Total Bangla Logo
For bangla আজ শুক্রবার 2:41 pm
28 July 2017    ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪    04 ذو القعدة 1438

দেওবন্দের দিনরাত্রি | ০৪

অন্যরকম মধ্যাহ্নভোজ এবং চরমোনাইপ্রসঙ্গ

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

টোটালবাংলা২৪.কম

প্রকাশিত : ১১:২৩ পিএম, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৬ শুক্রবার

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ | স্টুডেন্ট : দারুল উলুম দেওবন্দ, ইনডিয়া

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ | স্টুডেন্ট : দারুল উলুম দেওবন্দ, ইনডিয়া

‘মুফতি উবাইদুল্লাহ সাহাব, খাইয়ে! চুপ বৈঠে কিউ?` সঙ্গে খেতে বললেন সদর মুফতি সাহেব৷ লজ্জায় কাচুমাচু করছিলাম আমি৷ পেটে প্রচুর খিদে ছিলো৷ মানিয়ে নিচ্ছিলাম তবু৷ হজরতদের খাবার শেষে খাবো, অপেক্ষায় ছিলাম৷

   ‘আরে ভাই, খা লিজিয়ে না হামারে সাথ৷`
   ‘জি, ঠিক হে৷` দু`আঙুল লাগিয়ে মাছের কাঁটা ছাড়াচ্ছিলাম৷ হজরত বারবার খেতে বলছিলেন তাঁদের সঙ্গে৷

ঘটনাটি গতবারের এক রোদেলা দুপুরের৷ দারুল উলুমের প্রধান মুফতি সাহেব হজরত হাবিবুর রহমান খায়রাবাদি ও সহ-মুফতি হজরত নোমান লাখনৌবি সাহেব দামাত বারাকাতুহুমকে দুদিন আগে দাওয়াত করা হয়েছিলো কামরায়৷ সানন্দে দাওয়াত কবুল করলেন তাঁরা৷
 
.
জুমাবাদ মসজিদে রশিদ থেকে বেরোলাম৷ কাসেমি কবরস্তান জেয়ারত করে অপেক্ষায় রইলাম৷ এলো রাশেদ ভাই৷ মুফতি নোমান সাহেবের বাসায় যেতে হবে৷ তাঁকে দাওয়াতের কথা মনে করাতে হবে৷ হজরতের দরোজায় করাঘাত করা হলো৷
   ‘কৌন হে?`
   ‘রাশেদ৷`
দরোজা খুলে দেয়া হলো৷ ওপরতলায় মোতালায় মগ্ন হজরত৷ বলা হলো তাঁকে৷
‘ঠিক হে৷ আঁ রাহা হু৷`
হজরতের বাসায় রুটি বানানো হয়েছিলো৷ সঙ্গে নিলাম৷ বেরিয়ে পড়লাম কামরার পথে৷
 
.
সালাদ তৈরিতে লেগে গেলাম আমি৷ হজরতদের ইসতেকবালে বেরোলো রাশেদ ভাই৷ মিনিট দশেক বাদে হাজির হলেন মুফতি খায়রাবাদি সাহেব৷ সালাম-মুসাফা করলাম৷
   ‘খায়রিয়্যাত সে হে মুফতি সাহাব?` শুধালেন হজরত৷
   ‘জি, ঠিক হু৷ আপ কেয়সে হে? তবিয়ত ঠিক তো হ্যায় না?` আদবের স্বরে জানতে চাইলাম৷
 
.
হজরতের নাম কতো শুনেছি ছোটবেলা থেকেই৷ দাওরা, মিশকাতের বছর মালিবাগ গেছেন৷ কাছ থেকে দেখতে পাইনি৷ তিরিশ সালা দস্তারবন্দিতে গেছেন৷ মোলাকাত হয়নি৷ সুযোগ ছিলো না৷ দেওবন্দ এসে ভাগ্য খুলেছে৷ আসরের পর যাই৷ দেখা হয়৷ কথা বলি৷ জানাই সব৷ জিগ্গেস করেন সুখদুখ৷ আহ, কতো বড় মনের মানুষ তিনি৷
 
