্কুল মুবিন
৭. আল কাসিম
৮. আস সিরাজ
৯. আন নুকজাহ
১০. আস সবুর
১১. আল ইমদাদ
১২. আল খাইর
১৩. আল মুরতাজা
১৪. আল ওয়াইল ইসলামি
১৫. আল কাজি
১৬. আদ দাওয়াহ
১৭. আত তিবয়ান৷

উর্দুতে প্রকাশিত দেয়ালপত্রে যেনো ছেয়ে আছে পুরো এহাতায়ে মুলসুরি৷ একের পর এক দেয়ালপত্রে নজর আটকায় আমার৷ ভিন্ন আঙিকের দীর্ঘ নাম-ফিরিস্তি এমন—
১. আল ইহতিশাম
২. ইনকিলাব
৩. আল মুনাজারা
৪. আল মাহশার
৫. আয়নায়ে আইয়্যাম
৬. আন নিজাম
৭. আল বালাগ
৮. আল বয়ান
৯. আল ফজিলত
১০. ইত্তিহাদ
১১. আল হেলাল
১২. সালার
১৩. কারওয়াঁ
১৪. শাময়ে হেদায়াত
১৫. ইকাব
১৬. আল ইহরার
১৭. হায়াতে নও
১৮. শেরাজে হিন্দ
১৯. আন নোমান
২০. আল বদর
২১. আন নুর
২২. আদ দাওয়াত
২৩. আল ফখর
২৪. মেহতাব
২৫. নকশে দাওয়াম
২৬. শানে মুনাজ্জাল
২৭. আতহার
২৮. আর রিয়াজ
২৯. আফতাব
৩০. ইহতিসাব
৩১. আল মুজাহিদ
৩২. পয়গাম
৩৩. শাময়ে নও
৩৪. আন নাসির
৩৫. সুবহে নও
৩৬. আল আহাদ
৩৭. আল ওয়াজদি
৩৮. আল কাসিম
৩৯. আল মাহমুদ
৪০. আল হেরেম
৪১. তেহজিবুল আখলাক
৪২. আল হক
৪৩. আস সুলতান
৪৪. আল জাওহার
৪৫. আল ফয়েজ
৪৬. আল ইসলাহ
৪৭. বাহরে নও
৪৮. গাজি
৪৯. আর রমাদান
৫০. আল হুসাইন
৫১. আত তাবলিগ
৫২. আস সাবির
৫৩. আল হাফিজ
৫৪. আল জাওহার
৫৫. আল মাহফুজ
৫৬. আল ওয়াহহাব
৫৭. শাবাব
৫৮. আল ফজল
৫৯. আল মানহাল
৬০. আল ফালাহ
৬১. আফকার
৬২. আদ দিয়া
৬৩. আবশার
৬৪. আত তানজিম
৬৫. আল কায়েদ

বাংলায়
১. ইনকিলাব
২. নেদায়ে হেমায়েত
৩. আল বালাগ
৪. চেতনার উৎস
৫. নবচেতনা৷

ইংরেজিতে আল হায়াত, ফার্সিতে পারওয়াজ, অসমীয়া ভাষায় ইছলাম জ্যোতি, নেপালিয়ানে পয়ামে নেপাল, তামিলে আর রশিদ, কেরালা ভাষায় জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম দেওবন্দ৷

এছাড়াও প্রতিটা দিবসে উর্দু, হিন্দি, আরবি, ইংরেজি ভাষায় বেরোয় বিশেষ সংখ্যা৷ উর্দু, হিন্দি, আরবি ক্যালিগ্রাফিতে সাজে অপরূপ দেয়ালপত্র৷

এসব দেয়ালপত্র কিংবা বিশেষ সাময়িকী শিক্ষার্থীদের মেহনতের ফসল৷ দারুল উলুম দেওবন্দের একাডেমিক নিজস্বও তিরিশ দিনের দৈনিক রয়েছে দুটি৷ একটি আরবি, অপরটি উর্দু ভাষায়৷ বিশেষ দিন কিংবা বিশেষ কোনো উপলক্ষে উর্দুটির আবার হিন্দি ভার্সনও প্রকাশিত হয়৷ আরবি ভাষার ম্যাগাজিনটির নাম ‘আদ দায়ি`; উর্দু-হিন্দি ভাষাটির নাম ‘দারুল উলুম`৷ তথ্যসমৃদ্ধ আধুনিক আরবি, উর্দু, হিন্দি সাহিত্যের রচনাসমৃদ্ধ ম্যাগাজিনগুলি আন্তর্জাতিক মানের৷
……………