.
   ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ৷`
মুফতি নোমান সাহেবের কণ্ঠ শোনা গেলো৷ সঙ্গে আমাতুল্লাহ নেই৷ বড় চঞ্চলে শিশুকন্যা হজরতের৷ কী দারুণই না উর্দু বলে৷ একদম খাঁটি উর্দু৷ বিশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করে৷ হজরতের পেছন পেছনই ঢুকলো রাশেদ ভাই৷
 
.
দস্তরখান বিছানো ছিলো৷ খাবার সামনে হাজির করা হলো৷ বসে পড়লেন দুজনেই৷ খাওয়া শুরু হলো রুটি দিয়ে৷ মাছের ডিম, মাছ ভুনো, চিকেন বিরিয়ানি সামনে দিলাম৷ দুজনের বরাবর বসলো রাশেদ ভাই৷ জায়গা নেই আর৷ আমি বেরিয়ে গেলাম কামরা থেকে৷

দু`মিনিট অন্তর ছাদের ওপর আবিষ্কার করলাম নিজেকে৷ খোলা আকাশের বিস্তর প্রান্ত দেখতে লাগলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে৷ দুপুরের আলো ঝলমল দিন দেখছিলাম৷ দেখতে ভালো লাগছিলো বেশ৷ দিলটা বড় খোশ ছিলো৷

হাতের ইশারায় ডাকলো রাশেদ ভাই৷ হয়তো হজরতেরা ডেকেছেন আমায়৷ ভেতরে ঢুকলাম৷
 
.
‘মুফতি সাহাব খা লিজিয়ে৷` বললেন মুফতি নোমান সাহেব৷ শরম লাগছিলো৷ বিরত রইলাম৷ বসে বসে খাবার খুঁটতে লাগলাম৷
একটুকরো, দু`টুকরো করে মুখে দিতে আরম্ভ করলাম৷ অমনিই খায়রাবাদি সাহেব রহস্য করলেন, ‘হামারে জা-নে কে বাদ মুফতি উবাইদুল্লাহ সাহাব কো যিয়াদা খানে কা এরাদা হ্যায় শায়াদ৷ এসলিয়ে হামারে সামনে থোড়া হি খায়েঙ্গে৷` লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম আমি৷

মুচকি হাসি দিলেন হজরত৷ খুব পুলকিত হলাম৷ আহ, জীবনের অন্যরকম একটি মুহূর্ত ছিলো৷
 
.
দেখতে দেখতে খাবারপর্ব শেষ হলো৷ চরমোনাইপ্রসঙ্গ টানলেন মুফতিয়ে সদর সাহেব৷

চরমোনাই গিয়েছিলেন তিনি৷ পীর সাহেবকে খেলাফত দিয়েছেন৷ ফেরার পথে চরমোনাইর ব্যাপারে অনেক কটু কথা শুনেছেন৷ বেদাতি পীর, লোভী পীর, অপব্যয়কারী পীর খেতাব শুনেছেন চরমোনাই`র হজরত সম্বন্ধে৷
 
.
একজন বেদাতিকে খেলাফত দিলেন তাহলে? দেওবন্দ ফিরে ভেবেছেন অনেক৷ শাইখুল হাদিস জাকারিয়া রহ. তাঁকে খেলাফত দিতে চেয়েছিলেন৷ ছাত্র ছিলেন তখন৷ শাইখকে তাই অগ্রহণের কথা জানিয়েছিলেন৷ পরবর্তীতে আফসোস করেছেন অবশ্যি৷ এখনও করেন৷

পরে শাইখুল হাদিস জাকারিয়া রহ.-এর খলিফা হজরত মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহি রহ. থেকে খেলাফত পেয়েছেন৷ যিনি ‘ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া`র মুসান্নিফ৷ কিন্তু আজ সেই সিলসিলাকে কোনো বেদাতির হাতে সমর্পণ করলেন? নাহ, তা হতে পারে না৷ 
 
ভাবতে লাগলেন৷ কিন্তু চরমোনাইর ব্যাপারে যারা কটুক্তি করেছে, তারাও ঢাকার বড় বড় আলেম৷ তাহলে কে হক, কে না হক? কার কথা বিশ্বাস করবেন, কার কথা ছেড়ে দেবেন? মাস কয়েক দ্বিধায় ছিলেন মুফতিয়ে সদর সাহেব৷

.
ফরিদাবাদ মাদরাসার মুফতি আবু সাঈদ সাহেবের সঙ্গে কথা বললেন৷ জানতে পারলেন, চরমোনাইর মরহুম দাদা পীর মাওলানা ইসহাক সাহেবের খেলাফত যে কারি ইবরাহিম সাহেবের সিলসিলায়, তার কোনো প্রমাণ নেই৷ কিন্তু কারি ইবরাহিম সাহেব রহ.-এর জীবনীগ্রন্থে মাওলানা ইসহাক সাহেবের কথা উল্লেখ রয়েছে, ‘তিনি কারি সাহেবের দরবারে থাকতেন৷ কারি সাহেব একদিন তাকে বললেন, বরিশাল যাও৷ নিজ এলাকায় খেদমত আরম্ভ করো৷`
 
তাছাড়া মাওলানা ইসহাক সাহেব রহ. কারি সাহেবের সিলসিলা দাবি করায়ও কারি সাহেবের পরিবারের কোনো মাথা ব্যথা ছিলো না; এখনও নেই৷ তাহলে কেনো এতোসব? প্রশ্ন জাগলো খায়রাবাদি সাহেবের৷ বললেন, ‘সব জেনেশুনেই আমি চরমোনাইর পীর সাহেবকে খেলাফত দিয়েছি৷`

মুফতিয়ে সদর সাহেব মরহুম পীর মাওলানা ফজলুল করিম সাহেব রহ.-এর কথা জানতে চাইলেন৷ মুফতি আবু সাঈদ সাহেব বললেন, ‘তাঁর খেলাফত তো হাফেজ্জি হুজুর রহ.-এর থেকে প্রাপ্ত৷ এটা তো সর্বজন স্বীকৃত৷`

‘উনাকে আমিও দেখেছি হাফেজ্জি হুজুর রহ.-এর বৈঠকে; একসঙ্গে খানা খেতে৷` মুফতি আবু সাঈদ সাহেবের কথাটি আরও জোরালো করলেন মুফতিয়ে সদর সাহেব৷

‘আর মুফতি রেজাউল করিম সাহেব খেলাফত পেয়েছেন তাঁর পিতাজানের কাছ থেকেই৷` জানালেন মুফতি আবু সাঈদ সাহেব৷

মাঝখানে কাঁদা ছোঁড়াছুঁঁড়ি করলো কারা?
চরমোনাইর পীর সাহেব কি তবে ভণ্ড, বেদাতি পীর?
 
.
প্রতিটা মানুষের নিজস্বতা রয়েছে৷ রয়েছে মতাদর্শ গ্রহণে ব্যক্তিস্বাধীনতা৷ আমারও একটি মতাদর্শ রয়েছে৷ ছোটবেলা থেকেই রাজনীতিতে আমার তেমন কোনো ইন্টারেস্ট নেই৷ বিভিন্ন কারণও রয়েছে এর পেছনে৷ জীবনে বহুবার বহু লোক রাজনীতিতে জড়ানোর অফার করেছে৷ পা পিছলোয় নি কোনোদিন৷ কখনও যেনো না পিছলোয়, প্রার্থনা করি৷

শাসনতন্ত্র, খেলাফত মজলিস, জমিয়ত, ইসলামি মোর্চা, জামায়াত, বিএনপি, আ`লীগ—কোনো রাজনৈতিক ব্যানারই আমার পছন্দ নয়৷ অন্য সবাই রাজনীতি করুক; আমি করবো না৷ আমার মনোভাব এটাই৷ রাজনীতি করে, এমন বহু স্বজনের সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছে বহুবার৷ ছেড়ে দিয়েছি তাদেরকে তাদের হালে৷