বিভিন্ন ভাষায় বাহারি সাজে যেমন অনেক দেয়ালপত্র বেরোয়, তেমনি দলবেঁধে নজরে পড়ে পাঠকের উপচেপড়া ভিড়৷ যখনই ফুরসৎ মেলে, তখনই কানায় কানায় ভরে যায় দেয়ালিকা-এলাকার আশপাশ৷

কতো তৃষ্ণা, কতো আগ্রহ এই যুগেও সাহিত্য-সাহিত্যিক, লেখক-লেখালেখির প্রতি! উজ্জ্বল উপমা দারুল উলুম দেওবন্দ ও তার শিক্ষার্থীরা৷ মাতৃভাষা উর্দু, হিন্দির পাশাপাশি নববি ভাষা আরবি সাহিত্যচর্চার এক বিরল, উপমাহীন দৃষ্টান্ত৷

এহাতার বাইরে ভারতের প্রতিটা রাজ্যের প্রতিটা ভাষারও রয়েছে আলাদা আলাদা সাহিত্যচর্চা বিভাগ৷ বুধ, বৃহস্পতিবার ছুটির প্রহরগুলোয় ব্যস্ত দেখা যায় বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যিক, আর্টিস্টদের৷ হপ্তাজুড়ে দর্সের ফাঁকে ফাঁকে, পড়ন্তবেলায় কলম ধরে সবাই৷ লেখে দেশবিদেশ, মুসলিম-অমুসলিম, মানব-মানবতার কথা৷ ছড়িয়ে পড়ে এই শব্দকালির আওয়াজ-স্বর দেশ থেকে দেশান্তরে৷
……………

পুনশ্চ : আকাবিরে দেওবন্দ কিংবা কাসেমিয়্যাত কেবল মুখের কোনো অনর্থক দাবি কিংবা বুলি নয়; বরং সর্বদিকের যোগ্যতার এক অপূর্ব নাম৷

যারা দেওবন্দের নামে নিজেদের অভিহিত করেন, দাবি করেন ‘দেওবন্দি`; তাদের অবশ্যই ভাবা দরকার, নিজ নিজ মাতৃভাষাচর্চার গুরুত্ব-প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি৷

যেই দারুল উলুম দেওবন্দের নামের ওপর ভর করে গোটা কওমিশিক্ষা পৃথিবীময় বিরাজমান, সেই দেওবন্দি চিন্তা-চেতনার কতোটুকুন বাস্তবে রয়েছে দেওবন্দের অনুসারীদের মাঝে!

আফসোস, কবে হবে সেই শুভ বোধোদয়!
……………

আজকাল দাবি করা হয়, আমরা দেওবন্দি৷ আমরা আকাবিরের উত্তরসুরী৷ আর কাজ হয় দেওবন্দের উল্টোপথের৷

মাতৃভাষা উর্দু, হিন্দিচর্চায় দেওবন্দের শিক্ষার্থীরা দিনরাত লেগে থাকে দর্সের ফাঁকে ফাঁকে৷ আর দেওবন্দের অনুসারী (?) বহু কওমি উলামায়ে কেরাম তো বাংলাচর্চাকে এখনও অবৈধ ফতোয়া দেন!

হায়, কবে যে বোধোদয় হবে!

সাহিত্য, সংস্কৃতির সবটুকুন ঐ অপসংস্কৃতিমনাদের হাতে দিনদিন শোভার ঘুম ঘুমোতে চলেছে৷ অথচ এখনও হচ্ছে না জাগা নায়েবে নবিদের সত্যের মশালতুল্য সফেদ ‘কলম` জ্বেলে৷

চলবে…
…………………………

লেখক : শিক্ষার্থী, দারুল উলুম দেওবন্দ, ইনডিয়া