.
খেলাফতে যোগ দেবার জন্য মুক্ত আওয়াজে যখন লিখতাম, আদেশ এসেছে৷ এড়িয়ে চলেছি৷ সাপ্তাহিক লিখনীতে যখন কাজ করি, সবাই ভাবতো শাসনতন্ত্র করি৷ জনকণ্ঠে যখন লেখা শুরু করলাম, অনেকে জিগ্গেস করলো বাম-রামদের দল করি কিনা৷ যায়যায়দিনে যখন কোনো পাঠকের আমার লেখা দৃষ্টিগোচর হতো, জিগ্গেস করতো বিএনপিকে ভালোবাসি কিনা৷ কালের কণ্ঠ, সমকাল, ইত্তেফাক, আলোকিত বাংলাদেশে যখন লেখা বেরোতো আমার, কোনো বিশেষ গোষ্ঠির ওপর রয়েছি বলে ধারণা করে বসতো অনেকেই৷ ফেসবুক কিংবা সাক্ষাতে কাউকে যদি বলেছি আমার জন্মভূমির কথা, আমায় পুরোদস্তুর আওয়ামী লীগের শ্রেষ্ঠ উপাধি ‘গোপালি` ডাক শুনতে হয়েছে৷ কিন্তু বাস্তবতা তো পরিষ্কার৷ কোনো দলমতের সঙ্গে আমার না কোনো সম্পর্ক ছিলো, আর না হবে কিংবা হতে পারে, ইনশাআল্লাহ৷
 
.
এসব বক্ওয়াস কেনো?
জবাবটা শোনাই তাহলে৷ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে আমাদের উলামায়ে কেরামের হাল নিচু ও হাস্যকর হয়ে যাচ্ছে দিনদিন৷ বিদেশি আলেমদের কাছে নিজেরাই নিজেদের কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ির গল্প করে নিজেদের প্রকৃত হাকিকত জাহির করছি৷

জমিয়ত শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে, শাসনতন্ত্র অমুকের বিরুদ্ধে, খেলাফত তমুকের বিরুদ্ধে৷ আর কতোকাল চলবে এভাবে?

আহ, কতোই না ভয়াবহ ও লজ্জাজনক হাল আমাদের কতিপয় বাঙালি আলেমের৷ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে হকপন্থি পীর সাহেবকেও বেদাতি বলতে কুণ্ঠাবোধ করছি না৷ টুপি-দাড়িহীন কলমবাজদের মিষ্টি কথায় যাচাইহীন মুফতি সাহেবের ভূমিকা পালন করছি৷ ফরীদ মাসঊদের মতো হকপন্থি মাদানি তরিকার পীর সাহেবকে কতো সহজেই নাস্তিক, মুরতাদ ফতোয়া দিচ্ছি৷

আহ, কতো বুঝে যাচ্ছি আজকাল আমরা! জমানার শ্রেষ্ঠ ফকিহ, সমঝদার, মুহাক্কিক বনে যাচ্ছি ধীরে ধীরে৷ অপাত্রে ‘আল্লামা`, ‘মুফতি` শব্দের ব্যবহার করে নিজেদের মান, ভাবগাম্ভীর্য কমাচ্ছি৷
 
.
জেনে রাখা ভালো, চরমোনাইর পীর সাহেব হোন কিংবা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবই হোন অথবা হকপন্থি দেওবন্দি বড় কোনো আলেমই হোন না কেনো, তাঁদের একটি পশমের সমতুল্যও নই দোষচর্চাকারী, ফেতনাবাজ, ধুরন্ধর, হিংসুক আমরা৷
 
.
পুনশ্চ : রাজনীতি করি না ঠিক৷ কিন্তু কোনো হকপন্থি আলেমের ব্যাপারে কোনো কটুক্তি আসুক বরদাশত করি না৷ চাই তিনি যেকোনো দলমতের হোন না কেনো৷ আমাদের তরফ থেকে তাঁকে শ্রদ্ধা করাই আমাদের কর্তব্য, তাঁর মতাদর্শে বৃদ্ধাঙুলি দেখানো নয়৷

আজকাল যারা এঁদের সমালোচনা করেন, সেসব টুটোফুটো ফেতনাবাজের খানিকটা ভাবা দরকার৷ কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ির ফলে আমাদেরই ক্ষতি৷

আহ, কবে আসবে সেই ঐক্যের ভেলা; সুখেদুখে একে অপরের পাশে দাঁড়াবে সবাই৷  হাসিখুশিতে কাটবে বেলা!
 
 
...
চলবে..
 
 
 
দেওবন্দের দিনরাত্রির অাগের ৩টি পর্ব পড়ুন :